অন্তর বুড়োর ভালবাসা কথন

আমার এখন নিবিষ্ট মনে খাতা দেখার কথা। নিয়ত ঠিক করে সামনে খাতা ছড়িয়ে বসলাম্ও।নিয়তকে আরো মজবুত করতে ফেসবুক খুললাম- লগ আউট করার জন্য। নোটিফিকশনের কারণে যাতে আমি কিছুতেই লক্ষ্যচ্যুত না হই। সেকালে ধ্যানভঙ্গের জন্য ছিল রম্ভা, মেনকা আর এ কালে আছে ফেসবুক!

লগ আউট বাটন খুঁজে পা্ওয়ার আগেই হোমপেইজে চোখ আটকে গেল। স্ত্রী-পুত্রকে কোলে-কাখে-পাশে নানাভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিয়ে একটি হাস্যেজ্জ্বল ভদ্রলোকের ছবি। দেখে যেন মনে হল চিনি উহারে। ঠাহর করে দেখলাম- তিনি আমার এক সময়ের ক্রাশ! কিন্তু হায়! এ কী চেহারা উনার! আমার স্মৃতিতে এখনো ভাসছে একটা লম্বা, স্বপ্নীল চেহারা। কপালের অনেকটা অংশ ঢাকা থাকত চুল দিয়ে। চুলগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে, সে জায়গা জুড়ে একটি বিস্তৃত টাক!

উনার স্ত্রী-সন্তানকে দেখে আমার তো ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে যা্ওয়ার কথা! কিন্তু কই! ভদ্রমহিলার জন্য বরং গভীর সমবেদনা অনুভব করলাম। এই টেকো লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে হাসিমুখে পোজ দিতে হচ্ছে!

ঠিক সেই মুহুর্তে পিড়িং করে একটা শব্দ হল। না, ফেসবুক থেকে আসে নি শব্দটা। শব্দটা আসলো আমার অন্তরের গহীনতম প্রদেশ থেকে। অন্তরবুড়ো কমেন্ট করেছে! বলছে, “ঐ লোকের স্ত্রীকে সমবেদনা জানানোর তুমি কে? তোমাকে কে বলেছে যে মহিলার কোন অনুতাপ আছে তার স্বামীকে নিয়ে?”

“অনুতাপ থাকবে না কেন? আমার এত বছরের আকর্ষণ এক মুহুর্তে পালাল এই টেকো চেহারা দেখে! আর ঐ মহিলাকে তো রোজ এই ভুঁডিওয়ালা টেকো লোকটাকে নিয়ে কাটাতে হয়! আমার তো করুণা হচ্ছে দুজনার জন্য”

বুড়ো হা হা করে হাসল আমার কথা শুনে। আমার গা জ্বলে গেলে সেই হাসি শুনে। বুড়ো কোন পণ্ডিতিমূলক বক্তৃতা দেওয়ার আগে এরকম একটা হাসি হাসে।

“তোমার আকর্ষণ পালাল কারণ তোমার কোন স্মৃতি নেই লোকটার সাথে! মানুষ হিসেবে সে কেমন তুমি জান না। তোমার স্মৃতিতে শুধু টুকরো টুকরো কয়েকটা ছবি ভাসে- করিডোর দিযে তার হেঁটে যাওয়া। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তুমি দেখতে পেতে যে রিকশায় করে সে বই পড়তে পড়তে যাচ্ছে! এই তো তোমার স্মৃতি!তার সাথে জীবনে তোমার কখনো কথা হয় নি। তার পুরো নামটা্ও তো তুমি জানতে না! তাই ফেসবুকে সার্চ দিয়ে তো তুমি তো তাকে কখনোই খুঁজে বের করতে পারো নি! তাই বলছি, তুমি তাকে কোনদিন ভালবাস নি!”

“কী বল, বুড়ো? ভালবাসি নি? উনাকে দেখলেই আমার হার্টবিট বেড়ে যেত! কেমন একটা শিহরণ জাগত ভিতরে! স্বপ্নীল চেহারার সেই ছেলেটার উপর আমার প্রচণ্ড আকর্ষণ ছিল!”

“ঠিক বলেছ। আকর্ষণ ছিল। মুগ্ধতা ছিল। কিন্ত ওটা ভালবাসা ছিল না। ভালবাসা কখনো শিহরণে, উত্তেজনায় আটকে থাকে না। প্রথম পর্যায়ে এই ব্যাপারগুলো থাকল্ওে মুগ্ধতাটা ভালবাসায় রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার পর সেখনে শিহরণের জায়গায় শান্তি আসে।

অনেক সময় এমনও হয়, যাকে ভালবাসছ তাকে মিস করছ কিন্তু সে বাড়িতে আসার পর হয়তো সে নিজের মনে কাজ করে বেড়াচ্ছে, তুমিও আর এক ঘরে ব্যস্ত আছ নিজের কাজ নিয়ে। কিন্তু সে যে বাড়িতে আছে-এটুকুই তোমার জন্য বিরাট শান্তির কারণ। ভালবাসা মানে দুজন দুজনের দিকে রূপমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা নয়। ভালবাসা হল একসাথে স্মৃতির পাহাড় গড়ে তোলা, দুজন দুজনের দুর্বলতার সহায় হ্ওয়া।”
আমার বিরক্তি আরো একটু বেড়ে গেল। বুড়োর কথা যখন খন্ডন করতে না পারি তখন আমার এরকম হয়। মনে হয়, বুড়ো কখন থামবে।
বুড়ো বুঝতে পারল। একটু হেসে বলল, “সেই গল্পটা মনে আছে?এক মধ্যবয়সী মহিলা স্বামীকে মুগ্ধ করতে এক ফোটো এডিটরকে দিয়ে নিজের ন্যুড এডিট করিয়েছিল? সেই ন্যুডটা একদম নিখুঁত করে এডিট করা ছিল। কিন্তু তার স্বামী খুশি হ্ওয়ার বদলে ভীষণ মন খারাপ করেছিল।

ফটো এডিটরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল, ‘আমার স্ত্রীর শরীরটা এডিট করতে গিয়ে আপনি তার শরীরে সন্তানধারণের দাগটা্ও মুছে দিয়েছেন। আপনি আসলে দাগ মোছেন নি, আমাদের সন্তানটাকে সে নয় মাস ধরে শরীরে লালন করেছে, সেই স্মৃতিচিহ্নটাকেই মুছে দিয়েছেন।ওর মুখের বলিরেখা মুছে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমরা দুজন কতগুলো বছর একসাথে কাটিয়েছি, সেই সময়ের চিহ্নটাকে মুছে দিয়েছেন। এটা আসলে আপনার দোষ না। এটা আমারই দোষ যে আমি তাকে আমার ভালবাসাটা বোঝাতে পারি নি। আর তাই, তাকে আপনার দ্বারস্থ হতে হয়েছে আমাকে মুগ্ধ করার জন্য।’”
“বুঝলাম। ভালবাসা তখনি হয় যখন সেটা মুগ্ধতা ছাপিয়ে পরম নির্ভরতায় পৌঁছায়।”
“এই তো। এবার বুঝেছ। তবে তার মানে এই না যে ঐ একই সম্পর্কের মধ্য কখনো মুগ্ধতা আসবে না। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে মুগ্ধতা, শিহরণ বা উত্তেজনাই সম্পর্কের চরমতম লক্ষ্য নয়। উত্তেজনার জন্য তো মানুষ ড্রাগ নিলেই পারে। ভালবাসা তো কোন নেশা নয়।

ভালবাসা হল আমাদের আবেগ অনুভূতি, দুর্বলতা, সবলতাকে নিরাপদে রাখার মত একটা আশ্রয়স্থল। যে সেই আশ্রয়টা দিতে পারে, তার সাথেই ভালবাসা হয়। অনেক মানুষ উত্তেজনা আর শিহরণকে ভালবাসার লক্ষণ ভেবে একটার একটার পর একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে কিন্তু শান্তি পায় না।”

এইসব বয়ান শুনতে শুনতে দেখলাম, রাত অনেক হয়েছে। ক্রাশের চেহারার উপর তো অনেক আগেই অরুচি ধরেছে এবার নিজের শ্রবণশক্তির উপরও বিতৃষ্ণা এসে গেল। বুড়োর ভালবাসা ব্যাখ্যান আমার মাথায় বিশেষ না ঢুকলেও এটা বুঝলাম যে আমার খাতা দেখার কাজ সারা। বাসের মধ্য দেখতে গেলে তো আবার ফেসবুকে ভাইরাল আপা হয়ে যেতে হবে। যাক, কাল সকালে কলেজে গিয়েই দেখব।

এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুমের মধ্যেও, স্বপ্নের ঘোরেও ব্যাকগ্রাউন্ডে বুড়োর বকবকানি ভেসে আসতে থাকল। ইস! কোথা্ও যদি একটা অফ্ বাটন থাকত বুড়োকে থামানোর! সেই অমোঘ অফ্ বাটনের নাম বোধহয় আমার মৃত্যু! এর আগে বুড়ো থামবে না।

Advertisements

জ্বরজড়িত জীবন

আমার জ্বর মাপার একটা নিজস্ব থার্মোমিটার আছে মাথার মধ্যে। জ্বর ১০৪ ছাড়ালে আমি দার্শনিক হয়ে উঠি। তখন আমার মনটা ভীষণ আর্দ্র হয়ে ওঠে। আচরণ ভারি ভদ্র নম্র হয়ে যায়। অর্ধচেতন অবস্থায় আমি মানুষজনের কাছে মাফ চাওয়ার কথা ভাবতে থাকি। পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়কারীর গুরুতর অপরাধও মাফ করে দিতে ইচ্ছে হয়।
গতরাতে এইসব লক্ষন একটু একটু দেখা দিতে শুরু করেছিল। বুঝলাম, অবস্থা বেগতিক, জ্বর বেড়ে গেছে। মেপে দেখলাম, ১০৩। অর্থাৎ, দার্শনিক হতে আর অল্প একটু বাকি। রিস্ক নিতে চাইলাম না। কাল জ্বরের তৃতীয় রাত ছিল। অতএব, টুপ করে একটা ওষুধ খেয়ে ফেললাম।
আধা ঘন্টা পর মনে হল, তাবৎ অন্যায়কারীকে কি ক্ষমা করে দেব? নাহ্! এ পৃথিবীতে কে কার! ক্ষমাতে কী আসে যায়?
আমি কি কারোর কাছে ক্ষমা চাইব? এহ্! কোন দুঃখে? যদি কেউ দুঃখ পেয়ে থাকে আমার কাছ থেকে, সেটা কি আর আমার দোষ! আমি তো নিমিত্ত মাত্র!
আমার জাগতিক কুযুক্তি, ইগো যেহেতু আবারো টনটনে হয়ে গেছে, অতএব, জ্বর আপাতত ছেড়ে যাচ্ছে এবং আমি হুঁশে ফিরছি! 😆

জীবন যখন সরকারি সম্পত্তি

আজ থেকে ঠিক পাঁচ মাস আগে আমার আন্তরিক অনিচ্ছাসত্ত্বেও জীবনটা সরকারের সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল। ব্যাপক অর্থে, প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের সম্পত্তি বা সম্পদ। কিন্ত অন্য কোন নাগরিকের হাতে মোটা মোটা পাঁচ/ছয়টা বিধি-বিধানের বই তুলে দিয়ে তা মুখস্থ করতে বলা হয় না। সরকারি কর্মচারীকে এক একটা থান ইটের মতন বই মুখস্থ করে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়। সেসব বইয়ের পাতায় পাতায় থাকে “কী করিলে কী হইবে” শীর্ষক নীতিমালা। অপরাধের সাথে পরিচয় হওয়ার আগেই সেসব অপরাধের দণ্ড মুখস্থ করে ফেলতে হয়।
ভাবতে বসলাম, এই পাঁচ মাসে আমার অনুভূতি কী? অনুভূতি অবশ্যই মিশ্র। তবে শ্রেষ্ঠ অনুভূতিটা হয় প্রতিদিন সকালবেলায়। কানে জাতীয় সংগীতের সুর ভেসে আসার সাথে সাথে প্রত্যেকে যে যেখানে থাকে দাঁড়িয়ে যায়। এই রীতিটা আগে কখনো কর্মস্থলে অণুসরণ করতে হয় নি। এখন করি। অত্যন্ত পবিত্র একটা অনুভূতি হয় তখন।
যা কিছু নথিপত্র নাড়াচাড়া করি, তা বেশিরভাগই বাংলায়। অদ্ভূত অদ্ভূত সব বাংলা শব্দ শুনেছি কয় মাসে- পরিপত্র, অনুবেদন, প্রেষণ, ভবিষ্য তহবিল ইত্যাদি ইত্যাদি অসংখ্য শব্দ। এসব শব্দের সংজ্ঞার্থ মুখস্থ করতে মেলা দিন লেগে যাবে। কারণ আমি একটি সর্বজনস্বীকৃত টিউব লাইট। তবু, শিখতে দেরি হলেও বাংলার এই বহুল ব্যবহার দেখে ভাল লাগে। বাংলা শব্দগুচ্ছের এতখানি ব্যবহার দেখতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। বিদেশী সংস্থায় ছিলাম বলেই হয়তো ব্যাপারটা আমার বেশি করে চোখে পড়ে।
এ পৃথিবীর সকল ভাষা-ভাষী তার নিজের মাতৃভাষায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পাক। ভাষার মাসে এবং জীবনের সরকারিকরণের পাঁচ মাস পূর্তিতে এটাই আমার কামনা।
ও হ্যাঁ, আগের অফিসকে মিস করি কী না? সে প্রশ্নের উত্তর আজ আর না দেওয়াই সঙ্গত। কে না জানে, বিয়ে করে প্রাক্তনের গুণ গাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অতএব, সেসব থাকুক আমার অন্তরের গহীনতম প্রদেশে। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

সূর্য এবং নৈঃশব্দ্যের গান…

“Hello darkness, my old friend” গানটা শুনতে শুনতে যাচ্ছি। অথচ এখন ঝকঝকে সকালবেলা। চোখের সামনে লাল সূর্য! কিন্তু গানটার সাথে আমার চারপাশের কী যেন একটা মিল আছে! আমার চোখের সামনে একটা নতুন দিন শুরু হচ্ছে। আমার কানে বেশ শান্ত স্বরে একটা নতুন রিয়ালাইজেশনের কথা বলা হচ্ছে।

চোখের সামনে সূর্যটা একটু একটু করে ফিকে হচ্ছে। গাঢ় লালটা আস্তে আস্তে কমলা হয়ে গেল। চারপাশ যত উজ্জ্বল হয়, সূর্যের টকটকে ভাবটা তত কমে। আজই প্রথম খেয়াল করলাম, চারপাশকে উজ্জ্বল করতে গিয়ে সূর্য নিজের রং, সৌন্দর্য কমাতে বাধ্য হয়। দুপুর রোদের সূর্যটা তো জ্বলতে জ্বলতে প্রায় সাদাটে হয়ে থাকে। অনেকটা প্রৌঢ় জীবনের মতন। সবাইকে সার্ভিস দিতে দিতে আমাদের মা-বাবারা যেমন নিজের রংটা হারিয়ে ফেলেন। তারপর বার্ধক্যে আবার রং ফিরতে থাকে শৈশবের মত। মানুষ যেমন বুড়ো হলে শিশুর মত হয়ে যায়, সূর্যটাও তেমনি সূর্যাস্তের আগ দিয়ে সূর্যোদয়ের রঙ গায়ে জড়িয়ে ডুবে যায়। পূর্ণ একটা জীবনকাল কাটালে মানুষও আবারও তার দ্বিতীয় শৈশবে ফিরে যায়। বার্ধক্যের সময়টাতে সেও শিশুর মত আচরণ করতে থাকে।

এটা একটা নতুন উপলব্ধি। এই একই সূর্য এর আগে বহুবার দেখেছি। কিন্তু এই ভাবনাটা এর আগে কখনো মাথায় আসে নি। অর্থাৎ, সূর্যটার দিকে তাকিয়েছি, কিন্তু দেখি নি কোনদিন। গানের মধ্যেও অনেকটা একই কথা বলা হচ্ছে। People talking without speaking; People hear without listening…

মানুষের ক্ষেত্রেও বোধহয় এমনটা হয়। দিনের পর দিন যাকে পরিচিত বলে জানছি, তাকে একদিন হঠাৎ অন্যরকম লাগে। সঠিক মুহূর্তে সঠিক আলোতে মানুষটার অন্য একটা পরিচয় পাওয়া যায়। অস্তিত্ব নাড়িয়ে দেওয়ার মত পরিচয়।

অস্তিত্ব নাড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তে বুকের মধ্যে একটা সূর্যোদয় হয়। কখনো হয়তো সূর্যাস্ত হয়। কিন্তু সূর্য উঠুক বা ডুবুক, উপলব্ধির পরমুহূর্তে পৃথিবীটা আর আগের মত থাকে না।

‘ভাইয়া’র স্বজনেরা

সৃষ্টিকর্তা বড় খেয়ালী। যেটা যেখানে দেওয়ার কথা সেটা সেখানে দেন না। উনি সারপ্রাইজ দিতে ভালবাসেন!

আজ বিকালে নিচতলা থেকে বাসার লিফটে উঠলাম। আমার সাথে একটা আট/নয় বছর বয়সী মেয়েও উঠল।

লিফটে উঠেই বড় বড় চোখ মেলে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কয় তলায় থাকেন?” কোন এক অদ্ভুত নিয়মে সব বাচ্চা মেয়ের চোখ বড় বড় হয় । পরিষ্কার শাদা চোখে গভীর কাল দুটো মণি থাকে। তবে চাইনিজ আর জাপানিরা এই হিসেবের বাইরে। ওরা আমার কাছে অতি বিস্ময়ের বস্তু। যেখানে চোখ থাকার কথা, সেখানে আছে একটা করে কাল আড়াআড়ি দাগ। দু পাশে দুটো দাগ। এই দিয়ে তারা কী করে দুনিয়া দেখে আমি ভেবে পাই নি। অবশ্য দাগ থেকে যে ভাল কিছু হয় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্টিভ ওয়াহ। চোখের জায়গায় তারও শুধু দুটো দাগ। কিন্তু সেই দাগের মধ্যে দিয়ে তাকিয়েই তিনি পুরো মাঠ দেখে ফিল্ডিং সাজাতেন, অধিনায়কত্ব করতেন। আমি আমার নাকের দুপাশে দুটো জানালা নিয়ে বসে আছি। তবু হাতের মোবাইল হাতে রেখে খুঁজে বেড়াই। আর স্টিভ ওয়াহ তার নাকের দুপাশের ভেন্টিলেটর দিয়ে তাকিয়েই বিশ্বজয় করে গেছেন।

যে দৃষ্টিশক্তি আমার ঢাউস মণিতে থাকার কথা, তা ছিল স্টিভ ওয়াহর দাগের আড়ালে। কারণ সৃষ্টিকর্তা সারপ্রাইজ দিতে ভালবাসেন।

যাহোক, আবার লিফটে ফিরি-যেখানে আমার মায়াবী বিশালাক্ষী মেয়েটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় চোখের বাচ্চা মেয়েদের প্রতি আমার অদ্ভুত একটা ভাল লাগা কাজ করে। বললাম, আমি পাঁচতলায় যাব। মেয়ে বলল, ‘ওটা কি আপনার নিজের বাসা?” আমার সাইজের সাথে কি মালিকানা ম্যাচ করছে না? বাসা তো যথেষ্ট ছোট-আমার সাইজের তুলনায়ও বেশ ছোট! হেসে বললাম, “হ্যাঁ, ওটা আমার নিজের বাসা।” এবার বলল, “আপনি কার সাথে থাকেন?” হাসি চেপে বললাম, “আমি আমার মা-বাবার সাথে থাকি।”

ওর প্রশ্নের ধরণ বেশ প্রশংসনীয়। দুটো প্রশ্ন করে আমার সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটো তথ্য সে আদায় করে ফেলেছে- আমি ওই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক কীনা এবং আমার বৈবাহিক অবস্থা কী।

এই বাচ্চার ঘটে যেটুকু বুদ্ধি আছে, যেটুকু ভদ্রতাবোধ আছে, তা আমার চির অপরিচিত ‘ভাইয়া’র প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয়-স্বজনের নেই। রাস্তা-ঘাটে, বাসে প্রায়ই সেই নাম না জানা ‘ভাইয়া’-র আত্মীয়-স্বজনের সাথে আমার দেখা হয়। দু একটা কথার পরেই তারা জানতে চান, “ভাইয়া কী করেন?” বলতে ইচ্ছে হয়, “আপনার ভাইয়া কী করেন, তা আপনিই ভাল জানেন, আপু। আমি কী করে জানব তার ঠিকুজি কুষ্ঠি? তার সাথে পরিচিত হবার কোন পরিকল্পনা আমার নেই।”

ফাইন, জানতে ইচ্ছে হয়েছে- আমি বিবাহিত কী না। প্রথম কথা, এত অল্প পরিচয়ে এত ব্যক্তিগত প্রশ্ন আপনি করবেন কেন? আর করবেনই যদি, এত ঘুরপথে জিজ্ঞেস করবেন কেন? সরাসরি জিজ্ঞেস করেন! এত আত্মীয়তা পাতানোর দরকার তো নাই!

সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট মানুষ বড় বিচিত্র জীব! আর বাঙালি বিচিত্রতম!

​ছদ্ম পুরুষবাদী থেকে সাবধান

(লেখাটি ৩১ জুলাই, ২০১৭ উইমেন চ্যাপ্টারে ছাপা হয়েছিল)

নতুন একটা ফ্যাশন চালু হয়েছে- নারী পরিচয়কে ব্যবহার করে পুরুষবাদের জয়গান গাওয়া। সুচিন্তিত, যৌক্তিক, ভিন্নমতের প্রতি আমি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু নিজের মতামত প্রচার করতে গিয়ে কেউ যদি একটা গোটা গোষ্ঠীকে অভব্য ভাষায় আক্রমণ করে, তাহলে, সেটা ভারি আপত্তিকর। 

আমার এই লেখাটি মূলত একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া। এক অনলাইন কাগজে অত্যন্ত আপত্তিকর শিরোনামের একটি লেখা চোখে পড়ল – “যে নারী পুরুষের প্রিয় হতে পারে না, সেই হয়ে ওঠে নারীবাদী।“ এই অদ্ভূত, একপেশে শিরোনাম দেখে বিস্মিত হলাম। কিন্তু ভীষণ বিপর্যস্ত লাগল যখন দেখলাম লেখাটি লিখেছেন একজন নারী। লেখার ছত্রে ছত্রে তার এই নারী পরিচয়কে তিনি তার আক্রমণের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

লেখার আপত্তিকর অংশগুলো চিহ্নিত করা যাক।

প্রথমত, তিনি একটি জেনারালাইজেশন করেছেন- সকল নারীবাদীই পুরুষের অপ্রিয়। ‘সকল গরু ঘাস খায়’এর মত একটি সহজ সমীকরণ টেনেছেন। যে কোন আধিপত্যবাদী কুতার্কিকরা তাই-ই করেন। যেমন, সীমিত জ্ঞানের অধিকারী শাদা আধিপত্যবাদীরা সকল কালো মানুষকে ক্রিমিনাল মনে করেন। উনিও তাই করলেন। অথচ, আমি তাকে ভূরি ভূরি উদাহরণ দেখাতে পারব যেখানে একজন নারীবাদী মেয়ে সুখে শান্তিতে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ী নিয়ে সংসার করছে। সেরকম অনেক মেয়ে আমার ফ্রেণ্ডলিস্টেই আছে- কেউ পেশায় সাংবাদিক, কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক। অসংখ্য পুরুষবাদীর মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে সেই নারীবাদী মেয়েরা তাদের প্রতিবাদী ভূমিকার ক্ষেত্রে স্বামীর সমর্থন ও সহযোগিতা পাচ্ছেন; তারা পুরুষের প্রিয়। অতএব, পুরুষের স্বীকৃতি আদায়ে ব্যর্থতা = নারীর নারীবাদী হয়ে ওঠা জাতীয় অনুসিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হল।

দ্বিতীয়ত, পুরুষের প্রিয় হয়ে ওঠাটাই কি একটা মেয়ের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য? ধরা যাক, একটি মেয়ে সংবাদপাঠিকার কাজ করেন। তা, তার জীবনের প্রথম সংবাদ পাঠের পর তিনি কি শুধুই পুরুষ অডিয়েন্সের মতামত নেবেন? কোন মেয়ে যদি তাকে বলেন, আপু, আপনার খবর পড়া আমার খুব ভাল লেগেছে, তাহলে, সেই সংবাদপাঠিকা কি বলবেন যে আপনি একটা মেয়ে, তাই, আপনার কমপ্লিমেন্ট আমি নেব না! এমন কোন পেশার কথা তো আমি মনে করতে পারছি না যেখানে টার্গেট অডিয়েন্স শুধুই পুরুষ। একমাত্র যৌনকর্মী এবং জেন্ডার স্পেসিফিক কোন প্রোডাক্টের বিক্রেতা ছাড়া আর কেউ বোধহয় নির্দিষ্ট একটি লিঙ্গকে টার্গেট করে থাকেন না।

যে কোন সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ অন্যের স্বীকৃতি চায়। আমি যদি সাজগোজ করি, তাহলে যে কারোর মুখ থেকে প্রশংসা শুনতেই আমার ভাল লাগে। অফিসে আমি একটা নতুন ড্রেস পরে আসার পর আমার সহকর্মীরা যদি সেটা খেয়াল করে, আমার ভাল লাগে। সে সহকর্মী পুরুষই হোক, আর মেয়েই হোক। আমার জুনিয়র মেয়েটা আমার লুক নিয়ে খুব মাথা ঘামায়। আমার ড্রেসগুলো তার মুখস্থ। কখনো কখনো সে আমাকে কোথাও যাওয়ার আগে বলে রাখে, আপু, ওই থ্রী-পিসটা পরলে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগে, কাল ওইটা পরে আসবা। কিংবা এই ওড়নাটা এই জামার সাথে ম্যাচ করে না, এটা পোরো না। আমি ওর মতামত গুরুত্ব দিয়ে শুনি। কোন কোন ছেলে সহকর্মী আমার নতুন দুল দেখে তারিফ করে। কেউ কেউ আবার এটাও বলে, এই দুলটা কালকের জামাটার সাথে বেশি মানাত। একজন তো আমার গিফট কেনার সময় এটাও বুঝতে পারে, কোন রংটা আমার পছন্দ হবে, আর কোনটা হবে না। অথচ আমি আমার প্রিয় রং নিয়ে তাকে কিছু বলি নি কখনও। এদের মতামতও আমার কাছে সমান গ্রহণযোগ্য। আমরা প্রিয় হতে ভালবাসি। আমরা স্বীকৃতি চাই। তবে সেটা নির্দিষ্ট করে কেবলই একটি শ্রেণীর কাছ থেকে নয়- নারী-পুরুষের উভয়ের স্বীকৃতি পেতেই আমাদের ভাল লাগে। এবার কি ওই লেখিকা আমাকে উভকামী বলবেন? বলতেও পারেন, কারণ পুরুষের প্রিয় হতে না চাওয়া মেয়েদের উনি সমকামী বা হিজড়া মনে করেন। 

না, বেশিরভাগ মেয়েই পুরুষের গায়ে পড়া প্রিয়ত্ব এড়িয়ে চলে। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কখনোই চাইব না, একটা অজানা ছেলে আমাকে দেখে, ‘ওয়ে সুন্দরী’ বলে উঠুক, কিংবা আমার শরীরের কোন বিশেষ অংশের দিকে তাকাতে তাকাতে পথ চলুক। না, এই ধরণের অসুস্থ প্রিয়গিরি আমরা চাই না। এটাকে ইভটিজিং বলে, অ্যাপ্রিসিয়েশন বলে না। অ্যাপ্রিসিয়েশন আর হ্যাংলামির মধ্যে তফাৎটা বুঝতে হবে। প্রশংসা, স্বীকৃতি, আমার অ্যাপেয়ারেন্স নিয়ে মন্তব্য আমি শুধু তাকেই করতে দিই যাকে আমি স্পেস দিই। একবার অফিস থেকে বাসায যাওয়ার পথে এক শ্বেতাঙ্গ বিদেশী আমাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমাকে আর আমার সহকর্মীকে দেখে চিৎকার করে উঠল, “সুন্দরী মহিলা!” কথাটা সে বাংলায় বলেছিল, বিদেশী টানে। আমি আর আমার সহকর্মী সাথে সাথে পিছন ফিরে তাকালাম লোকটার দিকে। আমাদের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি দেখে লোকটা চুপচাপ কেটে পড়েছিল। আমি পরে এই ঘটনাটা আমার এক আমেরিকান বন্ধুর সাথে শেয়ার করেছিলাম- ওর ভুল ভাঙানোর জন্য। এই একই ঘটনা কোন বাঙালি ছেলে যদি বিদেশী মেয়ের সাথে করত এটাকে ওরা ইভটিজিং বলত। তাই, ওকে সাবধান করে দিলাম যেন জেনারালাইজেশন করার আগে দুবার ভাবে। 

কোনধরণের জেনারালাইজেশন আমি সহ্য করতে পারি না। সেটা যাদের নিয়েই করা হোক না কেন। এমনকি কেউ যদি বলে পুরুষ মানেই চরিত্রহীন, আধিপত্যকামী জন্তু-তবে সেই কথারও প্রতিবাদ করি আমি। কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটিও একজন পুরুষ। যখনই একজন জেনারালাইজেশন করে কথা বলে, তখন তার বৌদ্ধিক স্তর নিয়ে আমার সন্দেহ হয়।

এবার আসি তৃতীয় পয়েন্টে। উনি ‘নারীবাদী’ কথাটিকে অনেকটা গালির মত করে ব্যবহার করেছেন। নারীবাদ এবং মানবতাবাদকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। উনার মতে, নারীবাদীরা মানবতাবাদী নন। আমার প্রশ্ন, নারী কি মানুষের বাইরে? এই পৃথিবীতে অসংখ্য সমস্যা এবং বিষয় আছে। সমস্ত বিষয় নিয়ে সবার সমান ইন্টারেস্ট থাকে না। কে কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন সেটা নির্দিষ্ট করে বুঝার জন্য পরিবেশবাদী, নারীবাদী, বস্তুবাদী, ভাববাদী বলে ডাকা হয়।  পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয় নিয়ে যারা কাজ করে, তাদের যদি ইতিবাচক অর্থে পরিবেশবাদী বলা যায়, তাহলে নারীদের অধিকার বিষয়ে যারা কাজ করেন তাদেরকে এমন নেতিবাচকভাবে নারীবাদী বলা হবে কেন?

এই কেন-র উত্তর আছে আধিপত্যবাদী পুরুষের মিথ্যে প্রচারণায়। নারীবাদী মানেই দা-কাটারি হাতে মারমুখী কাউকে প্রেজেন্ট করা হয়। সংকীর্ণচিত্ত মানুষের ধারণা, নারীবাদী মানেই পুরুষালি। কপালে টিপ পরা, চোখে কাজল দেয়া নারীবাদীর সংখ্যা কিন্তু অনেক। অথচ, এই সমালোচকরা সেগুলো সযত্নে এড়িয়ে যান। কারণ নারীবাদীকে পুরুষালি প্রমাণ করতে পারলে সেইসব নারীকে আনঅ্যাট্রাক্টিভ (তাদের চোখে) বলে প্রমাণ করতে সুবিধা হয়। এবং তখন নারীবাদকে ফ্রাস্টেশনের ফলাফল হিসেবে প্রমাণ করতেও সুবিধা হয়। অথচ নারীবাদ একটা বিবেকবান মানুষের সচেতন সিদ্ধান্তও হতে পারে। কিন্তু এটা তারা মানবেন না।

এদের জন্য সবচেয়ে উচিত জবাবটা দিয়েছিলনে এমা ওয়াটসন, তার ইউএন স্পীচে। উনি বলেছিলেন, “…my recent research has shown me that feminism has become an unpopular word. Apparently I am among the ranks of women whose expressions are seen as too strong, too aggressive, isolating, anti-men, and unattractive.” । স্পীচের আগে তাকে ফেমিনিজম শব্দটা ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছিল। তারা ভেবেছিল, এতে করে তার বক্তব্যের ক্ষেত্রটা সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। উনি তাদের ভুল প্রমাণ করেছিলেন। বক্তব্যের প্রতিটি লাইন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন কেন নারীবাদ নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রয়োজনীয়। উনি বলেছিলেন, “We don’t often talk about men being imprisoned by gender stereotypes, but I can see that they are and that when they are free, things will change for women as a natural consequence”। ভাল কথা, এমা ওয়াটসনকে কার কার যেন আনঅ্যাট্রাক্টিভ মনে হয়? কার কার মনে হয় যে উনি পুরুষের প্রিয় হতে সমর্থ নন? একটু হাত তুলুন, আপনাদের দেখি।

আর হ্যাঁ, কেউ যদি পরিপাটী হয়ে সেজে না থাকে, তবে সেটাও কিন্তু তার ব্যক্তিগত অভিরুচি। অনেক মানুষ টাকা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ জীবন যাপন করতে পছন্দ করেন। ঠিক তেমনি অনেক মেয়ে সাজতে পছন্দ করেন না, জিন্স পরেন। সেটাও তার ব্যক্তিগত ভাল লাগা, ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপার। এবং অনেক মেয়েকেই সাধারণ একটা জিন্স পরেও শাড়ির চাইতে বেশি সুন্দর লাগে। কারণ ওটাই তার স্টাইল। সে ওটাতেই স্বচ্ছন্দ। কেউ যদি সংসার করতে না চায় তবে সে স্বাধীনতাও তার আছে। আমি আপনি কে সেগুলো ডিক্টেট করার? এ জগতে অনেক কিছু করার আছে। আপনার হাতে যদি অঢেল সময় থাকে, তাহলে সেগুলোর পিছনে এনার্জি খরচ করুন।

নারীবাদী মানেই পুরুষ বিরোধী নয়। কেউ যদি পুরুষকে নিয়ে কোন খারাপ মন্তব্য করেন, তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা। এটার সাথে নারীবাদকে গুলিয়ে ফেলার কোন কারণ নেই। আমি কখনো ইচ্ছে করে নিজেকে নারীবাদী বা অ্যাক্টিভিস্ট বলে পরিচয় দিতে যাই নি। কিন্তু আমার কাজগুলোর সাথে নারীবাদ হয়তো মিলে যাবে। কারণ আমি নারী এবং পুরুষ উভয়কেই সম্মান করে চলি।

নারীবাদ মানেই পুরুষের করুণা পিয়াসী নয়। আমি বাসের সীটে বসা অবস্থায় যদি কোন বৃদ্ধ পুরুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি, তাহলে আমার সীটটা তাকে ছেড়ে দিই। ওভারব্রীজের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়, এক ভদ্রলোককে দেখলাম এক হাতে ক্রাচ নিয়ে আর এক হাতে খোলা ছাতা নিয়ে নামছেন। ভদ্রলোক খোঁড়া নন, তবে হয়তো পা মচকে গিয়েছিল, তাই ক্রাচ নিয়েছেন। ক্রাচের কারণে ডান হাতের ছাতাটা কাত হয়ে গিয়েছে। তাই কাঁধে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। আমি তার পিছন পিছন নামতে গিয়ে ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। জানতে চাইলাম, “ভাইয়া, আপনার ছাতাটা কি আমি সোজা করে ধরব আপনার মাথায়?” অপরিচিত একটা মেয়ের কাছ থেকে এরকম একটা অদ্ভূত কথা উনি প্রত্যাশা করেন নি। একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বললেন, “না না ঠিক আছে, ধন্যবাদ।“ ঠিক সেই মুহুর্তে দেখলাম, আমার বাসটা ব্রীজের নীচ দিয়ে চলে যাচ্ছে। তাই, কথা না বাড়িয়ে হুড়মুড় করে নেমে এলাম। তবে উনি ছাতা ধরতে বললে বিনা দ্বিধায় আমি ছাতা ধরতাম। এইসব কাজগুলো যখন আমরা করি, তখন নারী-পুরুষ পরিচয়টা সেখানে মুখ্য নয়। বাস্তব জ্ঞান, এবং মানুষের প্রয়োজনের প্রতি সম্মানবোধটা ওখানে মুখ্য। আবার নারীবাদ মানেই অযৌক্তিক বিদ্রোহ নয়। নৌকা থেকে নামার সময় পিচ্ছিল কাদায় যাতে পড়ে না যাই সেজন্য আমার বন্ধুর বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা আমি বিনা দ্বিধায় ধরি। পুরুষের সাহায্য নেব না শীর্ষক তর্ক সেখানে আমি তুলি না। কারণ আমরা একে অন্যের সাহায্য নিয়েই বাঁচি। 

ওই লেখিকার একটি লেখার বিপরীতে আমি এত লম্বা লেখা কেন লিখলাম? কারণ উনি গোটা লেখাতে ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক সমতার কথা বলে শেষ মেষ গিয়ে একটি বোমা ফাটিয়েছেন- “যেকোনো কারণেই হোক পুরুষের নারীর উপর আধিপত্যকে আমি খারাপভাবে দেখি না”। অত্যন্ত ভয়ংকর এবং ক্ষতিকর একটি লাইন। এই একবিংশ শতাব্দীতে কেউ কারো উপর আধিডত্য কেন করবে? আর ঠিক এই লাইনটি এবং লেখার শিরোনামের কারণে বহু পুরুষ এই লেখাটি শেয়ার করে চলেছেন। কিছু ইন্টেলেকচুয়াল নামধারী পুরুষ চক্ষুলজ্জার খাতিরে এই লেখিকার মত এত স্পষ্টভাবে তাদের অভিমতটা জানাতে পারেন না। এই লেখিকা তাদের মুখপাত্র হয়েছেন। আর আমার এবং আমার মত অনেক মেয়ের আপত্তি সেখানেই।

পড়ন্ত কপাল

মানুষের পোড়া কপাল, আর আমার হল পড়া কপাল।
কখনো বাস, কখনো সাইকেল, কখনো রিকশা ইত্যাদি নানাবিধ বাহনের সংস্পর্শে এসে রাস্তা ঘাটে প্রায়ই নিজের পতঞ্জলি দশা দেখি।
আজ আজমপুরে আমার রিকশাকে হঠাৎ করে একটা পিক আপ দিল এক ধাক্কা। প্রথম ধাক্কাটা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় ধাক্কা। কায়দা বেকায়দা বিভিন্ন স্টাইলে রিকশার হুডটা ধরে ঝুলে থাকার চেষ্টা করছিলাম। মনে আশা ছিল- ওয়ান্ডার উম্যান না হতে পারি, টিকটিকি বা তেলাপোকা স্টাইলে ঝুলে থাকা যাক। কিন্তু আমার অনুকরণীয় জীবকূলকে কোনদিন ভাল করে অবজার্ভ করা হয় নি বলেই তেনাদের মুখরক্ষা করতে পারলাম না। কাঁধের দুই ব্যাগ নিয়ে পপাত ধরণীতল।
আক্রমণকারী গাড়ি ততক্ষণে আমাকে জানালা দিয়ে এক ঝলক দেখে পগার পার।
দশ পা দূরে গিয়েই সিগন্যালে বেচারা কে থামতে হলো। ছড়ে যাওয়া হাঁটু নিয়ে আমি বিপুল বিক্রমে আমার রিকশাওয়ালাকে নিয়ে পৌঁছে দেখি, এক মোটরসাইকেল আরোহী অপরাধীর কলার ধরে এক একটা ঝাঁকি দিচ্ছে আর একটা করে নতুন নামকরণ করছে। প্রতিটা নামকরণেই অভিনবত্বের ছোঁয়া। ছেলেটার জন্ম পরিচয় একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছে। আমি এগিয়ে যেতেই অন্যরা পথ ছেড়ে দিল।
আমি একটা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেবার প্রস্তুতি নিয়ে আগালাম।
ওমা, সীটে তো একটা লিকলিকে লিলিপুট বসে আছে ছলছল চোখে। দেখে আমিই বেকুব হয়ে গেলাম। কিন্তু উপস্থিত জনতা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে চেয়ে আছে। কারণ আমি মহামান্যা ভিকটিম! আমার ভাবই আলাদা।
আমি তাই গলা চড়িয়ে বললাম, ‘আপনি রাস্তায় আমাকে ফেলে দিয়ে চলে গেলেন! আমি তো আজ মরেও যেতে পারতাম!
দ্বিতীয় লাইনটা বলে আমার আসলেই মরে যেতে ইচ্ছে হল! এত্ত দুর্বল থ্রো আমার ডায়ালগের। আমাকে দিয়ে পারফর্মেন্স হবে না। হতাশ গলায় বললাম, ‘ভাই, যান, বাড়ি যান।’
আহত হাঁটু আর পড়ন্ত কপাল নিয়ে আমিও বাড়ি ফিরে এলাম।

কারাগারের রোজনামচা

“কই গ্রেট বৃটেনে তো কেউ না খেয়ে মরতে পারে না!…জার্মানি, আমেরিকা, জাপান এ সকল দেশে তো কেহ শোনে নাই- কলেরা হয়ে কেহ মারা গেছে? … ওসব দেশে তো মুসলমান নাই বললেই চলে। সেখানে আল্লার নাম লইবার লোক নাই একজনও; সেখানে আল্লার গজব পড়ে না। কলেরা, বসন্ত, কালাজ্বরও হয় না। আর আমরা রোজ আল্লার পথে আজান দিই, নামাজ পড়ি, আমাদের উপর গজব আসে কেন?”

কী মনে হচ্ছে? উপরের লাইনটা কোন নাস্তিকের লেখা? তাহলে শোনেন, ঠিক আগের প্যারায় লোকটা কী লিখেছে!
“এই দেশের হতভাগা লোকগুলি খোদাকে দোষ দিয়ে চুপ করে থাকে। ফসল নষ্ট হয়েছে, বলে আল্লা দেয় নাই, না খেয়ে আছে, বলে কিসমতে নাই।…আল্লা মানুষকে এতো দিয়েও বদনাম নিয়ে চলেছে…ডাক্তারের অভাবে, ওষুধের অভাবে, মানুষ অকালে মরে যায়- তবুও বলবে সময় হয়ে গেছে। আল্লা তো অল্প বয়সে মরবার জন্য জন্ম দেয় নাই। শোষক শ্রেণী এদের সমস্ত সম্পদ শোষণ করে নিয়ে এদের পথের ভিখারি করে না খাওয়াইয়া মারিতেছে।”

কতখানি স্বচ্ছ চিন্তাশক্তি আর অকপটতা থাকলে এইরকম সহজ করে কথাগুলো লেখা যায় ! মানুষটা বুঝিয়ে দিল নিজেকে প্রগ্রেসিভ প্রমাণ করার জন্য অহেতুক ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দরকার নেই, আবার ধার্মিক প্রমাণ করার জন্য হেফাজতিদের তোষণ করারও দরকার নেই। সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস আর নিজের সামর্থ্যের সম্মিলন না ঘটালে মুক্তি নেই। এই সম্মিলন ঘটাতে বুকে বল লাগে, আল্লাহর উপর অগাধ বিশ্বাস ও কাজে সততা লাগে, নিজের লোকগুলোর জন্য আকাশ সমান ভালবাসা থাকা লাগে। পুরো বাংলাদেশকে নিজের সন্তান ভাবা লাগে। আর হ্যাঁ, মানুষটার নামটা শেখ মুজিবুর রহমান হতে হয়। তাহলেই এত সরল ভাষায় এই জটিল কথাগুলো বলা যায়!
অসীম মুগ্ধতা নিয়ে পড়ছি ‘কারাগারের রোজনামচা’। স্যালুট, পিতা।

Being Human

This morning I took a BRTC bus. There was a little girl standing beside my seat. She was around five, not big enough to balance herself in a moving bus. To her mum, she was comparatively bigger than the other child. The poor mum could not take two kids in her arms at the same time. So, the little girl was trying to help herself. I took her on my lap and looked at the back to make sure that her mum knew that she was safe with me. To my surprise, I found the other passengers to be a little uneasy with this situation. Why? Because the girl’s dress suggested that she belonged to a poor family. May be her mum was a garment worker or something like that. I did not mean to start a revolutionary movement with my action. Being a Bangalee woman, to offer my lap to a child seems to be the most natural thing to do. Why does it seem so strange? Being completely unaware of the complexities of life, my Bangalee princess pushed herself a bit more towards me so that she could sit comfortably. I loved that!

Finally, when the bus reached my destination, she went back to her Mum. While I was trying to reach the bus door through the crowd, I had to get the attention of the women standing beside my seat. Being unsure about how to address those ladies (Auntie or Apa), I just said, ‘Excuse me.” That worked!!! The looks on their faces changed. Wow! My prestige among Bangalees was regained by some English words!

Can’t help but mentioning that this is March – the glorious month of Independence! 46 years back, we were united as a nation – we were determined to fight against all sorts of injustices and discriminations. Seems like a myth sometimes.

Tilt Up আয়নাবাজি

একসময় সিনেমার স্ক্রিপ্ট আর বীজগণিতের অঙ্কে কোন তফাৎ ছিল না। চিরচেনা ফর্মুলা, কেবল সংখ্যা বা বর্ণ এদিক ওদিক হতে পারে। গল্পের বিষয়বস্তু ঠিক হওয়ার আগেই প্রযোজক, পরিচালক, আর চিত্রনাট্যকার বসে ঠিক করতেন, ৭টা গান, ৫টা ফাইটিং সিন, ২টা কিস সিন থাকবে , এর মধ্যে ৩টা গানের শুটিং ব্যাংককে হবে। ব্যস, এবার চিত্রনাট্যকারকে বলা হল- এই ফমুর্লায়একটা স্ক্রিপ্ট লিখে দিতে।
বিরক্ত হয়ে যদি ভারতীয় ছবি দেখতে গেলেন তো সেখানেও ফমু‍র্লা। কোন কোন ছবি দেখলেই বোঝা যায, গল্পকে ছাপিয়ে তথাকথিত ‘সাহসী’ দৃশ্য দেখানোই পরিচালকের মূল লক্ষ্য ছিল। কোন্ জিনিসটা গল্পের প্রয়োজনে এসেছে, আর কোনটার কারণে গল্প বানানো হয়েছে- সেটা বোঝার মত বোধবুদ্ধি কিন্ত দর্শকের আছে।
সেদিক দিয়ে #আয়নাবাজি বিরাট ব্যতিক্রম। সমস্ত ফর্মুলাকে উল্টেপাল্টে দিল। একেবারেই অন্যরকম গল্প।
শুরুতে খুব বেশি প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে বসি নি। বন্ধুরা একসাথে হ্যাংআউট করতে যাওযাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।
সাথে আমার বিদেশী সহকর্মীটা ছিল। ও বাংলাদেশকে ভালবাসে কিন্তু বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে এখনো ওর তেমন ধারণা গড়ে ওঠে নি। আমার খুব ইচ্ছে ছিল ভাল মানের একটা বাংলা ছবি ওকে দেখাব। সে দিক দিয়ে আয়নাবাজি একদম পারফেক্ট মনে হয়েছিল আমার কাছে। মেকিং যে ভাল হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু শেষ মেশ কী হল, জানেন?ছবি যখন শেষ, যখন নাম উঠতে থাকল, তখন কোন কোন বাঙালি উঠে যেতে থাকল কিন্তু আমার বিদেশী বন্ধু বসেই আছে। বললাম, যাবা না? ও হাঁ করে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর একটু থাকি।’ ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বাজছে- লাগ, ভেল্কি লাগ, আয়নাবাজির ভেল্কি লাগ। আমি বুঝলাম, ভেল্কি লেগে গেছে। অমিতাভ রেজার সৃষ্টির গৌরব তখন আমার বাঙালি বাংলাদেশী সত্তাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। ওই বিদেশী তখন আবিষ্ট আর আমি কৃতজ্ঞ অমিতাভের প্রতি।
অভিনযের কথা আর কী বলব? চঞ্চল চৌধুরী ভাল অভিনেতা জানতাম কিন্তু এমন অসহ্য সুন্দর একটা পার্ফরমেন্সের জন্য সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না। প্রতিটা ক্যারেক্টারে যখন চঞ্চলের রুপান্তর ঘটছিল তখন মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করলাম, একেকজনের ইডিওসিনক্রেসি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অত্যন্ত মুন্সীয়ানার পরিচয দিয়েছেন। অসংস্কৃত দুশ্চরিত্র প্রথম অপরাধী কথায় কথায় কুঁচকিতে হাত দেয়, দ্বিতীয়জন অপ্রকৃতিস্থের মত ঘাড় গুঁজে তাকিয়ে থাকে আর চিৎকার করে ইংরেজি ফুটায়। তৃতীয় জন তো ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। আত্মগত স্বরে কিছুক্ষণ পর পর রেটরিক কোয়েশ্চেনের মত করে লোকটা ‘হুম’ করে শব্দ করে। তার নিয়ন্ত্রণকামী মানসিকতা প্রকাশরে জন্য এর চেয়ে ভাল কোন বৈশিষ্ট্য কিছু কি হতে পারত? মনে হয় না।
আমার শহরটাকে এর আগে আমার কাছে কোন ছবিই এভাবে তুলে ধরে নি। হলিউডের ছবির তুষারপাত, ছবির মত সাজানো রাস্তাঘাট দেখতে খারাপ লাগে নি কখনো। কিন্তু মনের কোণে এই অনুভূতিটা থাকত যে, ওগুলো সব পরের বাড়ির চিত্র। আমার পারিপাশ্বি‍র্কতার সাথে ওসবের কোন মিল নেই। এমনকি ভারতীয় বাংলা ছবিতে ভাষা আর চেহারায় নিজেদের সাথে এত মিল থাকা সত্তেও কোনদিন নিজের চারপাশটাকে রিলেট করতে পারি নি। ওদের নায়ক নায়িকা কলকাতার যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, সেটা আমার অচেনা। কিন্তু আয়নাবাজির সেটিং দেখে কিছুক্ষণ পরপর আমার মুখ দিয়ে বের হয়েছে- আরে এটা আমার বাড়ির রাস্তা! আরে এটা অমুক সরণি, দেখেছিস ্ওই ফ্লাইওভারের কাছে গিয়ে শুটিং করছে! সবাইকে ছাপিয়ে বিদেশীটা আবার সবার আগে বলে উঠল, “শ্য্যামা, দেখ, ওল্ড ডাকা”।
আয়নাবাজির এই বিশাল জনপ্রিয়তার মূলে বোধহয় এটাই ছিল। আমরা অনেকদিন পরে একটা মুভি পেয়েছিলাম যেটা আমাদের। সেটিং আামাদের , অ্যাকসেন্ট আমাদের। তবু অভিনয় আর গল্পটা দেশ, কাল, ছাপিয়ে আবেদন তৈরি করতে সক্ষম।
রোমান্সের ক্ষেত্রে মাত্রাবোধ দেখিয়েছে এই ছবি। এটা আমার ভাল লাগার আরো একটা কারণ। বেশিরভাগ পরিচালক ‘সাহসী’ দৃশ্য দেখানোর অজুহাত খোঁজেন। কিন্তু ইনি তার ধারকাছ দিয়েও যান নি। আর তাই, আমি দুবার আয়নাবাজি দেখে ফেলেও তৃতীয়বারের মত আমার মা আর খালামণিদের নিয়ে মুভিটা দেখতে যাওয়ার কথা ভাবছি। কারণ আমার বিব্রত হওয়ার মত কোন কারণ পরিচালক ঘটান নি।
স্বপ্নের মত একটা রোমান্স দেখানো হয়েছে।নায়কের খ্যাতির প্রতি তেমন মোহ নেই। অভিনয় করার জন্য তার রক্ত খেলা করে। তাই সে বাস্তব জীবনে অভিনয় করে। নাটকে সিনেমায কোন চেষ্টা করে নি। নায়িকা ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষ করে বাড়িতে বসে আছে সন্তুষ্টচিত্তে। সামাজিক প্রত্যাশার চাপটা যদি না নিতাম, তাহলে আমরা বেশিরভাগ মানুষই বোধহয় নায়িকার মত এরকম একটা শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন বেছে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তা হবার উপায় নাই। তাই পর্দায় কিছুক্ষণ স্বপ্নের মত জীবনটা দেখতে বড় ভাল লাগছিল। নায়িকা রোজ নৌকায় করে নায়ককে দেখতে আসবে। আ কাপ অব কাপুচিনোর বদলে রঙচায়ের জীবনের সৌন্দর্যটাকেই সে বেছে নিচ্ছে। খুব বেশি কিছু না জেনেও ভালবেসে ফেলার রোগটা টিনএজে থাকে। কিন্তু এখানে দুজন ম্যাচিউরড মানুষকে দেখানো হল যারা জীবনটাকে জেনেবুঝে উপভোগ করতে চাইছে।
বৃষ্টির শটগুলো ভাল্লাগছে। এক এক সময় একটা ার্থ প্রকাশ করেছে। কখনো কখনো অসহায়ত্ব, কখনো, ঘোর অন্ধকার জীবনে ঢোকার পূর্বমুহুর্ত আবার কখনো সবকিছু ধুয়ে যাওয়ার ব্যঞ্জনা।
Tilt Up আয়নাবাজি কেন বলছি? কারণ বছরখানেক আগে একবার বাসার গেট দিয়ে ঢোকার সময় অমিতাভ রেজাকে দেখেছিলাম। আমি গেট দিয়ে ঢুকছিলাম আর উনি বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তার মুখটা আমার মোটেই পরিচিত ছিল না। কিন্তু তার চেখের দৃষ্টিটা আমার বড় অদ্ভূত লেগেছিল। কেমন যেন মাথাটা নীচু করে রেখে চোখ উঁচিয়ে তাকানো। তার কিছু লাইভ ভিডিওতেও দেখলাম একই কাহিনী। দৃষ্টিটা দেখে মনে হয়, উনার চোখমুখ বলে উঠছে-Tilt Up! তার দৃষ্টিটা এমন অদ্ভূত বলেই বোধহয় তিনি জগতটাকে আমাদের চাইতে একটু অন্যভাবে দেখেন। আমাদের মত একরৈখিক দৃষ্টি না বলেই হয়ত এমন একটা মুভি বানানো তার পক্ষে সম্ভব হল।।
অবশ্য আমি এখনো ভেবে পাই না, ভদ্রলোক বাংলাদেশী মুসলমান নিয়ে এমন অদ্ভূত বয়ান কেন দিয়েছিলেন? ইচ্ছে করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন? যাতে মানুষ বিষয়টা কী তা বোঝার জন্য হল অবধি যায়?নাকি পুরো পরিবার একসাথে বসে মুভিটা দেখতে পারবে (যেটা ভারতীয় মুভির ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে না) এই বিষয়টা বোঝাতে গিয়ে এই কথাটা বলেছিলেন? কী জানি! বড়মাপের শিল্পীরা যে বড় মাপের ব্যবসায়ী হবেন না, এমন তো কোথাও লেখা নেই। তবে উনি ব্যবসা করুন আর যাই করুন, এরকম আরো মুভি বাংলাদেশে তৈরি হোক।

টেইক আ বাও, #অমিতাভরেজা। আপনার অজান্তেই আপনি বহু বাঙালি বাংলাদেশীর ব্যক্তিগত অানন্দ আর গৌরবের কারণ হয়েছেন। আপনাকে ধন্যবাদ।