হঠাৎ আলোর ঝলকানি

টাইম ট্রাভেল করে যদি ছোট্টবেলায় ফেরা যেত আমরা কি সেই সময়টাতে থেকে যেতে চাইতাম? শিশুপার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেলতে থাকতাম নাকি মনে পড়ে যেত যে চুলায় ভাত বসিয়ে এসেছি? ফিরে গিয়ে ফ্যান গালতে হবে?

আজ সকালে ওরকমই একটা ঘটনা ঘটল। ছোট্টবেলার ক্রাশ মিটিং করছে আমার বাবার সাথে। বাবা জানে না সে আমার ক্রাশ। বাবা খুব আনন্দের সাথে তার সাথে কথা বলছে। আমি এদিকে আমার ঘরে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছি। একটা ট্রান্সলেশন প্রজেক্টের রিভিউয়ের কাজে আমি ব্যস্ত। ওঘরে গেলে আজ ২০ বছর পর এই লোকটার চেহারা দেখা যাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে তার বর্তমান চেহারার সাথে পরিচয় আছে আমার। তিনি হলেন সফলতার শীর্ষে ওঠা মানুষ। আর আমি হলাম শ্রমজীবী মানুষ- আমার ঘরের মধ্যে বসে দিন আনি দিন খাই চুক্তিতে কী-বোর্ড পিষে যাচ্ছি। বাবা হেডফোন ব্যবহার করছে না। তাই, ভদ্রলোকের গলা আমার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

আমি বাইরের ঘরে গেলেই তার সাথে ভার্চুয়ালি দেখা হবে। কিন্ত ইচ্ছে হচ্ছে না। আমার খুব বাছা বাছা দু একজন বন্ধু ছাড়া কারোর সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না। কারণ ঐ হাতে গোণা বন্ধুদের সাথে আমার কথার টপিকের অভাব হয় না। কিন্তু বাকিদের সাথে? ওরে বাবা! ভেবে দেখেছি- কথা বলতে গেলে ধরা বাঁধা কয়েকটা লাইনের পরে আমি ভারি বিপন্ন বোধ করি। প্রথমে মুখস্থ কয়েকটা লাইন আওড়ে যাই- “আপনি কেমন আছেন, আপু/ভাইয়া/আন্টি/আংকেল? বাবুরা ভালো? বাসায় আসেন একদিন। অনেকদিন দেখা হয় না। করোনার সময় সাবধানে থাকবেন। খুব ভাল লাগল আপনার সাথে কথা বলে।” ব্যস, স্ক্রিপ্ট শেষ। আমার মনে হতে থাকে, আমার কথাটি ফুরোল, নটে গাছটি কখন মুড়োবে? এই বাঁধা স্ক্রিপ্টের শেষে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে। ফোনের ওপাশের মানুষটা আলাপে দক্ষ হলে আরো দু একটা কথা বলে ওঠেন। নইলে আমার মা অথবা বাবাকে ফোনটা দিতে বলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।

তিনি বাসার লোকজনের খোঁজ নিচ্ছেন। আমার বোধহয় এবার যাওয়া উচিত। কারণ তিনি জেনে গেছেন যে আমি বাসায় আছি।

মুখস্থ স্ক্রিপ্ট রেডি করে চলে গেলাম। বাবার ফোনে ভিডিও কল চলছে। আমি গিয়ে ফোনের কাছে মাথাটা গলিয়ে অত্যন্ত সপ্রতিভ ভঙ্গিতে বললাম, হাই! উনি আমাকে দেখে হাসার কথা ছিল। আগে দেখা হলেই হাসতেন। অথবা আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য একটা বিশেষ মুচকি হাসি রেডি করে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কিন্তু আজ আমাকে দেখে একটু চমকে গেলেন মনে হল। এই চমকটা আমার স্ক্রিপ্টে ছিল না।

আমি তার ডায়ালগ ডেলিভারির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। তার ডায়ালগ ডেলিভারি দিতে একটুও দেরি হল না। আন্তন চেখভের পাঠক এত সহজে হতবুদ্ধি হন না। বললেন, আরে! তোমার দেশে তো লকডাউন চলছে! কেমন লাগছে বাবা-মার সাথে লকড আপ হয়ে থাকতে?

আমি বললাম, খুব ভাল। আমি তো খুব ভাল একটা মেয়ে। মা-বাবার সাথে থাকতে আমার ভালই লাগে। তিনি বললেন, ‘না না, তোমার খারাপ লাগবে তা আমি ভাবি নি। তোমার বাবা-মার কথা ভেবে খারাপ লাগছে। তুমি চব্বিশ ঘণ্টা তাদের সাথে আছ তো! কীসের মধ্যে দিয়ে যে যাচছে বেচারারা।

নাহ্। কথার ধাঁচ বিশ বছরেও বদলায় নি লোকটার। এবার বললেন, ‘তোমাকে যখন দেখেছিলাম তখন তুমি একটা child। আর এখন তুমি শিক্ষিকা। আমি বললাম, “সেই। তাহলেই বোঝ আমার যারা ছাত্র তাদের কী অবস্থা।” তিনি বললেন, বেচারাদের জন্য আমার অলরেডি দুঃখ হচ্ছে।” আমি চোখ পাকিয়ে বললাম, কী? সে বলল, কিছু না। দুষ্টুমি করলাম।” আমি বললাম, জানি। যাহোক, ভালো থাক। ‘ বাবাকে ফোনটা দিতে যাব, সে বলে উঠল, শেষ যেবার কথা হয়েছিল সেটা ছয় বছর আগে তাই না? ” আমি বললাম, “হ্যাঁ। বাবার কাছে ফোনটা দিই যাতে তুমি বাবার সাথে কথা বলতে পার।”

ওকে আর কোন কথা না বলতে দিয়ে বাবাকে ফোনটা দিয়ে চলে এলাম। তিনি বাবার সাথে কথা বলতে লাগলেন। আমি আবার আমার দিন মজুরি শুরু করার আগে দেখলাম, আমার ফোনে পরিচিত নম্বরের পরিচিত মেসেজ- গুড আফটারনুন। আমি এখন বাইরে যাচ্ছি। ব্রেকফাস্ট করেছি।

আমিও উত্তর দিয়ে দিলাম- স্টে সেফ। ডোন্ট ফরগেট ইওর মাস্ক।

কে না জানে কল্পনায় অতীতের শিশুপার্কের রাইডে না উঠে বর্তমানের ভাতের মাড় গালা বেশি প্রয়োজনীয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s