স্বপ্নমঙ্গল ৪

খুবই ফেমিনিস্ট এবং সারকাস্টিক একটা ঘটনা ঘটে গেল চোখের সামনে।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। দেখলাম, এক মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গোসল করছে। এটা গ্রামের পুকুরঘাট না। শহরের ফুটপাথ। এখানে এরকম দৃশ্য বেশ বিরল। কৌতুহলী লোকজন আশেপাশে ভিড় করেছে। একপাশে শুকনো কাপড়-চোপড় রাখা। আমি কাছাকাছি আসতে আসতে মেয়েটা ততক্ষণে কাপড় চোপড় বদলাতে শুরু করেছে। ভয়ানক ব্যাপার! ব্যাপারটা আমার জন্য আরো বেশি ভয়ানক হয়ে উঠল যখন দেখলাম যে, মেয়েটা আমার পরিচিত। আমার অফিসের জুনিয়র কলিগ।

হায় হায়! আমার এখন কী করা উচিত? মেয়েটাকে নিশ্চয়ই থামানো উচিত। আমি ওর নাম ধরে ডাকলাম। মেয়েটা কী এক অভূতপূর্ব কায়দায় উপরের কামিজটা বদলে ফেলেছে। ছেলেরা যেমন করে লুঙ্গি পরা অবস্থায় প্যান্ট ছাড়তে পারে-সেরকম ভাবে। কিন্তু কামিজের ক্ষেত্রে কী করে সেটা সম্ভব হল আমি ঠিক বুঝলাম না। পোশাক পরিবর্তনের এমন কোন কায়দা আমার জানা ছিল না। চোখে দেখেও ব্যাপারটা ঠিক বাস্তব মনে হচ্ছে  না।

এবার সে পাজামা বদলাবে। এমন সময় দেখা গেল ফুটপাথের ওপাশে তিনজন ভদ্রলোক বসে আছেন। তাদের মধ্যে একজন এই ঘটনার ভিডিও করছেন। আমি গিয়ে মেয়েটাকে ওখান থেকে সরিয়ে আনছি এমন সময় ওই মেয়েটা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, “গায়ের পোশাক দেখে তো ভদ্রলোক মনে হয়, একটু আগে একটা দরকারে কথা বলতে গেছিলাম তোর সাথে। এমন ভাব করলি যেন তুই কোন নবাবজাদা। নবাবজাদা ছাড়া কথা বলিস না। এখন ভিডিও করতে আসছিস যে? এখন খুব মজা লাগছে আমাকে দেখতে?

লোকটা খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সাথে থাকা বাকি দুই তাবেদারও চুপসে গেল। তবে এই শ্রেণীর লোকেরা খুব দ্রুত ফর্মে ফেরার চেষ্টা করে। এবং সেটা অবশ্যই নোংরামির মাধ্যমে। এই লোকটাও তার ব্যতিক্রম নয়। কুৎসিত গালাগালি আরম্ভ করল।

মেয়েটাকে আমি সরিয়ে আনলাম।  অফিসে প্রায়ই দেখেছি ওকে। কিন্তু কথা বলা হয় নি। আজকে ওর প্রতিবাদী রূপটা দেখে ওর সম্পর্কে খানিকটা ধারণা হল। ও আমাকে বলল, ম্যাডাম, আমাদের বাসায় আসেন। আমি গেলাম ওর সাথে। দেখলাম, আরো অনেক স্টাফই ওই একই বিল্ডিংয়ে থাকে।

বেশ কিছুদিন আগে এক স্টাফ আমার কাছ থেকে একটা বই ধার করেছিল। ফটোকপি করে নিতে চেয়েছিল। তাকেও দেখতে পেলাম। তার কাছ থেকে বইটা ফেরত নিলাম। আমার বই কারো কাছে ফেলে রাখতে কেমন অস্বস্তি হয়।  ওদের ঘরের বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় একটা ছেলে আমার কাছে এসে বইটা দেখতে চাইল। এই ছেলেটা আমাদের কোন স্টাফ নয়। আমি ওকে চিনি না। আমি বইটা ওকে দিলাম না। ছেলেটা বেশ রেগে গেল। দেখলাম, সে এবার ওই ফ্লোরেই আমাদের এমডির ঘরে ঢুকে গেল। এমডিকে দরজার বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল না। ছেলেটাকে দেখা যাচ্ছিল। আমার দিকে আঙুল দিয়ে কিছু বলছিল।

এমডি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি ভিতরে গিয়ে চমকে উঠলাম। এমডির চেয়ারে এ কে? এই লোক তো আমাদের এমডি নয়! এই মূহুর্ত থেকে মনে হতে লাগল, আমি স্বপ্ন দেখছি। উনার চেহারা, কথা বলার ভঙ্গি সবটাই কেমন অদ্ভূত। উনি আমাকে চেনেন না। আমিও উনাকে চিনি না। কিন্তু উনি আমার বিচার করতে বসে গেলেন। বললেন,  “আপনি অফিস টাইমের বাইরেও স্টাফদের সাথে মেলামেশা করছেন। তাদেরকে জার্মান শেখার বই ধার দিচ্ছেন। তার মানে, তাদেরকে আপনি চাকরি ছেড়ে বিদেশে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করছেন। আপনার কথার বলার ধরণটাও একটু কেমন কেমন যেন।”

এইসব যুক্তি খুবই অদ্ভূত লাগল। যেহেতু বুঝে গেছি, এটা স্বপ্ন, অতএব, এখান থেকে বের হয়ে আসার জন্য চোখ খুলে ফেললাম। চাইলে, আরো কয়েক মূহুর্ত লুসিড ড্রিমিং করা যেত। কিন্তু ইচ্ছে হল না।

চোখ খু্লে আমার ওই জুনিয়র সহকর্মীর কথা ভাবতে লাগলাম। এরকম অদ্ভূতভাবে ও রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেন পোশাক পরিবর্তন করছিল? সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট? আজকাল এরকম ভিডিও বানানোর একটা ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। কিন্তু এই মেয়েটা আমার আগের জেনারেশনের। তার বয়স, সামাজিক অবস্থান, আর্থিক সঙ্গতি কিছুই এই সোশ্যাল ট্রেন্ডের সাথে মানানসই না। তাহলে স্বপ্নে এরকম অদ্ভূত ব্যাপার কেন দেখলাম?

আমি নিজে এধরণের সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্টের ভিডিও খুব একটা দেখি না। আজকাল ভাইরাল হওয়ার জন্য, আলোচনায় থাকার জন্য মানুষ যা নয় তাই করছে। আমার স্বপ্নে দেখা মেয়েটা প্রতিবাদী ছিল কিন্তু তার এই প্রতিবাদের আগের ঘটনাটার কোন যৌক্তিকতা আমি খুঁজে পেলাম না। অবশ্য তার এই কাজের আগেও ঐ লোকগুলোর সাথে তার কী যেন হয়েছিল। সেই ঘটনাটা তো আমার জানা হয় নি। তবুও মেয়েটার এই কাজটা আমার কাছে উদ্ভটই মনে হচ্ছিল।

আজকাল অ্যাটেনশন সিকিং, ফেমিনিজম, যৌক্তিক প্রতিবাদ, ট্রোলিং, রোস্টিং- সবকিছু একাকার হয়ে গিয়ে মানুষের পার্সপেক্টিভগুলো কেমন গুলিয়ে গেছে। এই পোস্ট-মর্ডান যুগে একই ঘটনার শতরকম ব্যাখ্যা থাকে। সবাই নিজের নিজের যুক্তি খুবই গ্রহণযোগ্য ভঙ্গিতে দিতে থাকে।

আবার স্বপ্নের পরের অংশে নিজেই কেমন একটা আজব বিপদের মধ্যে পড়ে যাচ্ছিলাম। পরিচিত এমডির জায়গায় অচেনা এমডি। একই বিল্ডিংয়ে কর্মচারীরা বাস করছে, এমডি অফিস করছে। স্বপ্ন বলেই সম্ভব।

তবে আজকের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্যে থেকে কী অনায়াসে বেরিয়ে এলাম। চোখ খুললাম। দুঃস্বপ্ন মিলিয়ে গেল। বাস্তবটা এমন কেন হয় না?  

ছায়ার মতন তাদের ছায়ায়


তারা কেউ আমার ছায়া নয়। আমিও তাদের ছায়া নই। কিন্তু আমি তাদের ছায়ায় ছায়ায় চলছি। কখনো কখনো তারা আমার ছায়ায় ছায়া মিলিয়ে দিয়ে দাঁড়ায়- আমাকে আগলে রাখার জন্য। কখনো আমি দাঁড়াই তাদের ছায়ায়।

বড়বেলা, অর্থাৎ বয়স্কবেলার বন্ধুত্বগুলো খুব অন্যরকম। জীবনে একটা সময় আসে যখন সহকর্মীরা জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে- খানিকটা ভাল লাগা জুড়ে, অনেকটা খারাপ লাগা জুড়ে। কর্মজীবনে চাইলেই কোনকিছু ছেড়েছুড়ে চলে আসা যায় না। ছোট্টবেলার মত নাকের পাতা ফুলিয়ে ‘তুমি আমাকে না দিয়ে চকলেট খেলে তো! তোমার সাথে আড়ি!’ -বলে চলে আসা যায় না। আঙুলে আঙুলে বুলিয়ে কাট্টি নেওয়া যায় না। ছাত্রজীবনে কখনো কখনো বন্ধু বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে।কিন্ত কর্মজীবনে সহকর্মী বাছার সুযোগ থাকে না।

কিন্তু প্রতিদিন ইচ্ছেয় হোক, অনিচ্ছেয় হোক, আর অভ্যাসবশতই হোক, আমরা অনেকগুলো ঘন্টা সহকর্মীদের সাথে কাটাই৷ ডেস্কজবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো নিবিড়। প্রতিদিন আট/দশ ঘন্টা কয়েকটা মানুষের সাথে মুখোমুখি/পাশাপাশি বসে কাটে। মনের অজান্তেই তাদের মুখের রেখাগুলোর সাথে আমরা পরিচিত হয়ে যাই। সে রেখায় এতটুকু বদল হলে আমরা বুঝে ফেলতে শুরু করি। গলার স্বরের এতটুকু উত্থান-পতনও আমাদের কান এড়ায় না। ভালো লাগুক বা না লাগুক, নিজের অজ্ঞাতসারেই একটা মায়ায় জড়াতে থাকি আমরা। পরিবার একটা বন্ধন, কাজের জায়গা আর একরকম বন্ধন। এই মানুষগুলো প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আপনাকে দেখতে অভ্যস্ত। তাই, আপনার অনুপস্থিতি তাদের চোখে খুব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আপনি যদি তাদের প্রিয় না হন, তবুও।
আমার কাজের স্মৃতি বেসরকারি আর সরকারি- দুভাগে বিভক্ত। লক্ষ্য করেছি, সহকর্মীদের অনেকেই আস্তে আস্তে সহমর্মী হয়ে উঠেছেন। কেউ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেন্টর, কেউ গার্ডিয়ান, কেউ সঙ্গী, কেউ যে কোন প্রয়োজনে প্রথম ভরসাস্থল হয়ে উঠলেন। পরিবারের বাইরে এ-ও আরেক পরিবার।

গভীর বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি, সব কিছু শেয়ার করতে পারার মত বন্ধুগুলোকে আমি আমার দুই কর্মস্থল থেকে পেয়েছি।দেশ-কাল-বয়সের সীমানা ডিঙোনো বন্ধুত্ব। অথচ বন্ধুত্ব বলতে মানুষের চোখের সামনে সাধারণত ছাত্রজীবন ভেসে ওঠে। আমারও আনন্দের স্মৃতি আছে ছাত্রজীবনের বন্ধুদের সাথে। কিন্তু কর্মজীবন আমাকে কিছু পরিণত বন্ধুত্বের স্বাদ দিল। নিজের অর্থনৈতিক এবং পরিবারিক রেসপনসিবিলিটি নিতে অভ্যস্ত এই মানুষগুলোর কেউ কেউ অন্যের অনুভূতি ডিল করার ক্ষেত্রেও খুব পারদর্শিতার পরিচয় দিয়ে থাকেন।

এই মায়ায় জড়ানো মানুষগুলো দু:সময়ে আমাকে আগলে রেখেছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ আমার সমবয়সী। আমার বেহিসেবী জীবনে কোন অঙ্ক মেলে না। এদেরই একজন আমার অঙ্ক মেলায়। নিজে জ্বরে ভুগতে ভুগতেও আমার বেতন-বোনাসের হিসাব কষে দেয়। সাগরে দাঁড়িয়ে আমি স্রোতের টানে ভেসে যাওয়ার মুহুর্তে নিজেকে বিপন্ন করে আমার হাতটা ধরে রাখে।
কেউ কেউ বয়সে, অভিজ্ঞতায় অনেক বড়। তাদের বন্ধু বলে ডাকাটা আমার ধৃষ্টতা হবে হয়তো। কিন্তু বিপদে তারা অকৃত্রিম বন্ধুর পরিচয়ই দিয়েছেন।

আমার সকল সহমর্মী বন্ধুদের বন্ধু দিবসের শুভেচ্ছা।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমার সব বন্ধুরা আমার প্রিয়। কিন্ত ২০১৫ সালের পরে আমার জীবনে আসা বন্ধুদের নিয়ে কিছু লেখা হয় নি। তাই, লিখলাম। এটিকেটনির্ভর এই বড়বেলায় সবার ছায়াকে ক্যামেরাবন্দী করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু আমার লেখাটুকু তাদেরকে ধারণ করে আছে। বন্ধু দিবস আজ নাকি ৩০ জুলাই- সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।