স্বপ্নমঙ্গল (১)

আমি একটা ইন্টারভিউয়ের জন্য তৈরি হচ্ছি। ইন্টারভিউটা ঠিক কী বিষয়ক জানি না। তবে হলে থাকি এবং ইন্টারভিউ যিনি নেবেন, তাকে সবাই খুব ভয় পায়। আর কোনো এক অজানা কারণে ইন্টারভিউটা প্রত্যেকটা হলবাসীর জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ।

কয়েক দিন ধরেই ইন্টারভিউ নিয়ে চাপা উত্তেজনা। আমার ভেতরেও টেনশন কাজ করছে। ভদ্রলোক যে ঘরে বসে থাকেন, সে ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ থাকে। উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট কখনো দরজা খুললে বাইরে থেকে উনাকে দেখা যায়। অদ্ভূত সুন্দর একটা চেহারা। টিভিতে হুবুহু এই চেহারার এক অভিনেতাকে দেখেছি। খুব লম্বা – স্বপ্নপুরুষ টাইপ একটা চেহারা।

ভদ্রলোক কী ধরণের প্রশ্ন করতে পারেন? সাইকোলজিক্যাল টেস্ট টাইপ কিছু? আমি যদি কোন উত্তর দিতে না পারি? আচ্ছা, উনার কাছে নিজেকে এত প্রমাণ করার ইচ্ছে হচ্ছেই বা কেন?

আজ হঠাৎ কয়েকটা মেয়েকে তার রুমের বাইরে বসে থাকতে দেখলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার। জানলাম, গতকাল থেকে ইন্টারভিউ শুরু হয়ে গেছে। হায় হায়, আমি রোজ এদিক দিয়ে যাওয়া আসা করছি। আর খোঁজই পেলাম না! আমার সিরিয়াল মিস হয়ে গেছে। আমার পরিচিত একটা মেয়ে ছিল সিরিয়ালের দায়িত্বে। সে বলল, সে আমাকে জানাতে ভুলে গেছে। আরো বলল, আমার ইন্টারভিউ নেয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। একটু অপেক্ষা করতে বলল।

সবাই দেখলাম, মিষ্টি খাচ্ছে। জানতে চাইলাম, কীসের মিষ্টি। জয়ন্তিকা নামে কোন মহিলার জন্মদিনের মিষ্টি। এই মহিলা নাকি ইন্টারভিউয়ারের জীবনের বিশেষ মানুষ। সেই বিশেষ মানুষটার সাথে সমাপ্তিটা মিলনান্তক নয়। সহকারী মেয়েটার চোখেমুখে কেমন একটা জ্বালা। এই লুকটা আমি চিনি। ঈর্ষা আর অক্ষমতার দৃষ্টি।

অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটা যেন কোনদিকে চলে গেল। অন্যরাও সবাই চলে গেল এদিক ওদিক। ব্রেক চলছে। হঠাৎ ভেতর থেকে বেল বেজে উঠল। সহকারী মেয়েটা তো এদিকে নেই! ওর নম্বরটা বের করার চেষ্টা করছি। অমনি বেলটা আবার বেজে উঠল। আমার কি ভেতরে গিয়ে বলা উচিত যে সহকারী এখন নেই? সেটা কি ঠিক হবে? আমার সিরিয়ালটাও তো মিস হয়ে গেছে! ঢোকাটা বোধহয় উচিত হবে না। কিন্তু উনি নিশ্চয়ই কোন প্রয়োজনে ডাকছেন।

আমি ভিতরে গেলাম। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু মুখে আমার দিকে তাকালেন। আমার ভেতরে খুব টেনশন কাজ করছে। উনি আমাকে কী প্রশ্ন করবেন? আমি তার কোন বোকা বোকা উত্তর দিয়ে ফেলব না তো?

উনি আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

আবারও বেল বেজে উঠল। কিন্তু উনি তো বেল বাজান নি। তাহলে?

ওহ্! বেলের শব্দটা এই ঘরের বাইরে থেকে আসছে। আমার ফ্ল্যাটের দরজায় বেল বাজছে। আমার স্বপ্নের পর্দাটা ভেদ করে রিয়্যালিটি ঢুকে পড়ল।

আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার। চোখটা বন্ধ করেই রাখলাম যাতে এই আপাত অপ্রয়োজনীয় রিয়্যালিটি থেকে আবারও ঐ ইন্টারভিউ রুমে ফিরে যেতে পারি। যাওয়া হলো না। চোখের সামনে থেকে ঘরটা মিলিয়ে গেল। জানা হলো না ভদ্রলোক আমাকে কী প্রশ্ন করতেন। আমি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম কীনা তাও জানা হল না। এমনকি ইন্টারভিউটা কীসের তাও জানা হলো না।

জীবনের অসংখ্য অমীমাংসিত প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আরো একটা প্রশ্ন মাথায় নিয়ে ঘুম ভাঙল।

Advertisements

মুরগির বিবর্তন…

দুপুর থেকে মুখিয়ে আছি মুরগি রাঁধব বলে। বাসায় এসে ডিপফ্রিজে রাখা নানান প্যাকেটের ভিড় থেকে খুঁজে খুঁজে মুরগির প্যাকেটটা বের করলাম। মনটা খুশি। বুদ্ধি করে কলেজের রাঁধুনীকে দিয়ে মুরগিটা কাটিয়ে নিয়েছিলাম। রাঁধুনিই বাজার করেছিল, রাঁধুনিই কেটেছিল। মুরগিটাকে আমি চোখে দেখি নি। চেখে দেখাটাই ছিল লক্ষ্য। তবে প্যাকেটে মাংসের টুকরোগুলো বেশিই বড় মনে হচ্ছিল। নাহ্! রীনা নিশ্চয়ই ফার্মের মুরগি কিনেছে। ওকে এরপর থেকে দেশি মুরগি আনতে বলে দেব। পানির মধ্যে পলিথিনে মোড়া মুরগি ডুবিয়ে রেখে আমি আপুকূলের মুরগি রান্নার ভিডিও দেখতে বসলাম। একটা ভিডিও মুখস্থ করে রান্নাঘরে ফিরলাম। ও মোর খোদা! মুরগি তো দেখি গরু হইয়ে গ্যাছে! শুধুমাত্র পানির সংস্পর্শে এসে জমাটবাঁধা মুরগির মাংস গরুর টুকরো হয়ে যেতে পারে! ডারউইন, কোথায় আছো, একবার এসে এই বিবর্তনের ব্যাখ্যা দিয়ে যাও! যাহোক, আমি নব উদ্যমে গরুর মাংসের রেসিপি সার্চ দিলাম। বিধি বাম। ইন্টারনেট নেই। ডাটা কানেকশন দুব্বল! এই ছিরিনগরে এই মুহূর্তে আমি আর একপাত্র কাঁচা গরুর মাংস- অপার হয়ে বসে আছি। মনে পড়ে গেল সেই হতভাগ্য ছাত্রের কথা যে কীনা গরু রচনা পড়ে গিয়েছিল আর পরীক্ষায় এসেছিল শ্মশানঘাটের বর্ণনা। শেষমেশ বেচারি শ্মশানে গরু বেঁধে গরুর বর্ণনা লিখতে আরম্ভ করেছিল। লোকেশন শ্মশান, বর্ণনা গরুর। আজ আমারও সেই দশা। কড়াইয়ে গরু, রেসিপি মুরগির… 🙄

একটা দীঘির গল্প

আমি যেদিন শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে বাসে উঠি, একটা মানুষ উদগ্রীব হয়ে বাসের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার তাকে বারবার বলা লাগে, “গাড়ি আসছে, এখানে এভাবে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ো না। সরে দাঁড়াও।”
বাসের কন্ডাক্টরকে বারবার করে বলে দেয়, “ওকে শ্রীনগরে নামিয়ে দেবেন। ও শ্রীনগর সরকারি কলেজের ইংরেজির শিক্ষিকা।”
বাসের কন্ডাক্টর বারবার মাথা নাড়ে। “হ্যাঁ, আংকেল, আপনি চিন্তা কইরেন না। আল্লাহ ভরসা।”
আমার এদিকে মেজাজ খারাপ হতে থাকে। কন্ডাক্টরকে এত কথা বলার কী আছে? আমি কোন কলেজের শিক্ষক সেটা জেনে কন্ডাক্টর কী করবে?

গাড়ি একটা টান দেয়। ২/৩ সেকেন্ডের মধ্যে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে প্যাসেঞ্জার নিতে। সেই মানুষটা আবার দ্রুত হেঁটে এসে গাড়িটা ধরে ফেলে। আমার বকুনির কারণে এবার আর জানালার কাছে আসে না। জানালার সোজাসুজি ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে।
গাড়ি একটা পর্যায়ে ছেড়ে দেয়, আর দাঁড়ায় না। একদিন এক ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে, এইটা কে, ম্যাডাম? আপনার আব্বু?” আমি মাথা নাড়ি।
ড্রাইভার একটু হেসে বলে, “তাইতো কই, এত খেয়াল তো আর কেউ রাখবো না!”
অত দূরে থেকে বাবা বুঝতে পারে না। কিন্তু প্রতিদিন আমার গলার কাছটা ধরে আসে। কেমন কান্না পায়। ফুটপাতের উপর দাঁড়ানো মানুষটাকে একটা শিশুর মত মনে হয় – আমাকে যার মা হয়ে উঠতে হবে দিনে দিনে। তার অসীম ভালবাসার খানিকটা ফেরত দিতে হবে।
কতটুকু দিতে পারব? শৈবাল দীঘিকে যতটুকু দিতে পেরেছিল ঠিক ততটুকু।

শুভ বাবা দিবস।

ছেঁড়া দ্বীপ

মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনটা বোধহয় একটা খেলা- পাজল সলভ করার খেলা। সৃষ্টিকর্তা হয়তো আমাদের প্রত্যেককে হাতে একটা করে পাজল পিস দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। সবাই নিজের নিজের পিসটা ঠিক ঠিক জায়গায় রাখতে পারলে হয়তো একটা পুরো ছবি দেখতে পেতাম। কিন্তু সবাই খেলার সুযোগই পায় না। আমরা সবাইকে বোর্ডের ধারে কাছে আসতেই দিই না। ওর জামা ছেঁড়া, ওর হাসিটা একটু কেমন যেন। আমি ওর সাথে খেলি না। ও খেললে আমি খেলব না। অথচ সবারই খেলার কথা ছিল। সবাইকেই একই সৃষ্টিকর্তা পাঠিয়েছেন।

বোধহয়, সুনীলের কোন একটা লেখায় একটা লাইন ছিল। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, ঘাতকেরা গান শোনে কীনা। এরকম প্রশ্ন আমার মনেও জাগত। এরশাদ শিকদার যখন শাহরুখ খানের ‘কয়লা’ মুভিটা দেখত, তখন সে কার পক্ষ নিত? সে-ও কি সাধারণ দর্শকের মত শাহরুখের জয় চাইত নাকি অমরেশ পুরীর জয় চাইত? তার তো অমরেশ পুরীর সাথে নিজেকে আইডেন্টিফাই করার কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এরাও গান গায়, গান শোনে, এরাও মুভি দেখার সময় নায়কের পক্ষ নেয়।

ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকত না। এখনো খুব একটা ঢোকে না।

আমার শুধু মনে হয়, প্রতিটি মানুষ এক একটা চলন্ত উপন্যাস। সে উপন্যাসের পাতায় পাতায় চাপা পড়ে আছে দীর্ঘশ্বাস, আনন্দ, টুকরো টুকরো আকাঙ্ক্ষা। অথচ পুরোটা পড়বার কেউ নেই।

সবাই লিখতে ব্যস্ত। কিন্তু একটা জরুরী কথা কারোর মাথায় থাকে না। আমার উপন্যাসের লেখক আমি একা নই। আরো অসংখ্য মানুষ আছে আমার চারপাশে। তারা সবাই নিজের ডায়ালগ, নিজের অ্যাকশন নিজে হাতে লিখতে চায়। সবচেয়ে মজার কথা হল, অন্যের চরিত্র আর সংলাপটাও আমরা নিজের মত করে লিখতে চাই।

কিন্তু মেলে না। শেষমেশ কারো প্লট কারো সাথে মেলে না। দিনশেষে সবাই এক একটা বিচ্ছিন্ন ছেঁড়া দ্বীপ হয়ে বসে থাকে।

আমার কাজের মাঝে মাঝে…

ভদ্রলোক ফ্লার্টিংকে আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। প্রায়ই দুষ্টুমি করেন। প্রথম প্রথম চিন্তা হত – উনি কি সিরিয়াসলি বলছেন? পরে বুঝে গেলাম ঘায়েল করতে হলে আমাকেও ফিরতি আঘাত করতে হবে- তাহলে উনি থেমে যাবেন।

সেদিন বললেন, কক্সবাজার যাই চলো। আমি ভয় না পেয়ে বললাম, “চলেন, যাই!” এই কল্পনাতীত জবাব শুনে উনি একটু থমকে গেলেন। তারপরই হেসে বললেন, “না, থাক!”

সেদিন আমাকে একটা কাজ দিলেন। শেষ করে জানালাম। উনি বললেন, ঈদে বেড়ালে কোথায় কোথায়?” বললাম, “বেড়াবে কী করে? আপনি তো ডাকলেন না! আপনি ডাকলে ঠিকই যেতাম!”

“এই শোনো, আজেবাজে কথা বোলো না! ডাকলে যে তুমি আসতে না, সেটা খুব ভালো করে জানি!”

ভারি আশ্চর্য লাগল শুনে। আমার বন্ধুস্থানীয় মানুষগুলোর বহুদিন লেগে যায় এই কথাটা বুঝতে। উনি এত দ্রুত বুঝে গেলেন?

উনি মনের কথা বুঝতে পেরেই ও পাশ থেকে বলে উঠলেন, ” আমি মানুষ চরিয়ে খাই।”

আসলেই। একদিকে উনি ভীষণ পেশাদার, অন্যদিকে ভারি স্নেহশীল। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান উনি এবং অত্যন্ত শক্তহাতে সবটা সামলাচ্ছেন।

উনি একজন তারকা ব্যক্তিত্ব। সেকারণেই তার নামটা লিখবো না এখানে।

এই কাজপাগল লোকটার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে আমার।

বাঁধন বিহীন সেই যে বাঁধন…

নির্বাণ লাভ করার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রিয়জন এবং প্রিয় দল- উভয়ের কাছ থেকেই প্রত্যাশামুক্ত হয়ে বসে আছি।
মায়াবন বিহারিনী হরিণী…কেন তারে ধরিবারে করি পণ অকারণ… বাংলাদেশ সমর্থকদের কখনো কখনো এমন দশাই হয়। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নীল হয়ে যাওয়ার কষ্ট কতবার পেতে হয়েছে! তবু স্বপ্ন দেখি। আমার মত কিছু ভীরু সমর্থক আছে যারা খেলা দেখতেও ভয় পায়! যদি আবার বুক ভাঙে। বিগত বছর দুয়েক ধরে, বাংলাদেশের খেলা দেখতে বসলে আমার মিনি হার্ট অ্যাটাক হয় প্রায়ই। আমি আজ খেলা দেখি নি।
নিজেকে সকল প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে চাইলাম। ভেবে দেখলাম, বাংলাদেশের খেলা না দেখে যদি থাকতে পারি, তাহলে নির্বাণ লাভ করতে আর বাকি থাকবে না। কিন্তু হঠাৎই আবিষ্কার করলাম- আমার আঙুল প্রতি ১০ সেকেন্ড অন্তর অন্তর গুগল করছে। আমার বিস্ময় বালকগুলো অসাধারণ স্কোর করছে!

খেলা দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মনে হল, দেখতে বসলে যদি হেরে যায়! আমি খেলা দেখে বহুবার জিতেছে বাংলাদেশ। কিন্তু আজ মাঝপথে দেখতে গেলে যদি ফ্লোটা নষ্ট হয়ে যায়! প্রতিটা বাংলাদেশ সমর্থকদের মনেই বোধহয় একবার হলেও এরকম কুসংস্কার দানা বাঁধে। অনেকের শুভ স্থান থাকে, শুভ চেয়ার থাকে- ওখানে বসে খেলা দেখলে সেদিন বাংলাদেশ জেতে। এই বিরাট পৃথিবীর একটি স্বাধীন দেশের এগারোটা মানুষের স্কিল আর ডেডিকেশনের পাশাপাশি আমার শুভ চেয়ারটাও যেন জয়কে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। কী অদ্ভূত সংস্কার! !

হতবিহ্বল অবস্থায় বসে আছি- হঠাৎ আমার হোয়্যাটসঅ্যাপ টিক টিক করে উঠল। বিজাতীয় ভাষায় মেসেজে লেখা- “বাংলাদেশ টিমের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, আজ একজনের হৃদয়টাকে অক্ষত রাখল বলে।” বলতে ইচ্ছে হল, “ইস্! দল বুঝি আমার একার? তোমার না?” পরে মনে পড়ল, আসলেই তো, এই দল তো ওর নয়। তবু কত খুশি ও! আমার দুঃখে ৩০০০ কিমি দূরে বসেও ছেলেটা প্রতিমূহুর্তের আপডেট রাখল! জয় নিশ্চিত হবার সাথে সাথে আমার সাথে শেয়ার করল।
এবার চোখে পানি এসে গেল। প্রিয় দল এবং প্রিয়জন যখন প্রত্যাশার অতীত কিছু দেয় তখন এভাবেই কান্না পায়। নির্বাণলাভ করা আর হল না। বাঁধন বিহীন সেই বাঁধনে তারা আমায় বাঁধিল…

জ্বরজড়িত জীবন

আমার জ্বর মাপার একটা নিজস্ব থার্মোমিটার আছে মাথার মধ্যে। জ্বর ১০৪ ছাড়ালে আমি দার্শনিক হয়ে উঠি। তখন আমার মনটা ভীষণ আর্দ্র হয়ে ওঠে। আচরণ ভারি ভদ্র নম্র হয়ে যায়। অর্ধচেতন অবস্থায় আমি মানুষজনের কাছে মাফ চাওয়ার কথা ভাবতে থাকি। পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়কারীর গুরুতর অপরাধও মাফ করে দিতে ইচ্ছে হয়।
গতরাতে এইসব লক্ষন একটু একটু দেখা দিতে শুরু করেছিল। বুঝলাম, অবস্থা বেগতিক, জ্বর বেড়ে গেছে। মেপে দেখলাম, ১০৩। অর্থাৎ, দার্শনিক হতে আর অল্প একটু বাকি। রিস্ক নিতে চাইলাম না। কাল জ্বরের তৃতীয় রাত ছিল। অতএব, টুপ করে একটা ওষুধ খেয়ে ফেললাম।
আধা ঘন্টা পর মনে হল, তাবৎ অন্যায়কারীকে কি ক্ষমা করে দেব? নাহ্! এ পৃথিবীতে কে কার! ক্ষমাতে কী আসে যায়?
আমি কি কারোর কাছে ক্ষমা চাইব? এহ্! কোন দুঃখে? যদি কেউ দুঃখ পেয়ে থাকে আমার কাছ থেকে, সেটা কি আর আমার দোষ! আমি তো নিমিত্ত মাত্র!
আমার জাগতিক কুযুক্তি, ইগো যেহেতু আবারো টনটনে হয়ে গেছে, অতএব, জ্বর আপাতত ছেড়ে যাচ্ছে এবং আমি হুঁশে ফিরছি! 😆

অন্তর বুড়োর ভালবাসা কথন

আমার এখন নিবিষ্ট মনে খাতা দেখার কথা। নিয়ত ঠিক করে সামনে খাতা ছড়িয়ে বসলাম্ও।নিয়তকে আরো মজবুত করতে ফেসবুক খুললাম- লগ আউট করার জন্য। নোটিফিকশনের কারণে যাতে আমি কিছুতেই লক্ষ্যচ্যুত না হই। সেকালে ধ্যানভঙ্গের জন্য ছিল রম্ভা, মেনকা আর এ কালে আছে ফেসবুক!
লগ আউট বাটন খুঁজে পা্ওয়ার আগেই হোমপেইজে চোখ আটকে গেল। স্ত্রী-পুত্রকে কোলে-কাখে-পাশে নানাভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিয়ে একটি হাস্যেজ্জ্বল ভদ্রলোকের ছবি। দেখে যেন মনে হল চিনি উহারে। ঠাহর করে দেখলাম- তিনি আমার এক সময়ের ক্রাশ! কিন্তু হায়! এ কী চেহারা উনার! আমার স্মৃতিতে এখনো ভাসছে একটা লম্বা, স্বপ্নীল চেহারা। কপালের অনেকটা অংশ ঢাকা থাকত চুল দিয়ে। চুলগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে, সে জায়গা জুড়ে একটি বিস্তৃত টাক!

উনার স্ত্রী-সন্তানকে দেখে আমার তো ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে যা্ওয়ার কথা! কিন্তু কই! ভদ্রমহিলার জন্য বরং গভীর সমবেদনা অনুভব করলাম। এই টেকো লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে হাসিমুখে পোজ দিতে হচ্ছে!

ঠিক সেই মুহুর্তে পিড়িং করে একটা শব্দ হল। না, ফেসবুক থেকে আসে নি শব্দটা। শব্দটা আসলো আমার অন্তরের গহীনতম প্রদেশ থেকে। অন্তরবুড়ো কমেন্ট করেছে! বলছে, “ঐ লোকের স্ত্রীকে সমবেদনা জানানোর তুমি কে? তোমাকে কে বলেছে যে মহিলার কোন অনুতাপ আছে তার স্বামীকে নিয়ে?”

“অনুতাপ থাকবে না কেন? আমার এত বছরের আকর্ষণ এক মুহুর্তে পালাল এই টেকো চেহারা দেখে! আর ঐ মহিলাকে তো রোজ এই ভুঁডিওয়ালা টেকো লোকটাকে নিয়ে কাটাতে হয়! আমার তো করুণা হচ্ছে দুজনার জন্য”

বুড়ো হা হা করে হাসল আমার কথা শুনে। আমার গা জ্বলে গেলে সেই হাসি শুনে। বুড়ো কোন পণ্ডিতিমূলক বক্তৃতা দেওয়ার আগে এরকম একটা হাসি হাসে।

“তোমার আকর্ষণ পালাল কারণ তোমার কোন স্মৃতি নেই লোকটার সাথে! মানুষ হিসেবে সে কেমন তুমি জান না। তোমার স্মৃতিতে শুধু টুকরো টুকরো কয়েকটা ছবি ভাসে- করিডোর দিযে তার হেঁটে যাওয়া। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তুমি দেখতে পেতে যে রিকশায় করে সে বই পড়তে পড়তে যাচ্ছে! এই তো তোমার স্মৃতি!তার সাথে জীবনে তোমার কখনো কথা হয় নি। তার পুরো নামটা্ও তো তুমি জানতে না! তাই ফেসবুকে সার্চ দিয়ে তো তুমি তো তাকে কখনোই খুঁজে বের করতে পারো নি! তাই বলছি, তুমি তাকে কোনদিন ভালবাস নি!”

“কী বল, বুড়ো? ভালবাসি নি? উনাকে দেখলেই আমার হার্টবিট বেড়ে যেত! কেমন একটা শিহরণ জাগত ভিতরে! স্বপ্নীল চেহারার সেই ছেলেটার উপর আমার প্রচণ্ড আকর্ষণ ছিল!”

“ঠিক বলেছ। আকর্ষণ ছিল। মুগ্ধতা ছিল। কিন্ত ওটা ভালবাসা ছিল না। ভালবাসা কখনো শিহরণে, উত্তেজনায় আটকে থাকে না। প্রথম পর্যায়ে এই ব্যাপারগুলো থাকল্ওে মুগ্ধতাটা ভালবাসায় রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার পর সেখনে শিহরণের জায়গায় শান্তি আসে।

অনেক সময় এমনও হয়, যাকে ভালবাসছ তাকে মিস করছ কিন্তু সে বাড়িতে আসার পর হয়তো সে নিজের মনে কাজ করে বেড়াচ্ছে, তুমিও আর এক ঘরে ব্যস্ত আছ নিজের কাজ নিয়ে। কিন্তু সে যে বাড়িতে আছে-এটুকুই তোমার জন্য বিরাট শান্তির কারণ। ভালবাসা মানে দুজন দুজনের দিকে রূপমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা নয়। ভালবাসা হল একসাথে স্মৃতির পাহাড় গড়ে তোলা, দুজন দুজনের দুর্বলতার সহায় হ্ওয়া।”
আমার বিরক্তি আরো একটু বেড়ে গেল। বুড়োর কথা যখন খন্ডন করতে না পারি তখন আমার এরকম হয়। মনে হয়, বুড়ো কখন থামবে।
বুড়ো বুঝতে পারল। একটু হেসে বলল, “সেই গল্পটা মনে আছে?এক মধ্যবয়সী মহিলা স্বামীকে মুগ্ধ করতে এক ফোটো এডিটরকে দিয়ে নিজের ন্যুড এডিট করিয়েছিল? সেই ন্যুডটা একদম নিখুঁত করে এডিট করা ছিল। কিন্তু তার স্বামী খুশি হ্ওয়ার বদলে ভীষণ মন খারাপ করেছিল।

ফটো এডিটরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল, ‘আমার স্ত্রীর শরীরটা এডিট করতে গিয়ে আপনি তার শরীরে সন্তানধারণের দাগটা্ও মুছে দিয়েছেন। আপনি আসলে দাগ মোছেন নি, আমাদের সন্তানটাকে সে নয় মাস ধরে শরীরে লালন করেছে, সেই স্মৃতিচিহ্নটাকেই মুছে দিয়েছেন।ওর মুখের বলিরেখা মুছে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমরা দুজন কতগুলো বছর একসাথে কাটিয়েছি, সেই সময়ের চিহ্নটাকে মুছে দিয়েছেন। এটা আসলে আপনার দোষ না। এটা আমারই দোষ যে আমি তাকে আমার ভালবাসাটা বোঝাতে পারি নি। আর তাই, তাকে আপনার দ্বারস্থ হতে হয়েছে আমাকে মুগ্ধ করার জন্য।’”
“বুঝলাম। ভালবাসা তখনি হয় যখন সেটা মুগ্ধতা ছাপিয়ে পরম নির্ভরতায় পৌঁছায়।”
“এই তো। এবার বুঝেছ। তবে তার মানে এই না যে ঐ একই সম্পর্কের মধ্য কখনো মুগ্ধতা আসবে না। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে মুগ্ধতা, শিহরণ বা উত্তেজনাই সম্পর্কের চরমতম লক্ষ্য নয়। উত্তেজনার জন্য তো মানুষ ড্রাগ নিলেই পারে। ভালবাসা তো কোন নেশা নয়।

ভালবাসা হল আমাদের আবেগ অনুভূতি, দুর্বলতা, সবলতাকে নিরাপদে রাখার মত একটা আশ্রয়স্থল। যে সেই আশ্রয়টা দিতে পারে, তার সাথেই ভালবাসা হয়। অনেক মানুষ উত্তেজনা আর শিহরণকে ভালবাসার লক্ষণ ভেবে একটার একটার পর একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে কিন্তু শান্তি পায় না।”

এইসব বয়ান শুনতে শুনতে দেখলাম, রাত অনেক হয়েছে। ক্রাশের চেহারার উপর তো অনেক আগেই অরুচি ধরেছে এবার নিজের শ্রবণশক্তির উপরও বিতৃষ্ণা এসে গেল। বুড়োর ভালবাসা ব্যাখ্যান আমার মাথায় বিশেষ না ঢুকলেও এটা বুঝলাম যে আমার খাতা দেখার কাজ সারা। বাসের মধ্য দেখতে গেলে তো আবার ফেসবুকে ভাইরাল আপা হয়ে যেতে হবে। যাক, কাল সকালে কলেজে গিয়েই দেখব।

এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুমের মধ্যেও, স্বপ্নের ঘোরেও ব্যাকগ্রাউন্ডে বুড়োর বকবকানি ভেসে আসতে থাকল। ইস! কোথা্ও যদি একটা অফ্ বাটন থাকত বুড়োকে থামানোর! সেই অমোঘ অফ্ বাটনের নাম বোধহয় আমার মৃত্যু! এর আগে বুড়ো থামবে না।

জীবন যখন সরকারি সম্পত্তি

আজ থেকে ঠিক পাঁচ মাস আগে আমার আন্তরিক অনিচ্ছাসত্ত্বেও জীবনটা সরকারের সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল। ব্যাপক অর্থে, প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের সম্পত্তি বা সম্পদ। কিন্ত অন্য কোন নাগরিকের হাতে মোটা মোটা পাঁচ/ছয়টা বিধি-বিধানের বই তুলে দিয়ে তা মুখস্থ করতে বলা হয় না। সরকারি কর্মচারীকে এক একটা থান ইটের মতন বই মুখস্থ করে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়। সেসব বইয়ের পাতায় পাতায় থাকে “কী করিলে কী হইবে” শীর্ষক নীতিমালা। অপরাধের সাথে পরিচয় হওয়ার আগেই সেসব অপরাধের দণ্ড মুখস্থ করে ফেলতে হয়।
ভাবতে বসলাম, এই পাঁচ মাসে আমার অনুভূতি কী? অনুভূতি অবশ্যই মিশ্র। তবে শ্রেষ্ঠ অনুভূতিটা হয় প্রতিদিন সকালবেলায়। কানে জাতীয় সংগীতের সুর ভেসে আসার সাথে সাথে প্রত্যেকে যে যেখানে থাকে দাঁড়িয়ে যায়। এই রীতিটা আগে কখনো কর্মস্থলে অণুসরণ করতে হয় নি। এখন করি। অত্যন্ত পবিত্র একটা অনুভূতি হয় তখন।
যা কিছু নথিপত্র নাড়াচাড়া করি, তা বেশিরভাগই বাংলায়। অদ্ভূত অদ্ভূত সব বাংলা শব্দ শুনেছি কয় মাসে- পরিপত্র, অনুবেদন, প্রেষণ, ভবিষ্য তহবিল ইত্যাদি ইত্যাদি অসংখ্য শব্দ। এসব শব্দের সংজ্ঞার্থ মুখস্থ করতে মেলা দিন লেগে যাবে। কারণ আমি একটি সর্বজনস্বীকৃত টিউব লাইট। তবু, শিখতে দেরি হলেও বাংলার এই বহুল ব্যবহার দেখে ভাল লাগে। বাংলা শব্দগুচ্ছের এতখানি ব্যবহার দেখতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। বিদেশী সংস্থায় ছিলাম বলেই হয়তো ব্যাপারটা আমার বেশি করে চোখে পড়ে।
এ পৃথিবীর সকল ভাষা-ভাষী তার নিজের মাতৃভাষায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পাক। ভাষার মাসে এবং জীবনের সরকারিকরণের পাঁচ মাস পূর্তিতে এটাই আমার কামনা।
ও হ্যাঁ, আগের অফিসকে মিস করি কী না? সে প্রশ্নের উত্তর আজ আর না দেওয়াই সঙ্গত। কে না জানে, বিয়ে করে প্রাক্তনের গুণ গাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অতএব, সেসব থাকুক আমার অন্তরের গহীনতম প্রদেশে। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

সূর্য এবং নৈঃশব্দ্যের গান…

“Hello darkness, my old friend” গানটা শুনতে শুনতে যাচ্ছি। অথচ এখন ঝকঝকে সকালবেলা। চোখের সামনে লাল সূর্য! কিন্তু গানটার সাথে আমার চারপাশের কী যেন একটা মিল আছে! আমার চোখের সামনে একটা নতুন দিন শুরু হচ্ছে। আমার কানে বেশ শান্ত স্বরে একটা নতুন রিয়ালাইজেশনের কথা বলা হচ্ছে।

চোখের সামনে সূর্যটা একটু একটু করে ফিকে হচ্ছে। গাঢ় লালটা আস্তে আস্তে কমলা হয়ে গেল। চারপাশ যত উজ্জ্বল হয়, সূর্যের টকটকে ভাবটা তত কমে। আজই প্রথম খেয়াল করলাম, চারপাশকে উজ্জ্বল করতে গিয়ে সূর্য নিজের রং, সৌন্দর্য কমাতে বাধ্য হয়। দুপুর রোদের সূর্যটা তো জ্বলতে জ্বলতে প্রায় সাদাটে হয়ে থাকে। অনেকটা প্রৌঢ় জীবনের মতন। সবাইকে সার্ভিস দিতে দিতে আমাদের মা-বাবারা যেমন নিজের রংটা হারিয়ে ফেলেন। তারপর বার্ধক্যে আবার রং ফিরতে থাকে শৈশবের মত। মানুষ যেমন বুড়ো হলে শিশুর মত হয়ে যায়, সূর্যটাও তেমনি সূর্যাস্তের আগ দিয়ে সূর্যোদয়ের রঙ গায়ে জড়িয়ে ডুবে যায়। পূর্ণ একটা জীবনকাল কাটালে মানুষও আবারও তার দ্বিতীয় শৈশবে ফিরে যায়। বার্ধক্যের সময়টাতে সেও শিশুর মত আচরণ করতে থাকে।

এটা একটা নতুন উপলব্ধি। এই একই সূর্য এর আগে বহুবার দেখেছি। কিন্তু এই ভাবনাটা এর আগে কখনো মাথায় আসে নি। অর্থাৎ, সূর্যটার দিকে তাকিয়েছি, কিন্তু দেখি নি কোনদিন। গানের মধ্যেও অনেকটা একই কথা বলা হচ্ছে। People talking without speaking; People hear without listening…

মানুষের ক্ষেত্রেও বোধহয় এমনটা হয়। দিনের পর দিন যাকে পরিচিত বলে জানছি, তাকে একদিন হঠাৎ অন্যরকম লাগে। সঠিক মুহূর্তে সঠিক আলোতে মানুষটার অন্য একটা পরিচয় পাওয়া যায়। অস্তিত্ব নাড়িয়ে দেওয়ার মত পরিচয়।

অস্তিত্ব নাড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তে বুকের মধ্যে একটা সূর্যোদয় হয়। কখনো হয়তো সূর্যাস্ত হয়। কিন্তু সূর্য উঠুক বা ডুবুক, উপলব্ধির পরমুহূর্তে পৃথিবীটা আর আগের মত থাকে না।

‘ভাইয়া’র স্বজনেরা

সৃষ্টিকর্তা বড় খেয়ালী। যেটা যেখানে দেওয়ার কথা সেটা সেখানে দেন না। উনি সারপ্রাইজ দিতে ভালবাসেন!

আজ বিকালে নিচতলা থেকে বাসার লিফটে উঠলাম। আমার সাথে একটা আট/নয় বছর বয়সী মেয়েও উঠল।

লিফটে উঠেই বড় বড় চোখ মেলে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কয় তলায় থাকেন?” কোন এক অদ্ভুত নিয়মে সব বাচ্চা মেয়ের চোখ বড় বড় হয় । পরিষ্কার শাদা চোখে গভীর কাল দুটো মণি থাকে। তবে চাইনিজ আর জাপানিরা এই হিসেবের বাইরে। ওরা আমার কাছে অতি বিস্ময়ের বস্তু। যেখানে চোখ থাকার কথা, সেখানে আছে একটা করে কাল আড়াআড়ি দাগ। দু পাশে দুটো দাগ। এই দিয়ে তারা কী করে দুনিয়া দেখে আমি ভেবে পাই নি। অবশ্য দাগ থেকে যে ভাল কিছু হয় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্টিভ ওয়াহ। চোখের জায়গায় তারও শুধু দুটো দাগ। কিন্তু সেই দাগের মধ্যে দিয়ে তাকিয়েই তিনি পুরো মাঠ দেখে ফিল্ডিং সাজাতেন, অধিনায়কত্ব করতেন। আমি আমার নাকের দুপাশে দুটো জানালা নিয়ে বসে আছি। তবু হাতের মোবাইল হাতে রেখে খুঁজে বেড়াই। আর স্টিভ ওয়াহ তার নাকের দুপাশের ভেন্টিলেটর দিয়ে তাকিয়েই বিশ্বজয় করে গেছেন।

যে দৃষ্টিশক্তি আমার ঢাউস মণিতে থাকার কথা, তা ছিল স্টিভ ওয়াহর দাগের আড়ালে। কারণ সৃষ্টিকর্তা সারপ্রাইজ দিতে ভালবাসেন।

যাহোক, আবার লিফটে ফিরি-যেখানে আমার মায়াবী বিশালাক্ষী মেয়েটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় চোখের বাচ্চা মেয়েদের প্রতি আমার অদ্ভুত একটা ভাল লাগা কাজ করে। বললাম, আমি পাঁচতলায় যাব। মেয়ে বলল, ‘ওটা কি আপনার নিজের বাসা?” আমার সাইজের সাথে কি মালিকানা ম্যাচ করছে না? বাসা তো যথেষ্ট ছোট-আমার সাইজের তুলনায়ও বেশ ছোট! হেসে বললাম, “হ্যাঁ, ওটা আমার নিজের বাসা।” এবার বলল, “আপনি কার সাথে থাকেন?” হাসি চেপে বললাম, “আমি আমার মা-বাবার সাথে থাকি।”

ওর প্রশ্নের ধরণ বেশ প্রশংসনীয়। দুটো প্রশ্ন করে আমার সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটো তথ্য সে আদায় করে ফেলেছে- আমি ওই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক কীনা এবং আমার বৈবাহিক অবস্থা কী।

এই বাচ্চার ঘটে যেটুকু বুদ্ধি আছে, যেটুকু ভদ্রতাবোধ আছে, তা আমার চির অপরিচিত ‘ভাইয়া’র প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয়-স্বজনের নেই। রাস্তা-ঘাটে, বাসে প্রায়ই সেই নাম না জানা ‘ভাইয়া’-র আত্মীয়-স্বজনের সাথে আমার দেখা হয়। দু একটা কথার পরেই তারা জানতে চান, “ভাইয়া কী করেন?” বলতে ইচ্ছে হয়, “আপনার ভাইয়া কী করেন, তা আপনিই ভাল জানেন, আপু। আমি কী করে জানব তার ঠিকুজি কুষ্ঠি? তার সাথে পরিচিত হবার কোন পরিকল্পনা আমার নেই।”

ফাইন, জানতে ইচ্ছে হয়েছে- আমি বিবাহিত কী না। প্রথম কথা, এত অল্প পরিচয়ে এত ব্যক্তিগত প্রশ্ন আপনি করবেন কেন? আর করবেনই যদি, এত ঘুরপথে জিজ্ঞেস করবেন কেন? সরাসরি জিজ্ঞেস করেন! এত আত্মীয়তা পাতানোর দরকার তো নাই!

সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট মানুষ বড় বিচিত্র জীব! আর বাঙালি বিচিত্রতম!

​ছদ্ম পুরুষবাদী থেকে সাবধান

(লেখাটি ৩১ জুলাই, ২০১৭ উইমেন চ্যাপ্টারে ছাপা হয়েছিল)

নতুন একটা ফ্যাশন চালু হয়েছে- নারী পরিচয়কে ব্যবহার করে পুরুষবাদের জয়গান গাওয়া। সুচিন্তিত, যৌক্তিক, ভিন্নমতের প্রতি আমি বরাবরই শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু নিজের মতামত প্রচার করতে গিয়ে কেউ যদি একটা গোটা গোষ্ঠীকে অভব্য ভাষায় আক্রমণ করে, তাহলে, সেটা ভারি আপত্তিকর। 

আমার এই লেখাটি মূলত একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া। এক অনলাইন কাগজে অত্যন্ত আপত্তিকর শিরোনামের একটি লেখা চোখে পড়ল – “যে নারী পুরুষের প্রিয় হতে পারে না, সেই হয়ে ওঠে নারীবাদী।“ এই অদ্ভূত, একপেশে শিরোনাম দেখে বিস্মিত হলাম। কিন্তু ভীষণ বিপর্যস্ত লাগল যখন দেখলাম লেখাটি লিখেছেন একজন নারী। লেখার ছত্রে ছত্রে তার এই নারী পরিচয়কে তিনি তার আক্রমণের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

লেখার আপত্তিকর অংশগুলো চিহ্নিত করা যাক।

প্রথমত, তিনি একটি জেনারালাইজেশন করেছেন- সকল নারীবাদীই পুরুষের অপ্রিয়। ‘সকল গরু ঘাস খায়’এর মত একটি সহজ সমীকরণ টেনেছেন। যে কোন আধিপত্যবাদী কুতার্কিকরা তাই-ই করেন। যেমন, সীমিত জ্ঞানের অধিকারী শাদা আধিপত্যবাদীরা সকল কালো মানুষকে ক্রিমিনাল মনে করেন। উনিও তাই করলেন। অথচ, আমি তাকে ভূরি ভূরি উদাহরণ দেখাতে পারব যেখানে একজন নারীবাদী মেয়ে সুখে শান্তিতে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ী নিয়ে সংসার করছে। সেরকম অনেক মেয়ে আমার ফ্রেণ্ডলিস্টেই আছে- কেউ পেশায় সাংবাদিক, কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক। অসংখ্য পুরুষবাদীর মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে সেই নারীবাদী মেয়েরা তাদের প্রতিবাদী ভূমিকার ক্ষেত্রে স্বামীর সমর্থন ও সহযোগিতা পাচ্ছেন; তারা পুরুষের প্রিয়। অতএব, পুরুষের স্বীকৃতি আদায়ে ব্যর্থতা = নারীর নারীবাদী হয়ে ওঠা জাতীয় অনুসিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হল।

দ্বিতীয়ত, পুরুষের প্রিয় হয়ে ওঠাটাই কি একটা মেয়ের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য? ধরা যাক, একটি মেয়ে সংবাদপাঠিকার কাজ করেন। তা, তার জীবনের প্রথম সংবাদ পাঠের পর তিনি কি শুধুই পুরুষ অডিয়েন্সের মতামত নেবেন? কোন মেয়ে যদি তাকে বলেন, আপু, আপনার খবর পড়া আমার খুব ভাল লেগেছে, তাহলে, সেই সংবাদপাঠিকা কি বলবেন যে আপনি একটা মেয়ে, তাই, আপনার কমপ্লিমেন্ট আমি নেব না! এমন কোন পেশার কথা তো আমি মনে করতে পারছি না যেখানে টার্গেট অডিয়েন্স শুধুই পুরুষ। একমাত্র যৌনকর্মী এবং জেন্ডার স্পেসিফিক কোন প্রোডাক্টের বিক্রেতা ছাড়া আর কেউ বোধহয় নির্দিষ্ট একটি লিঙ্গকে টার্গেট করে থাকেন না।

যে কোন সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ অন্যের স্বীকৃতি চায়। আমি যদি সাজগোজ করি, তাহলে যে কারোর মুখ থেকে প্রশংসা শুনতেই আমার ভাল লাগে। অফিসে আমি একটা নতুন ড্রেস পরে আসার পর আমার সহকর্মীরা যদি সেটা খেয়াল করে, আমার ভাল লাগে। সে সহকর্মী পুরুষই হোক, আর মেয়েই হোক। আমার জুনিয়র মেয়েটা আমার লুক নিয়ে খুব মাথা ঘামায়। আমার ড্রেসগুলো তার মুখস্থ। কখনো কখনো সে আমাকে কোথাও যাওয়ার আগে বলে রাখে, আপু, ওই থ্রী-পিসটা পরলে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগে, কাল ওইটা পরে আসবা। কিংবা এই ওড়নাটা এই জামার সাথে ম্যাচ করে না, এটা পোরো না। আমি ওর মতামত গুরুত্ব দিয়ে শুনি। কোন কোন ছেলে সহকর্মী আমার নতুন দুল দেখে তারিফ করে। কেউ কেউ আবার এটাও বলে, এই দুলটা কালকের জামাটার সাথে বেশি মানাত। একজন তো আমার গিফট কেনার সময় এটাও বুঝতে পারে, কোন রংটা আমার পছন্দ হবে, আর কোনটা হবে না। অথচ আমি আমার প্রিয় রং নিয়ে তাকে কিছু বলি নি কখনও। এদের মতামতও আমার কাছে সমান গ্রহণযোগ্য। আমরা প্রিয় হতে ভালবাসি। আমরা স্বীকৃতি চাই। তবে সেটা নির্দিষ্ট করে কেবলই একটি শ্রেণীর কাছ থেকে নয়- নারী-পুরুষের উভয়ের স্বীকৃতি পেতেই আমাদের ভাল লাগে। এবার কি ওই লেখিকা আমাকে উভকামী বলবেন? বলতেও পারেন, কারণ পুরুষের প্রিয় হতে না চাওয়া মেয়েদের উনি সমকামী বা হিজড়া মনে করেন। 

না, বেশিরভাগ মেয়েই পুরুষের গায়ে পড়া প্রিয়ত্ব এড়িয়ে চলে। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কখনোই চাইব না, একটা অজানা ছেলে আমাকে দেখে, ‘ওয়ে সুন্দরী’ বলে উঠুক, কিংবা আমার শরীরের কোন বিশেষ অংশের দিকে তাকাতে তাকাতে পথ চলুক। না, এই ধরণের অসুস্থ প্রিয়গিরি আমরা চাই না। এটাকে ইভটিজিং বলে, অ্যাপ্রিসিয়েশন বলে না। অ্যাপ্রিসিয়েশন আর হ্যাংলামির মধ্যে তফাৎটা বুঝতে হবে। প্রশংসা, স্বীকৃতি, আমার অ্যাপেয়ারেন্স নিয়ে মন্তব্য আমি শুধু তাকেই করতে দিই যাকে আমি স্পেস দিই। একবার অফিস থেকে বাসায যাওয়ার পথে এক শ্বেতাঙ্গ বিদেশী আমাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমাকে আর আমার সহকর্মীকে দেখে চিৎকার করে উঠল, “সুন্দরী মহিলা!” কথাটা সে বাংলায় বলেছিল, বিদেশী টানে। আমি আর আমার সহকর্মী সাথে সাথে পিছন ফিরে তাকালাম লোকটার দিকে। আমাদের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি দেখে লোকটা চুপচাপ কেটে পড়েছিল। আমি পরে এই ঘটনাটা আমার এক আমেরিকান বন্ধুর সাথে শেয়ার করেছিলাম- ওর ভুল ভাঙানোর জন্য। এই একই ঘটনা কোন বাঙালি ছেলে যদি বিদেশী মেয়ের সাথে করত এটাকে ওরা ইভটিজিং বলত। তাই, ওকে সাবধান করে দিলাম যেন জেনারালাইজেশন করার আগে দুবার ভাবে। 

কোনধরণের জেনারালাইজেশন আমি সহ্য করতে পারি না। সেটা যাদের নিয়েই করা হোক না কেন। এমনকি কেউ যদি বলে পুরুষ মানেই চরিত্রহীন, আধিপত্যকামী জন্তু-তবে সেই কথারও প্রতিবাদ করি আমি। কারণ আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটিও একজন পুরুষ। যখনই একজন জেনারালাইজেশন করে কথা বলে, তখন তার বৌদ্ধিক স্তর নিয়ে আমার সন্দেহ হয়।

এবার আসি তৃতীয় পয়েন্টে। উনি ‘নারীবাদী’ কথাটিকে অনেকটা গালির মত করে ব্যবহার করেছেন। নারীবাদ এবং মানবতাবাদকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। উনার মতে, নারীবাদীরা মানবতাবাদী নন। আমার প্রশ্ন, নারী কি মানুষের বাইরে? এই পৃথিবীতে অসংখ্য সমস্যা এবং বিষয় আছে। সমস্ত বিষয় নিয়ে সবার সমান ইন্টারেস্ট থাকে না। কে কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন সেটা নির্দিষ্ট করে বুঝার জন্য পরিবেশবাদী, নারীবাদী, বস্তুবাদী, ভাববাদী বলে ডাকা হয়।  পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয় নিয়ে যারা কাজ করে, তাদের যদি ইতিবাচক অর্থে পরিবেশবাদী বলা যায়, তাহলে নারীদের অধিকার বিষয়ে যারা কাজ করেন তাদেরকে এমন নেতিবাচকভাবে নারীবাদী বলা হবে কেন?

এই কেন-র উত্তর আছে আধিপত্যবাদী পুরুষের মিথ্যে প্রচারণায়। নারীবাদী মানেই দা-কাটারি হাতে মারমুখী কাউকে প্রেজেন্ট করা হয়। সংকীর্ণচিত্ত মানুষের ধারণা, নারীবাদী মানেই পুরুষালি। কপালে টিপ পরা, চোখে কাজল দেয়া নারীবাদীর সংখ্যা কিন্তু অনেক। অথচ, এই সমালোচকরা সেগুলো সযত্নে এড়িয়ে যান। কারণ নারীবাদীকে পুরুষালি প্রমাণ করতে পারলে সেইসব নারীকে আনঅ্যাট্রাক্টিভ (তাদের চোখে) বলে প্রমাণ করতে সুবিধা হয়। এবং তখন নারীবাদকে ফ্রাস্টেশনের ফলাফল হিসেবে প্রমাণ করতেও সুবিধা হয়। অথচ নারীবাদ একটা বিবেকবান মানুষের সচেতন সিদ্ধান্তও হতে পারে। কিন্তু এটা তারা মানবেন না।

এদের জন্য সবচেয়ে উচিত জবাবটা দিয়েছিলনে এমা ওয়াটসন, তার ইউএন স্পীচে। উনি বলেছিলেন, “…my recent research has shown me that feminism has become an unpopular word. Apparently I am among the ranks of women whose expressions are seen as too strong, too aggressive, isolating, anti-men, and unattractive.” । স্পীচের আগে তাকে ফেমিনিজম শব্দটা ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছিল। তারা ভেবেছিল, এতে করে তার বক্তব্যের ক্ষেত্রটা সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। উনি তাদের ভুল প্রমাণ করেছিলেন। বক্তব্যের প্রতিটি লাইন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন কেন নারীবাদ নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রয়োজনীয়। উনি বলেছিলেন, “We don’t often talk about men being imprisoned by gender stereotypes, but I can see that they are and that when they are free, things will change for women as a natural consequence”। ভাল কথা, এমা ওয়াটসনকে কার কার যেন আনঅ্যাট্রাক্টিভ মনে হয়? কার কার মনে হয় যে উনি পুরুষের প্রিয় হতে সমর্থ নন? একটু হাত তুলুন, আপনাদের দেখি।

আর হ্যাঁ, কেউ যদি পরিপাটী হয়ে সেজে না থাকে, তবে সেটাও কিন্তু তার ব্যক্তিগত অভিরুচি। অনেক মানুষ টাকা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ জীবন যাপন করতে পছন্দ করেন। ঠিক তেমনি অনেক মেয়ে সাজতে পছন্দ করেন না, জিন্স পরেন। সেটাও তার ব্যক্তিগত ভাল লাগা, ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপার। এবং অনেক মেয়েকেই সাধারণ একটা জিন্স পরেও শাড়ির চাইতে বেশি সুন্দর লাগে। কারণ ওটাই তার স্টাইল। সে ওটাতেই স্বচ্ছন্দ। কেউ যদি সংসার করতে না চায় তবে সে স্বাধীনতাও তার আছে। আমি আপনি কে সেগুলো ডিক্টেট করার? এ জগতে অনেক কিছু করার আছে। আপনার হাতে যদি অঢেল সময় থাকে, তাহলে সেগুলোর পিছনে এনার্জি খরচ করুন।

নারীবাদী মানেই পুরুষ বিরোধী নয়। কেউ যদি পুরুষকে নিয়ে কোন খারাপ মন্তব্য করেন, তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা। এটার সাথে নারীবাদকে গুলিয়ে ফেলার কোন কারণ নেই। আমি কখনো ইচ্ছে করে নিজেকে নারীবাদী বা অ্যাক্টিভিস্ট বলে পরিচয় দিতে যাই নি। কিন্তু আমার কাজগুলোর সাথে নারীবাদ হয়তো মিলে যাবে। কারণ আমি নারী এবং পুরুষ উভয়কেই সম্মান করে চলি।

নারীবাদ মানেই পুরুষের করুণা পিয়াসী নয়। আমি বাসের সীটে বসা অবস্থায় যদি কোন বৃদ্ধ পুরুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি, তাহলে আমার সীটটা তাকে ছেড়ে দিই। ওভারব্রীজের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়, এক ভদ্রলোককে দেখলাম এক হাতে ক্রাচ নিয়ে আর এক হাতে খোলা ছাতা নিয়ে নামছেন। ভদ্রলোক খোঁড়া নন, তবে হয়তো পা মচকে গিয়েছিল, তাই ক্রাচ নিয়েছেন। ক্রাচের কারণে ডান হাতের ছাতাটা কাত হয়ে গিয়েছে। তাই কাঁধে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। আমি তার পিছন পিছন নামতে গিয়ে ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। জানতে চাইলাম, “ভাইয়া, আপনার ছাতাটা কি আমি সোজা করে ধরব আপনার মাথায়?” অপরিচিত একটা মেয়ের কাছ থেকে এরকম একটা অদ্ভূত কথা উনি প্রত্যাশা করেন নি। একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বললেন, “না না ঠিক আছে, ধন্যবাদ।“ ঠিক সেই মুহুর্তে দেখলাম, আমার বাসটা ব্রীজের নীচ দিয়ে চলে যাচ্ছে। তাই, কথা না বাড়িয়ে হুড়মুড় করে নেমে এলাম। তবে উনি ছাতা ধরতে বললে বিনা দ্বিধায় আমি ছাতা ধরতাম। এইসব কাজগুলো যখন আমরা করি, তখন নারী-পুরুষ পরিচয়টা সেখানে মুখ্য নয়। বাস্তব জ্ঞান, এবং মানুষের প্রয়োজনের প্রতি সম্মানবোধটা ওখানে মুখ্য। আবার নারীবাদ মানেই অযৌক্তিক বিদ্রোহ নয়। নৌকা থেকে নামার সময় পিচ্ছিল কাদায় যাতে পড়ে না যাই সেজন্য আমার বন্ধুর বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা আমি বিনা দ্বিধায় ধরি। পুরুষের সাহায্য নেব না শীর্ষক তর্ক সেখানে আমি তুলি না। কারণ আমরা একে অন্যের সাহায্য নিয়েই বাঁচি। 

ওই লেখিকার একটি লেখার বিপরীতে আমি এত লম্বা লেখা কেন লিখলাম? কারণ উনি গোটা লেখাতে ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক সমতার কথা বলে শেষ মেষ গিয়ে একটি বোমা ফাটিয়েছেন- “যেকোনো কারণেই হোক পুরুষের নারীর উপর আধিপত্যকে আমি খারাপভাবে দেখি না”। অত্যন্ত ভয়ংকর এবং ক্ষতিকর একটি লাইন। এই একবিংশ শতাব্দীতে কেউ কারো উপর আধিডত্য কেন করবে? আর ঠিক এই লাইনটি এবং লেখার শিরোনামের কারণে বহু পুরুষ এই লেখাটি শেয়ার করে চলেছেন। কিছু ইন্টেলেকচুয়াল নামধারী পুরুষ চক্ষুলজ্জার খাতিরে এই লেখিকার মত এত স্পষ্টভাবে তাদের অভিমতটা জানাতে পারেন না। এই লেখিকা তাদের মুখপাত্র হয়েছেন। আর আমার এবং আমার মত অনেক মেয়ের আপত্তি সেখানেই।

পড়ন্ত কপাল

মানুষের পোড়া কপাল, আর আমার হল পড়া কপাল।
কখনো বাস, কখনো সাইকেল, কখনো রিকশা ইত্যাদি নানাবিধ বাহনের সংস্পর্শে এসে রাস্তা ঘাটে প্রায়ই নিজের পতঞ্জলি দশা দেখি।
আজ আজমপুরে আমার রিকশাকে হঠাৎ করে একটা পিক আপ দিল এক ধাক্কা। প্রথম ধাক্কাটা সামলে ওঠার আগেই দ্বিতীয় ধাক্কা। কায়দা বেকায়দা বিভিন্ন স্টাইলে রিকশার হুডটা ধরে ঝুলে থাকার চেষ্টা করছিলাম। মনে আশা ছিল- ওয়ান্ডার উম্যান না হতে পারি, টিকটিকি বা তেলাপোকা স্টাইলে ঝুলে থাকা যাক। কিন্তু আমার অনুকরণীয় জীবকূলকে কোনদিন ভাল করে অবজার্ভ করা হয় নি বলেই তেনাদের মুখরক্ষা করতে পারলাম না। কাঁধের দুই ব্যাগ নিয়ে পপাত ধরণীতল।
আক্রমণকারী গাড়ি ততক্ষণে আমাকে জানালা দিয়ে এক ঝলক দেখে পগার পার।
দশ পা দূরে গিয়েই সিগন্যালে বেচারা কে থামতে হলো। ছড়ে যাওয়া হাঁটু নিয়ে আমি বিপুল বিক্রমে আমার রিকশাওয়ালাকে নিয়ে পৌঁছে দেখি, এক মোটরসাইকেল আরোহী অপরাধীর কলার ধরে এক একটা ঝাঁকি দিচ্ছে আর একটা করে নতুন নামকরণ করছে। প্রতিটা নামকরণেই অভিনবত্বের ছোঁয়া। ছেলেটার জন্ম পরিচয় একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছে। আমি এগিয়ে যেতেই অন্যরা পথ ছেড়ে দিল।
আমি একটা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেবার প্রস্তুতি নিয়ে আগালাম।
ওমা, সীটে তো একটা লিকলিকে লিলিপুট বসে আছে ছলছল চোখে। দেখে আমিই বেকুব হয়ে গেলাম। কিন্তু উপস্থিত জনতা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে চেয়ে আছে। কারণ আমি মহামান্যা ভিকটিম! আমার ভাবই আলাদা।
আমি তাই গলা চড়িয়ে বললাম, ‘আপনি রাস্তায় আমাকে ফেলে দিয়ে চলে গেলেন! আমি তো আজ মরেও যেতে পারতাম!
দ্বিতীয় লাইনটা বলে আমার আসলেই মরে যেতে ইচ্ছে হল! এত্ত দুর্বল থ্রো আমার ডায়ালগের। আমাকে দিয়ে পারফর্মেন্স হবে না। হতাশ গলায় বললাম, ‘ভাই, যান, বাড়ি যান।’
আহত হাঁটু আর পড়ন্ত কপাল নিয়ে আমিও বাড়ি ফিরে এলাম।

কারাগারের রোজনামচা

“কই গ্রেট বৃটেনে তো কেউ না খেয়ে মরতে পারে না!…জার্মানি, আমেরিকা, জাপান এ সকল দেশে তো কেহ শোনে নাই- কলেরা হয়ে কেহ মারা গেছে? … ওসব দেশে তো মুসলমান নাই বললেই চলে। সেখানে আল্লার নাম লইবার লোক নাই একজনও; সেখানে আল্লার গজব পড়ে না। কলেরা, বসন্ত, কালাজ্বরও হয় না। আর আমরা রোজ আল্লার পথে আজান দিই, নামাজ পড়ি, আমাদের উপর গজব আসে কেন?”

কী মনে হচ্ছে? উপরের লাইনটা কোন নাস্তিকের লেখা? তাহলে শোনেন, ঠিক আগের প্যারায় লোকটা কী লিখেছে!
“এই দেশের হতভাগা লোকগুলি খোদাকে দোষ দিয়ে চুপ করে থাকে। ফসল নষ্ট হয়েছে, বলে আল্লা দেয় নাই, না খেয়ে আছে, বলে কিসমতে নাই।…আল্লা মানুষকে এতো দিয়েও বদনাম নিয়ে চলেছে…ডাক্তারের অভাবে, ওষুধের অভাবে, মানুষ অকালে মরে যায়- তবুও বলবে সময় হয়ে গেছে। আল্লা তো অল্প বয়সে মরবার জন্য জন্ম দেয় নাই। শোষক শ্রেণী এদের সমস্ত সম্পদ শোষণ করে নিয়ে এদের পথের ভিখারি করে না খাওয়াইয়া মারিতেছে।”

কতখানি স্বচ্ছ চিন্তাশক্তি আর অকপটতা থাকলে এইরকম সহজ করে কথাগুলো লেখা যায় ! মানুষটা বুঝিয়ে দিল নিজেকে প্রগ্রেসিভ প্রমাণ করার জন্য অহেতুক ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দরকার নেই, আবার ধার্মিক প্রমাণ করার জন্য হেফাজতিদের তোষণ করারও দরকার নেই। সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস আর নিজের সামর্থ্যের সম্মিলন না ঘটালে মুক্তি নেই। এই সম্মিলন ঘটাতে বুকে বল লাগে, আল্লাহর উপর অগাধ বিশ্বাস ও কাজে সততা লাগে, নিজের লোকগুলোর জন্য আকাশ সমান ভালবাসা থাকা লাগে। পুরো বাংলাদেশকে নিজের সন্তান ভাবা লাগে। আর হ্যাঁ, মানুষটার নামটা শেখ মুজিবুর রহমান হতে হয়। তাহলেই এত সরল ভাষায় এই জটিল কথাগুলো বলা যায়!
অসীম মুগ্ধতা নিয়ে পড়ছি ‘কারাগারের রোজনামচা’। স্যালুট, পিতা।

Being Human

This morning I took a BRTC bus. There was a little girl standing beside my seat. She was around five, not big enough to balance herself in a moving bus. To her mum, she was comparatively bigger than the other child. The poor mum could not take two kids in her arms at the same time. So, the little girl was trying to help herself. I took her on my lap and looked at the back to make sure that her mum knew that she was safe with me. To my surprise, I found the other passengers to be a little uneasy with this situation. Why? Because the girl’s dress suggested that she belonged to a poor family. May be her mum was a garment worker or something like that. I did not mean to start a revolutionary movement with my action. Being a Bangalee woman, to offer my lap to a child seems to be the most natural thing to do. Why does it seem so strange? Being completely unaware of the complexities of life, my Bangalee princess pushed herself a bit more towards me so that she could sit comfortably. I loved that!

Finally, when the bus reached my destination, she went back to her Mum. While I was trying to reach the bus door through the crowd, I had to get the attention of the women standing beside my seat. Being unsure about how to address those ladies (Auntie or Apa), I just said, ‘Excuse me.” That worked!!! The looks on their faces changed. Wow! My prestige among Bangalees was regained by some English words!

Can’t help but mentioning that this is March – the glorious month of Independence! 46 years back, we were united as a nation – we were determined to fight against all sorts of injustices and discriminations. Seems like a myth sometimes.

Tilt Up আয়নাবাজি

একসময় সিনেমার স্ক্রিপ্ট আর বীজগণিতের অঙ্কে কোন তফাৎ ছিল না। চিরচেনা ফর্মুলা, কেবল সংখ্যা বা বর্ণ এদিক ওদিক হতে পারে। গল্পের বিষয়বস্তু ঠিক হওয়ার আগেই প্রযোজক, পরিচালক, আর চিত্রনাট্যকার বসে ঠিক করতেন, ৭টা গান, ৫টা ফাইটিং সিন, ২টা কিস সিন থাকবে , এর মধ্যে ৩টা গানের শুটিং ব্যাংককে হবে। ব্যস, এবার চিত্রনাট্যকারকে বলা হল- এই ফমুর্লায়একটা স্ক্রিপ্ট লিখে দিতে।
বিরক্ত হয়ে যদি ভারতীয় ছবি দেখতে গেলেন তো সেখানেও ফমু‍র্লা। কোন কোন ছবি দেখলেই বোঝা যায, গল্পকে ছাপিয়ে তথাকথিত ‘সাহসী’ দৃশ্য দেখানোই পরিচালকের মূল লক্ষ্য ছিল। কোন্ জিনিসটা গল্পের প্রয়োজনে এসেছে, আর কোনটার কারণে গল্প বানানো হয়েছে- সেটা বোঝার মত বোধবুদ্ধি কিন্ত দর্শকের আছে।
সেদিক দিয়ে #আয়নাবাজি বিরাট ব্যতিক্রম। সমস্ত ফর্মুলাকে উল্টেপাল্টে দিল। একেবারেই অন্যরকম গল্প।
শুরুতে খুব বেশি প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে বসি নি। বন্ধুরা একসাথে হ্যাংআউট করতে যাওযাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।
সাথে আমার বিদেশী সহকর্মীটা ছিল। ও বাংলাদেশকে ভালবাসে কিন্তু বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে এখনো ওর তেমন ধারণা গড়ে ওঠে নি। আমার খুব ইচ্ছে ছিল ভাল মানের একটা বাংলা ছবি ওকে দেখাব। সে দিক দিয়ে আয়নাবাজি একদম পারফেক্ট মনে হয়েছিল আমার কাছে। মেকিং যে ভাল হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু শেষ মেশ কী হল, জানেন?ছবি যখন শেষ, যখন নাম উঠতে থাকল, তখন কোন কোন বাঙালি উঠে যেতে থাকল কিন্তু আমার বিদেশী বন্ধু বসেই আছে। বললাম, যাবা না? ও হাঁ করে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর একটু থাকি।’ ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বাজছে- লাগ, ভেল্কি লাগ, আয়নাবাজির ভেল্কি লাগ। আমি বুঝলাম, ভেল্কি লেগে গেছে। অমিতাভ রেজার সৃষ্টির গৌরব তখন আমার বাঙালি বাংলাদেশী সত্তাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। ওই বিদেশী তখন আবিষ্ট আর আমি কৃতজ্ঞ অমিতাভের প্রতি।
অভিনযের কথা আর কী বলব? চঞ্চল চৌধুরী ভাল অভিনেতা জানতাম কিন্তু এমন অসহ্য সুন্দর একটা পার্ফরমেন্সের জন্য সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না। প্রতিটা ক্যারেক্টারে যখন চঞ্চলের রুপান্তর ঘটছিল তখন মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করলাম, একেকজনের ইডিওসিনক্রেসি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অত্যন্ত মুন্সীয়ানার পরিচয দিয়েছেন। অসংস্কৃত দুশ্চরিত্র প্রথম অপরাধী কথায় কথায় কুঁচকিতে হাত দেয়, দ্বিতীয়জন অপ্রকৃতিস্থের মত ঘাড় গুঁজে তাকিয়ে থাকে আর চিৎকার করে ইংরেজি ফুটায়। তৃতীয় জন তো ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। আত্মগত স্বরে কিছুক্ষণ পর পর রেটরিক কোয়েশ্চেনের মত করে লোকটা ‘হুম’ করে শব্দ করে। তার নিয়ন্ত্রণকামী মানসিকতা প্রকাশরে জন্য এর চেয়ে ভাল কোন বৈশিষ্ট্য কিছু কি হতে পারত? মনে হয় না।
আমার শহরটাকে এর আগে আমার কাছে কোন ছবিই এভাবে তুলে ধরে নি। হলিউডের ছবির তুষারপাত, ছবির মত সাজানো রাস্তাঘাট দেখতে খারাপ লাগে নি কখনো। কিন্তু মনের কোণে এই অনুভূতিটা থাকত যে, ওগুলো সব পরের বাড়ির চিত্র। আমার পারিপাশ্বি‍র্কতার সাথে ওসবের কোন মিল নেই। এমনকি ভারতীয় বাংলা ছবিতে ভাষা আর চেহারায় নিজেদের সাথে এত মিল থাকা সত্তেও কোনদিন নিজের চারপাশটাকে রিলেট করতে পারি নি। ওদের নায়ক নায়িকা কলকাতার যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, সেটা আমার অচেনা। কিন্তু আয়নাবাজির সেটিং দেখে কিছুক্ষণ পরপর আমার মুখ দিয়ে বের হয়েছে- আরে এটা আমার বাড়ির রাস্তা! আরে এটা অমুক সরণি, দেখেছিস ্ওই ফ্লাইওভারের কাছে গিয়ে শুটিং করছে! সবাইকে ছাপিয়ে বিদেশীটা আবার সবার আগে বলে উঠল, “শ্য্যামা, দেখ, ওল্ড ডাকা”।
আয়নাবাজির এই বিশাল জনপ্রিয়তার মূলে বোধহয় এটাই ছিল। আমরা অনেকদিন পরে একটা মুভি পেয়েছিলাম যেটা আমাদের। সেটিং আামাদের , অ্যাকসেন্ট আমাদের। তবু অভিনয় আর গল্পটা দেশ, কাল, ছাপিয়ে আবেদন তৈরি করতে সক্ষম।
রোমান্সের ক্ষেত্রে মাত্রাবোধ দেখিয়েছে এই ছবি। এটা আমার ভাল লাগার আরো একটা কারণ। বেশিরভাগ পরিচালক ‘সাহসী’ দৃশ্য দেখানোর অজুহাত খোঁজেন। কিন্তু ইনি তার ধারকাছ দিয়েও যান নি। আর তাই, আমি দুবার আয়নাবাজি দেখে ফেলেও তৃতীয়বারের মত আমার মা আর খালামণিদের নিয়ে মুভিটা দেখতে যাওয়ার কথা ভাবছি। কারণ আমার বিব্রত হওয়ার মত কোন কারণ পরিচালক ঘটান নি।
স্বপ্নের মত একটা রোমান্স দেখানো হয়েছে।নায়কের খ্যাতির প্রতি তেমন মোহ নেই। অভিনয় করার জন্য তার রক্ত খেলা করে। তাই সে বাস্তব জীবনে অভিনয় করে। নাটকে সিনেমায কোন চেষ্টা করে নি। নায়িকা ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষ করে বাড়িতে বসে আছে সন্তুষ্টচিত্তে। সামাজিক প্রত্যাশার চাপটা যদি না নিতাম, তাহলে আমরা বেশিরভাগ মানুষই বোধহয় নায়িকার মত এরকম একটা শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন বেছে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তা হবার উপায় নাই। তাই পর্দায় কিছুক্ষণ স্বপ্নের মত জীবনটা দেখতে বড় ভাল লাগছিল। নায়িকা রোজ নৌকায় করে নায়ককে দেখতে আসবে। আ কাপ অব কাপুচিনোর বদলে রঙচায়ের জীবনের সৌন্দর্যটাকেই সে বেছে নিচ্ছে। খুব বেশি কিছু না জেনেও ভালবেসে ফেলার রোগটা টিনএজে থাকে। কিন্তু এখানে দুজন ম্যাচিউরড মানুষকে দেখানো হল যারা জীবনটাকে জেনেবুঝে উপভোগ করতে চাইছে।
বৃষ্টির শটগুলো ভাল্লাগছে। এক এক সময় একটা ার্থ প্রকাশ করেছে। কখনো কখনো অসহায়ত্ব, কখনো, ঘোর অন্ধকার জীবনে ঢোকার পূর্বমুহুর্ত আবার কখনো সবকিছু ধুয়ে যাওয়ার ব্যঞ্জনা।
Tilt Up আয়নাবাজি কেন বলছি? কারণ বছরখানেক আগে একবার বাসার গেট দিয়ে ঢোকার সময় অমিতাভ রেজাকে দেখেছিলাম। আমি গেট দিয়ে ঢুকছিলাম আর উনি বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তার মুখটা আমার মোটেই পরিচিত ছিল না। কিন্তু তার চেখের দৃষ্টিটা আমার বড় অদ্ভূত লেগেছিল। কেমন যেন মাথাটা নীচু করে রেখে চোখ উঁচিয়ে তাকানো। তার কিছু লাইভ ভিডিওতেও দেখলাম একই কাহিনী। দৃষ্টিটা দেখে মনে হয়, উনার চোখমুখ বলে উঠছে-Tilt Up! তার দৃষ্টিটা এমন অদ্ভূত বলেই বোধহয় তিনি জগতটাকে আমাদের চাইতে একটু অন্যভাবে দেখেন। আমাদের মত একরৈখিক দৃষ্টি না বলেই হয়ত এমন একটা মুভি বানানো তার পক্ষে সম্ভব হল।।
অবশ্য আমি এখনো ভেবে পাই না, ভদ্রলোক বাংলাদেশী মুসলমান নিয়ে এমন অদ্ভূত বয়ান কেন দিয়েছিলেন? ইচ্ছে করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন? যাতে মানুষ বিষয়টা কী তা বোঝার জন্য হল অবধি যায়?নাকি পুরো পরিবার একসাথে বসে মুভিটা দেখতে পারবে (যেটা ভারতীয় মুভির ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে না) এই বিষয়টা বোঝাতে গিয়ে এই কথাটা বলেছিলেন? কী জানি! বড়মাপের শিল্পীরা যে বড় মাপের ব্যবসায়ী হবেন না, এমন তো কোথাও লেখা নেই। তবে উনি ব্যবসা করুন আর যাই করুন, এরকম আরো মুভি বাংলাদেশে তৈরি হোক।

টেইক আ বাও, #অমিতাভরেজা। আপনার অজান্তেই আপনি বহু বাঙালি বাংলাদেশীর ব্যক্তিগত অানন্দ আর গৌরবের কারণ হয়েছেন। আপনাকে ধন্যবাদ।

Magic Diary (Part 1)

November 14, 2012

Bibhu is no one of this world, but his power of analysis and feelings make me think that he too is a human being of flesh and blood like us. Nothing is needed to say to him, he understands by himself. This morning, when sitting in the dining table I was drinking coffee that he made for me, and then he told a very strange thing.

“Ritu,” putting his coffee mug on the table Bibhu asked me, ” I don’t know why it seems to me that you are getting pleasure by harboring a pain within yourself, isn’t it? ” An air of all- knowing psychologist was seen on his face.

“All these are nonsense. Why should I harbor a pain, why? Am I a poet or a beggar to sell my pain to live on?” His words annoyed me so much that I could not help being a little rude.

“Ah, a brilliant metaphor! But this so direct one, I am sure, will extremely enrage the poets.” Saying this, he burst into great laughter.

His laughter always sounds a little different, and pleasing to mind.

“Leave it, man! No one will mind it if he has a little sense of humor. And if he is a real poet, undoubtedly he won’t mind. However, let’s come to the main point, why do you think that I harbor pain within me?”

“It’s true not only for you, but for many others also. When an accident happens in a man’s life, he tries to ignore it, he cannot accept, and then all his mind and heart cry out together saying ‘no, it can’t be. And it ‘s, in the moment of affliction, the first reaction of every human being.”

” What’s the second reaction?”

“Anger. When a man gets into affliction, he becomes angry with the person who causes it, but if there’s no one to blame straightway, then his anger falls on God. Thus men get satisfaction by putting all blames on the poor Creator”.

I could realize very well that every word of these is true to my nature, though I did not tell it. Trying to show indifference in my tone as far as practicable, I asked,” Is it so, then what happens?”

“Then comes the most difficult moment. ” He said,” That means, the moment of taking decision. Some people decide to forget his pains, and find out various strategies as well to keep themselves away from their pains. But some become adamant and ponder over it day and night, all the time, with reason and without reason. This brings to them a feeling of sweet pain. When mosquito bites and if one presses with finger, he gets a feeling, and this is much of like that. You feel pain, but a little pressure on it gives a pleasure as well”.

This amused me much. “You did never experience mosquito bite, then how could you know this? Is there mosquito in your world?” I asked.

“When I come to your house, mosquitoes then bite me! You never use mosquito-coil”.

“Yes, because it burns my eyes, but do you think that to have that painful-sweet feeling I persistently have borne that mishap in mind?”

“No, your case is a little bit different. You want to forget, and yet you don’t do. I’ll make it clear to you in another day, for you need to get ready to go to your office.”

“Disgusting! The suspense is like the situation of a mega serial drama!”

Bibhu smiled a bit and got out of the room.

(To be continued)

এই শুনছ?

সাতসকালে একটা প্রেমপত্র লেখার অফার পেলাম। এক গুরুজন বুদ্ধিটা দিলেন। প্রাপকের নাম শুনে লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। কারণ সেই প্রাপককে আমি বহু বছর ধরে ভালবাসি। কিন্তু সময় করে কখনো তাকে বলা হয় নি।
যারা ইতমধ্যে ভ্রু কুঁচকেছেন তাদের বলছি- বিনা দ্বিধায় পড়তে পারেন। যে বয়সেরই হোন না কেন, যে সম্পর্কেরই হোন না কেন। আপনাদের লজ্জায় ফেলে দেবার মত কিছু আমি লিখি নি।
তুলে দিচ্ছি আমার জীবনে লেখা ভালবাসার প্রথম চিঠি।

” তোমার জন্য একটা সম্বোধন বের করতেই এত সময় লেগে যাচ্ছে! যে শব্দগুলো মাথায় আসছে, তার একটাও তোমার জন্য যথেষ্ট না। প্রিয়তম বলব? না, ওটা ভীষণ সেকেলে। বহু মানুষের যথেচ্ছ ব্যবহারে ওর আসল উষ্নতা কবেই চলে গেছে। ‘প্রিয়তম’ শব্দটার হাল অনেকটা জুড়িয়ে যাওয় চায়ের মত- দুধ, চিনি, চা- সবক’টা উপাদানই তাতে বিদ্যমান। কিন্তু উষ্নতার অনুপস্থিতির কারণে জিনিসটার কোন আবেদন আর নেই। তাই, সম্বোধন বরং থাক। ওটা বাদ দিয়েই শুরু হোক আমাদের কথা।
ভেবেছিলাম, তুমি আমার কাছে কী- সে কথা যদি বলতে শুরু করি, তাহলে হয়ত কথা ফুরোবে না। কিন্তু না, সেকথাও তো শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে। কারণ এমন একটা কথা আমার নেই যা তুমি জান না। এমন হলে কি চলে, বল? তাহলে কি কথা বলে সুখ আছে? কিন্তু বহুদিন ধরে তোমার সাথে সাথে াকতে থাকতে এও বুঝেছি, এই জানাটাই তোমার সাথে আমার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য, সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
পৃথিবীর আর সমস্ত সম্পর্কে অতি পরিচয়ের গ্লানি আছে, একঘেয়েমির আশঙ্কা আছে। দুজন দুজনকে বেশি করে জানলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার ভয় আছে। কিন্তু তুমি এত সৃষ্টিছাড়া, এত বিচিত্র যে সেসবের বালাই তোমার নেই। আমার প্রতিটি কোষ, প্রতিটি রক্তবিন্দু তোমার পরিচিত বলেই আমি এত বেশি করে তোমার। আমাকে এত বেশি জান বলেই আমার প্রতি বিরক্ত হবার কোন সম্ভাবনাই আর নেই। নিজেকে পুরোপুরি, জানার পরেও নিজের প্রতি টান মানুষের যায় না, ঠিক সেইভাবে আমাকে পুরোপুরি জেনেও তুমি সমান মনোযোগ দিয়ে আমাকে ভালবেসে যাচ্ছ।
আচ্ছা, আমি তোমাকে কীভাবে ভালবাসি? এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা তুমি। আমাকেও তো তুমিই সৃষ্টি করেছ। এত সৃষ্টির ভিড়েও তুমি আমার মত অযোগ্য সৃষ্টির সমস্ত খুঁটিনাটি লক্ষ্য রাখ। এত অবাধ্যতার পরেও তুমি আমার প্রার্থনার উত্তর দিয়েছ। আমাকে শুধরে দিচ্ছ। আমার যন্ত্রণার মুহুর্তগুলোতে আমার পরম আশ্রয় হবার জন্য ধন্যবাদ। আমি না বললেও প্রতিটা মুহুর্ত পাশে থাকবে জানি।
ইতি, তোমারই শ্যামা।

শুদ্ধতম অনুভূতি

পৃথিবীর শুদ্ধতম অনুভূতির নাম স্নেহ। ভালবাসার অন্য সমস্ত ফরম্যাটের সূচনাতে আদান- প্রদানের একটা বিষয় থাকে। কিন্তু স্নেহ জিনিসটা শুরুই হয় একটা লস প্রজেক্ট হিসাবে।
বিষয়টা আগে বুঝি নি। মা-বাবার একমাত্র সন্তান তো। পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলাম বহুদিন। ভালবাসা পাওয়াটা একটা স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কেউ ভালবাসলে প্রতিদানে আমিও তাকে ভালবাসতাম। আমি আগ বাড়িয়ে কাউকে ভালবাসিনি। দরকার পড়ে নি। কিন্তু হঠাৎই একদিন সব হিসাব এলোমেলো করে দিল একজন।
ছোট্ট একটা মানুষ। ১৮ ঘন্টা ঘুমিয়ে থাকে। কোলে নিতে গেলে কাপড়- চোপড় নোংরা করে দেয়। মাঝে মাঝে পিট পিট করে তাকায়। আমি যে ওর কে তা আলাদা করে জানেও না। কিন্তু আমি ওর অনেক কিছু জেনে গেছি। লাল জিনিস দেখলে ও সেইদিকে তাকিয়ে থাকে। ও যখন ভ্যা ভ্যা করে কাঁদে, তখন ওকে কোলে নিয়ে ঝাঁকালে ও হেসে ফেলে। ওর থুতনিটা ছিল একটা সুইচের মত। টিপ দিলেই হাসত। কিন্তু তবু ও লস প্রজেক্ট। ভালবাসার জবাবে ফিরতি ভালবাসা দিতে পারে না। মুখে কথাই যে ফোটে নি। তবু এই ছোট্ট মানুষটাকে ভালবেসেই চললাম।
ওর প্রতি আমায অব্যাখেয় ভালবাসার কারণে অন্য সমস্ত ভালবাসার ব্যাখ্া বুঝতে শুরু করলাম। মা-বাবা কী কারণে, কোন আনন্দে সন্তানকে ভালবসেন সেটা বুঝলাম। ওকে দশ মিনিট সামলাতে গিয়েই আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যেত। আর সৃিষ্টিকর্তা অামাদের মত নাদান সৃষ্টিকূলকে কীভাবে সহ্য করেন তা ভাবতেই আমার ঈশ্বর ভক্তি আরো বেড়ে গেল। ও আমার জীবনে না আসলে আমি জানতামই না ভালবাসা পাওয়ার চাইতে দেওয়াতেই বেশি আনন্দ। স্নেহ মানুষকে মানবিক করে , পরিশীলীত করে। আমাকে একটু হলেও মানবিক করে তোলার ক্রেডিটটা তার পাওনা।
আমার জীবনে প্রথম স্নেহের উৎসই হল সে-
প্রজ্ঞা পারমিতা। আমার ছোট বোন। প্রচণ্ড বুদ্ধিমতী। কিন্তু অসহ্য রকম দুষ্টু। আশ্চর্য রকম মিষ্টি। অাগামীকাল ওর জন্মদিন। ঈশ্বর ওর মঙ্গল করুন।
12472612_10209105669503138_8311510734798069850_n

দেশী শব্দের বিদেশী স্রষ্টা

আমার বিদেশী সহকর্মীটা ইদানীং বেশ আগ্রহ নিয়ে বাংলা শিখছে। শব্দ নিয়ে মজা করতেও শিখে গেছে।

ওর আমেরিকান মুখে দ/ধ মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। বন্ধু হয়ে যায় বন্দু; বন্দুক হয়ে যায় বন্ধুক। সেদিন শব্দদুটো ঠিক করে নিতে আসল আমার কাছে। বুঝিয়ে দে্য়ার পরে অদ্ভূতুড়ে উচ্চারণে বলল, ‘আচ্ছা! বন্দু আর বন্দুকের মধ্যে তো দেখছি শুধু একটা ‘ক’ পরিমাণ দুরত্ব! বাঙালি বন্ধু যে কখন বন্দুকের মত ভয়ংকর হয়ে যাবে. কে জানে!’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর তুমি যেহেতু মেয়ে, অতএব, তুমি রেগেে গলেে আর বান্ধবী থাকবা না, হয়ে যাবা ‘বান্ধবিক’ !”

আমার এই মহাপাজি ছাত্রটা যতটা না শেখে, তার চাইতে বেশি ভাষাকে ভাঙচুর করে।

বন্ধু দিবস ২০১৫

ক্লাস এইটের স্কলারশিপ পরীক্ষা। স্কলারশিপ পরীক্ষার জন্য সিলেক্টেড হওয়াটাও আমাদের মত ব্যাকবেঞ্চারের কাছে একটা সেইরকম খবর ছিল। বাংলাদেশ কখনো বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য চান্স পেলে যেমন অবস্থা হবে আমাদেরও ঠিক তেমন অবস্থা ছিল। স্কলারশিপ জেতার কোনরকম উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। রিল্যাক্সমুডে বসে বসে এক ঝাঁক ব্রিলিয়ান্টদের দিকে চেয়ে দেখছিলাম। আমরা দুই বন্ধু প্রায় পরপর বেঞ্চিতে বসেছি। মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে বসে আছে এক অতিমাত্রায় ভাল ছাত্রী। সেই সিরিয়াস ছাত্রীটি তার মনগড়া কোন কারণে আমাকে লেখাপড়ায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত (তার আর আমার সিরিয়াল খুব কাছাকাছি থাকত বলেই হয়ত।)। অথচ তার এতটা মনোযোগের যোগ্য আমি ছিলাম না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অদ্ভূত কোন খেয়ালে আমার চেহারাটা দেখে গোড়ার দিকেই কেউ কেউ আমাকে ভাল ছাত্রী বলে ধরে নেন। যাহোক, সেই মহামান্যা এক্সাম হলে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন- নিজে যদি স্কলারশিপ নাও পান তবু আমারটা যে করেই হোক আটকে দেবেন। সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা। অঙ্কে আমার সাংঘাতিক ভীতি। যে কয়টা পারি করে চুপচাপ বসে থাকলাম। এদিকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের তো মন মানেনা। ও অঙ্কে ভীষণ ভাল। ও চাইছে এই শেষ পনের মিনিটে আমাকে হেল্প করতে। কিন্তু ঠিক যে অঙ্কটা আমার করা বাকি আছে, সেটা ও করে নি। ও সামনের সেই ব্রিলিয়ান্টকে কাকুতি মিনতি করতে লাগল- প্লীজ, আমাকে কিচ্ছু দেখাতে হবে না। আমি তোমাকে একটা বলে দেব। তার বদলে শ্যামাকে ওই অঙ্কের সূত্রটা একটু বলে দাও। আমি জানি, তুমি ওই অঙ্কটা করেছ।“ আমার বেঞ্চ থেকে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। মজার কথা হল, পরীক্ষার হলে দেখাদেখির প্রতিভা আমার শুন্য। মেয়েটি দেখাতে চাইলেও আমি দেখে উঠতে পারতাম না। মেয়েটি হাসিমুখে খাতা ঢেকে বসে থাকল। আমার বন্ধুটা অসহায় মুখে দুই বেঞ্চ দুরত্ব থেকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকল। পরীক্ষা শেষে বরাারের মতই দাঁত বের করতে করতে বের হয়ে এলাম। কিন্তু আমার বান্ধবীর চোখ জলে টলমল করছে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে জল আটকে রাখার। আমি ওই অঙ্কটা করতে পারি নি-এই দু:খ ও ভুলতে পারছে না। ওকে সেদিন কিছু বলি নি। মনে মনে ভাবলাম, “যদি ওই মেয়ের কাছে দেখতাম, সেটা হত আমার সারাজীবানের কলঙ্ক। আর ও দেখায় নি বলেই আমি তোকে চিনলাম। জানতে পারলাম, বন্ধুত্ব এত নি:স্বার্থ হতে পারে। ওই অসীম শত্রুভাবাপন্ন মেয়েটির কাছে আমি কৃতজ্ঞ।“
বলা বাহুল্য স্কলারশীপ পাই নি। কিন্তু তার বদলে গোটা স্কুলজীবনে যা পেয়েছি, তার তুলনা নেই। আমরা পাঁচ বাঁদর নিজেদের নাম দিয়েছিলাম-পঞ্চ পান্ডব। বিজ্ঞান ভবনের ছোট দুই সীটের ডেস্ক সেট- আপ আমাদের মনে ধরে নি। সমস্ত গার্ড আর বুজিদের নজর এড়িয়ে কলা ভবন থেকে পাঁচ জন বসার মত বেঞ্চি টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম বিজ্ঞান ভবনের দুই তলায়। বসব যখন, পাঁচজনই একসাথে বসব। কেউ এক টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়ে যা কিছু নোট, সাজেশন্স পেত- সব কিছু নিজ দায়িত্বে সে-ই পাঁচ কপি করে ফেলত। নোট নিয়ে অতি কাছের বন্ধুদের মধ্যেও অনেক কূটনামি দেখেছি। আমাদের মধ্যে সেটা ছিল না।
আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যাকে পেলাম তার মাথার সাথে আমার ওয়াইফাই কানেকশন ছিল। কোনকিছু মুখে বলা লাগত না। এমনিই বুঝে যেতাম। দুই বন্ধু সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে বসে বসে উল্টোপাল্টা গল্প করে যাচ্ছি। দুপুর সাড়ে বারটার বাসটা ধরার কথা। ১২.২৫ এর সময় দুজন একসাথে বলে উঠতাম। “ধুর, এখন এখান থেকে মলচত্বরে পৌছানো যাবে না। ১.২০ এর বাসে যাব।” মজার ব্যাপার হল, ১.১৫ বাজলেও এই একই রিয়ালাইজেশন হত। এরকম করতে করতে প্রথম দুই বছরে প্রায় প্রতিদিনই বাড়ি ফিরতাম ক্ষণিকার লাস্ট বাসটা ধরে। বন্ধুত্ব বোধহয় এমনই। ছোটবেলায় পড়ে আসা ‘সময়ের মূল্য” রচনাকে নিমেষে ভুলিয়ে দিতে পারে।
কোন কোন বছর, পঞ্চপান্ডবের কারো জন্মদিনে আমি যখন খুব ভাব নিয়ে ফোন করে “’হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ গানটা গেয়ে উইশ করি, তখন ওপাশ থেকে সে বলে ওঠে, “ ফালতু ভাব মারিস না। তা, এ বছর কে মনে করিয়ে দিল, ববি, তাশা, নাকি মৌলি?” আমার কোন খোঁড়া যুক্তি তখন কাজে আসে না। বন্ধুত্ব বোধহয় এমনই। ভুলোমনা বন্ধুর স্টুপিডিটি মেনে নিয়ে, তার উপর হম্বি-তম্বি করে আবার তাকে কাছে টেনে নেওয়া।
চাকরিজীবনে এসে যাদেরকে পেয়েছি, তারা আমার মত একটি টিউবলাইটকে কেন এবং কী কারণে এত সহ্য করে আমি জানি না। আমার প্রতিটি দুর্বলতা মেনে নিয়ে নিজের ঘাড়ে এক্সট্রা চাপ নিয়ে এরা কী আনন্দ পায় আমি বুঝি না। তাদের কেউ কেউ আবার দেশ কাল সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে বারবার মনে করিয়ে দেয়, “তুমি আমাকে সহ্য করতে না পারলেও কিছু করার নেই। যেখানেই থাকি, আমি তোমার জীবন থেকে সরছি না।” কেউ আবার মনে করিয়ে দেয়, ‘তোর ভালবাসাব ধার ধারি না। আমার কাজ আমি করে যাব।” কেউ আবার অসীম নির্ভরতার দৃষ্টিতে চেয়ে আমার মত অভাজনকেও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আমার জীবনের বেস্টফ্রেন্ডদের একজনকেও আমি সিলেক্ট করি নি। নিজে আগ বাড়িয়ে কারো সাথে বন্ধুত্ব করার প্রতিভা আমার নেই বললেই চলে। তবু এরা আমার বন্ধু হয়ে আছেন। মেনে নিতেই হয়, এরা ঈশ্বরের মনোনীত। আমার বন্ধুদের মত ধৈর্যশীল জীব খুব কমই হয়। আমার মত একগুঁয়ে, বদমেজাজী, অালসে, অমিশুকে, ভুলোমনা, অসামাজিক, ঘরকুনো প্রজাতির প্রাণীকে যারা দিনের পর দিন সহ্য করে চলেছেন, তারা নি:সন্দেহে ঈশ্বরের বিশেষ সৃষ্টি। আমার চোখে তারা ছোটখাট মহামনীষী।

(বন্ধু দিবস ২০১৫ উপলক্ষে লেখা)

(আগস্ট ২, ২০১৫)

শেক্সপীয়র এবং নারীবাদ প্রসঙ্গ– সুস্মিতা শ্যামা

শেক্সপীয়র নামটি এবং নারীবাদ মতবাদটি কোনভাবেই সমবয়স্ক নয়। তাই এদুটো শব্দ একসাথে দেখলে একটু বিভ্রান্তিকর মনে হতেই পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভাবের জন্ম ভাষার আগেই হয়। তাই ‘সুন্দর’-কে সুন্দর বলে ডাকতে শেখার আগেই সদ্যজাত শিশু তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা রাখে। ঠিক তেমনি করে, নারীবাদ মতবাদটি বিকশিত হওয়ার বহু আগেই, শেক্সপীয়রের বিভিন্ন লেখায় এর নিদর্শন দেখতে পাওয়া গেছে। তবে “অ্যাজ ইউ লাইক ইট”, “দি মাচের্ণ্ট অব ভেনিস” এবং “ম্যাকবেথ”-এ এই ইস্যুগুলোর উপর তুলনামূলক বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে “অ্যাজ ইউ লাইক ইট”-এর কথাই ধরা যাক। এখানে নায়িকা রোজালিণ্ডকে নায়ক অর‌ল্যাণ্ডো দেখেছে সৌন্দর্যের প্রতিভূ হিসেবে। যত কবিতা নায়ক লিখেছে, যত প্রশংসাই সে করেছে রোজালিণ্ডের, তাতে কোথাও নায়িকার বৌদ্ধিক সামর্থ নিয়ে একটা লাইনও লেখা হয় নি। কারণ ‘প্রেমিকা’ নামক এই রমণীয় জীবটির যে বুদ্ধি নামক কোন বস্তু থাকতে পারে তা বেচারা নায়ক তার ঘোর দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করে নি। তাই, প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার পরে, অর‌ল্যাণ্ডোর অভিব্যক্তি ছিল এরকম-“O poor Orlando! Thou art overthrown/Or Charles or something weaker masters thee” অর্থাৎ এতবড় কুস্তিগীর চার্লসকে হারিয়েও তার চেয়ে ঢের দুর্বল এক শক্তির কাছে তাকে হেরে যেতে হল, সেই দুঃখেই বেচারা কাতর। এখন পর্যন্ত সে শুধু রোজালিণ্ডের রূপটাই দেখেছে । তার মনের পরিচয় তখনো পায় নি বলেই সে তখনো জানে না, আরো কী কী হার তার কপালে অপেক্ষা করে আছে।
নাটকটি যাদের পড়া আছে, তাদের নিশ্চয়্ই এতক্ষণে মনে পড়ে গেছে যে, অরল্যাণ্ডোর কী দশা করেছিল পুরুষবেশী রোজালিণ্ড। মেয়ের পরিচয়ে বাইরে গেলে বিপদের আশঙ্কা। তাই, রোজালিণ্ড পুরুষের বেশে গ্যানিমিড নাম নিয়ে বনে এসেছিল। আর সেখানে গোটা বনটাই তখন চলছিল তার অঙ্গুলিহেলনে। অরল্যান্ডো রোজালিন্ডকে না পেয়ে গ্যানিমিডের প্ররোচনায় তাকেই রোজালিন্ড কল্পনা করে মনের কথাগুলো অকাতরে প্রকাশ করে যাচ্ছিল। আর রোজালিন্ডও নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে অরল্যান্ডোর প্রকৃত মনোভাব যাচাই করে নিচ্ছিল। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, অর‌ল্যান্ডো যখন দুঃখ ভুলতে গ্যানিমিডকে রোজালিণ্ড ভেবে প্রেম নিবেদন করছিল, তখন ছদ্মবেশী রোজালিণ্ড তাকে বারবার মেয়েদের অস্থিরচিত্ততা, সংসারজীবনের জটিলতা, পুরুষের ভালবাসার অসারতা নিয়ে সাবধান করে দিচ্ছিল। এই ডায়ালগগুলোর মধ্য দিয়ে রোজালিণ্ডের নিরপেক্ষ জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে। সে নিজে মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তার স্বজাতির দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে পুরো মাত্রায় সচেতন। এই স্বচ্ছ চিন্তাপদ্ধতির কারণেই সে গোটা নাটকের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
এরপর আসে মার্চেণ্ট অব ভেনিসের কথা। এখানেও নায়িকার অনেক বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ আছে। কিন্তু এখানে নায়িকা পোর্শিয়া প্রত্যক্ষভাবেই ত্রাতার ভূমিকায় দেখা দিয়েছে। বাঘা বাঘা নামজাদা লোকজন যে মামলাটা নিয়ে তোলপাড় করে ফেলল কিন্তু কোন সুরাহা করতে পারল না, পোর্শিয়া এক নিমেষে তার সমাধান করে ফেলল তার কমন সেন্স দিয়ে। এখন প্রশ্ন হল, এতগুলো ছেলে থাকতে ঘরে থাকা একটা মেয়েকে দিয়ে এই সমাধান নাট্যকার কেন দেওয়ালেন? কারণ আর কিছুই না, কারণ হল সংকীর্ণতায় ঘা দেওয়া। সমাজ একটা মেয়ের মুখ থেকে এতখানি বুদ্ধিদীপ্ত জেরা আশা করে না, এমনকি আদালত কক্ষে তার ঢোকারও কোন অনুমতি নেই। তাই পোর্শিয়াকে পুরুষের ছদ্মবেশে সেখানে ঢুকতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত, তার স্বামী বাসানিও-র কাছ থেকে পুরস্কার হিসেবে আংটি নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এবং সেই আংটি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রথমবারে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল। কিন্তু সমালোচকেরা এই দৃশ্যটির কয়েকটি অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমটি হল, ইহুদী শাইলকের বিচার দৃশ্য দিয়ে নাটক শেষ হয়ে গেলে নাটকের করুণ পরিণতির কারণে ভারি মন নিয়ে দর্শককে বাড়ি ফিরতে হত। আর ইহুদীর দুঃখ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি খ্রীষ্টান দর্শকেরা মেনে নিতে পারত না। সে কারণেই এই দৃশ্যটি কমিক রিলিফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর একটি ব্যাখ্যা আছে। পোর্শিয়া বাসানিও-কে আংটিটি আমৃত্যু আঙুলে রাখার শপথ করিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু বাসানিও বন্ধুর মামলা জেতার আনন্দে প্রতিশ্রুতি ভুলে উকিলবেশী পোর্শিয়াকে সেটা দিয়ে দিয়েছে। তাই, পোর্শিয়া যতই আংটির কথা জিজ্ঞেস করে, বাসানিওকে ততই সেই উকিলের প্রশংসা করতে হয় যাতে পোর্শিয়া ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারে। পোর্শিয়াকে সে বুঝাতে চাইল যে সে নিজে এবং তার বন্ধু অ্যাণ্টনিও সেই উকিলের কাছে চিরঋণী। আর এইসব সংলাপের মধ্য দিয়ে নাট্যকার মূলত পুরুষের মুখ থেকে নারীর বৌদ্ধিক সামর্থের স্বীকৃতি আদায় করিয়ে দিলেন।কারণ পরিচয় জানত না বলেই বাসানিও অত অকৃপণ প্রশংসা করেছে সেই উকিলের বুদ্ধির। আর পোর্শিয়াও পুরোদমে তার স্বামীর মুখ থেকে তার সুপিরিয়রিটির স্বীকৃতিটি আদায় করে নিতে পেরেছে। এই একই ব্যাপার অ্যাজ ইউ লাইক ইটের ক্ষেত্র্রেও ঘটেছিল। নারীর নারী রুপটি শুধু কোমলতা আর অধীনতার সমার্থ শব্দ হিসেবেই বিবেচনা করত তখনকার পুরুষেরা। তাই নারীর বুদ্ধি, বিবেচনার স্বাধীন প্রকাশ ঘটাতে পুরুষের ছদ্মবেশ নেওয়া ছাড়া গতি ছিল না।
ম্যাকবেথ নাটকে নারীর যে রুপ প্রকাশ পেয়েছে তাতে রীতিমত চমকে যেতে হয়। লেডি ম্যাকবেথ চরিত্রটি অত্যন্ত বিতর্কিত। কিন্তু এ চরিত্রটিও একটি বিরাট ধাক্কা তৎকালীন সমাজের জন্য। লেডি ম্যাকবেথ রীতিমত একটি ইভিল জিনিয়াস। নারীর এত নিষ্ঠুর রূপ কারো কাছেই প্রত্যাশিত নয়। কিন্ত শেক্সপীয়র জানেন, নারী বা পুরুষ কোন জাতই ভাল বা মন্দের একচ্ছত্র পেটেণ্ট নিয়ে রাখে নি। পদস্খলন যে কারোরই হতে পারে। তাই লেডি ম্যাকবেথ অন্যায় করেছে, ম্যাকবেথও করেছে। আবার সে পাপের শাস্তিও তাদের দুজনকেই পেতে হয়েছে।অন্যায়ের পরিণতি যেমন নারী পুরুষ মানে না, তেমনি অন্যায়ের প্রবৃত্তিও দু’ পক্ষের রক্তেই সহজাত। এই সত্যিটুকু শেক্সপীয়র আজ থেকে শত শত বছর আগেই বুঝে গেছেন, বুঝিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা কি বুঝি? নারীর মানুষ রূপটি নিয়ে আমরা কি আদৌ সচেতন? নারীর সমস্যা অভিযোগ বা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলেই তাকে নারীবাদী অ্যাখ্যা দেওয়া হয়। ঠোঁট উল্টে বলা হয়, “ভারি নারীবাদী! মানবতাবাদী হতে তোমাদের সমস্যা কোথায়? অহেতুক বিভেদ সৃষ্টি করার দরকার কী নারী আর পুরুষের মধ্যে?”
এদের কথার উত্তরে আমার পাল্টা জিজ্ঞাসা–কেন? নারী কি মানুষের বাইরে? আর কে বলল যে নারীবাদ কথাটির মাধ্যমে বিভেদ তৈরি করা হচ্ছে! যে বিভেদ যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে তা চিহ্নিত করতেই এই বাদটির জন্ম দেওয়া হয়েছে। এটাকে অমানবতাবাদ ভাবার কোন সুযোগ তো নেই!
প্রকৃতিতে চিরদিন নানাভাবে সবলের দ্বারা দুর্বল নিপীড়িত হয়ে আসছে। কখনো অর্থশক্তির কাছে দারিদ্র্য, কখনো পেশীশক্তির কাছে রুগ্নতা, আবার কখনো পৌরুষের দাপটের কাছে নারীত্বের পরাজয় হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বিশেষ বিশেষ সুবিধাবঞ্চত গোষ্ঠীর হয়ে কথা বলছেন। তারা সবাই-ই মানবতাবাদী। কিন্তু কে ঠিক কার কথা বলছেন তা বুঝতেই আমরা কাউকে কম্যুনিস্ট,কাউকে নারীবাদী বলে চিনে থাকি! এদের দায়িত্ব বিভেদ দূর করা। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে পুরুষবিদ্বেষ প্রচার করেন, তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত সমস্যা। গোটা নারীবাদকে এর সাথে জড়িয়ে ফেলার কোন কারণ নেই।
একটা সমস্যা হল, আমরা মেয়েদের ব্যাপারে খুব বেশি সাধারণীকরণ করে কথা বলি। আজাকের বাংলাদেশে আমাদের দুই নেত্রীর কেউ যখনই কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেন কিংবা ভুলভাল মন্তব্য করেন তখনই শোনা যায়–“এইজন্যই বলে মেয়েমানুষের বুদ্ধি!” আচ্ছা, আমার একটি বিনীত জিজ্ঞাসা আছে। জেনারেল এরশাদ কোন ভুল করলে তখন তার পুরুষ পরিচয়টা উঠে আসে না কেন? তখন তো দিব্যি ধরে নিই যে, উনি মানুষটাই এমন!
আসলে বুদ্ধি বা বোকামিতে কোন জাতেরই একচেটিয়া অধিকার নেই। এই সহজ সত্যিটুকু বোঝার সময় কি এই একবিংশ শতাব্দীতেও আসে নি!

চুলকানিনামা

আমার চুলকানি হয়েছে। গায়ে এবং মনে- দুইখানেই। বাসায় চুলকাই নিশ্চিন্তে, নির্ভাবনায়- কোন এটিকেট না মেনেই। অফিসেও প্রায় তাই। আমার রুমের দুই সহকর্মী ঢাকার বাইরে। তাই নিশ্চিন্তে চুলকে যাচ্ছি। এক সহকর্মী সাহস দিয়ে বলে গেলেন- চুলকানিকে গায়ে মাখতে নেই। ক’দিন পর নিজেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নাহ্! চুলকে চুলকে চামড়া উঠে যাবার জোগাড়! আমার মা-বাবা আমার আচরণে কোন মনুষ্যত্বের লক্ষণ দেখেন না, তাদের মতে আমি একটি বিশুদ্ধ বাঁদর। কিন্তু হায়! আজ চুলকাতে গিয়ে বুঝলাম- আমার গায়ের চামড়াটা মানুষের।

কাঁহাতক আর চুলকানো যায়! অফিসের মেইন উইন্ডোতে কোন পর্দা নেই। এক হাফপ্যান্ট পরা ভদ্রলোক তার বারান্দায় সিগারেট ফুঁকতে আসেন। তিনি নিশ্চয়ই ভাবছেন- দিনে সাড়ে আট ঘন্টা আমি নিজের হাত-পা চুলকে বেতন নিই। কাঁচের সামনে চেয়ার দিয়ে ভদ্রলোকের দৃষ্টি ঢেকে দিলাম। তখনি দেখলাম- অন্য বারান্দার একটা ছোট্ট মেয়ে আর তাদের কাজের মেয়েটা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। কাজের মেয়েটা হয়তো ছোট্ট মেয়েটাকে বলবে- “আফামনি, দেখছনি তামশা! ল্যাহাপড়া করতে চাও না! দেহ! ল্যাহাপড়া শেখনের কত ফায়দা! খাওজাইয়াই বেতন পাওয়া যায়!” নাহ। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ! আমার কারণে একটি ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।

গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের হাসপাতালটি আমার ধারণক্ষমতার অনেক উপরে ছিল।কিন্তু সময় মিলিয়ে আর কোন অপশন ছিল না। বেছে বেছে মহিলা ডাক্তারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলাম। উনি স্কিন স্পেশালিস্ট হলেও উনার ঈশ্বরপ্রদত্ত স্কিনটি দেখার সৌভাগ্য আমার হল না। পুরোটাই মেকাপচর্চিত। উনি  আমাকে ময়েশ্চারাইজারই প্রেসক্রাইব করলেন চার রকম। প্রত্যেকটার গায়ে লেবেল এঁটে দিলেন-“ দিনে দুবার করে লাগাবে। আমি চাকরি করি শুনে বলে দিলেন- “অফিসে বসে বসে সারা গায়ে মেখে নেবে। ” ইয়ে মানে, অফিসে বসে বসে সারা গায়ে! যাহোক, উনি অনেক পাস দেওয়া ডাক্তার! উনাকে প্রশ্ন করা আমার মানায় না।

বিশ্বস্তভাবে উনার প্রেসক্রিপশনের প্রতিটি কথা মানতে গিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম, আমার শরীরে জায়গা বড় অপ্রতুল। ১২০০ টাকা মূল্যের বডি ওয়াশ দিয়ে বডিকে ধুয়ে মুছে সেই বডিতে ১৪০০ টাকা মূল্যের একটা লোশন লাগানোর পরে বাকিরা ঠিক এঁটে উঠতে পারছে না। বাকিদের লাগানোর আগেই শরীরটা কেমন ফ্যাঁচফেচে হয়ে উঠছে। তবু, এটাকে আমার শরীরের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা বলেই ধরে নিলাম। উনার সাথে আমার সাক্ষাতের দ্বিতীয় দিনে বেরোবার মুখে কলিগের সাথে দেখা! কলিগ আমাকে দেখে আঁতকে উঠে বললেন, “আপা, মুখটা এত তেলতেলে কেন? মুখটা ধুয়ে যান।” আমি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললাম, “চোখটাকে একটু জাতে ওঠান, মিয়া। জানেন, এই মুখে অন্তত ৬হাজার টাকার প্রোডাক্ট লাগানো আছে! তাও তো দুইটা লাগাই নি!” আমার সহকর্মী চুপসে গেলেন।

প্রথম দর্শনেই সেই চিকিৎসক ১৬,৬৩৬ টাকা বিল করেছেন (তার দেখা পাওয়ার আগেই অবশ্য দর্শনী এবং রেজিস্ট্রেশন বাবদ আমার আরও ১৪৫০ টাকা খসেছে)। আজ রিপোর্ট হাতে পেয়ে যে কী করবেন, বিধাতাই জানেন!

উনার প্রতীক্ষায় বসে থাকতে থাকতে চারদিকে চোখ বুলালাম- চারপাশে চকচকে সব রোগি। সবার চোখেই কেমন সরু আর তেরছা দৃষ্টি। টাকা বা স্ট্যাটাস থাকলে সোজাসুজি তাকাতে নেই। সবাই যেন একটা থিম সং গাইছে-  “শেইক মি বেবে! আই অ্যাম এ মানি ট্রি।”

আমার ডাক পড়ল। টেস্টের রিপোর্ট খুবই ভাল। উনি মিষ্টি করে হেসে ওষুধ রিভিউ করাতে লাগলেন। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, যোগ করতে লাগলেন। হঠাৎই তার খেয়াল হল- উনি আগের দিন আমাকে কোন ফেইস ওয়াশ দেন নি। তড়িঘড়ি অ্যসিসটান্ট ডক্টরকে ধমকে উঠলেন, “ আই কান্ট বিলিভ যে তুমি ফেইসের জন্য  কিছু লেখ নি!” এতটা সেই অ্যাসিসট্যান্টও নিতে পারলেন না। বললেন, “ম্যাম, উনার ফেইসে তো কিছু হয় নি। ” উনি বললেন, “তো কী হয়েছে? না হলেও দিতে হবে। যে প্রোডাক্ট আমি বডির জন্য দেব, সেটা ফেইসের জন্যও দিতে হবে। পেশেন্টের সমস্যা না থাকলেও দিতে হবে।” অ্যাসিস্ট্যান্ট ছেলেটি এখনো গলা কাটতে ততটা সিদ্ধহস্ত হয়নি বোঝা গেল।

যাহোক, এই শেষ লাইনটি দিয়ে উনি আমার চক্ষুদান করলেন। আমি হাসিমুখে চেম্বার থেকে বেরিয়ে প্রেসক্রিপশনে চোখ বুলিয়ে দেখলাম- অ্যালার্জির ওষুধ মাত্র দুটি। একটির মূল্য ৪০ টাকা। আরেকটির মূল্য ৭০ টাকা। বাকি সব প্রসাধনী। উনার দৌলতে আগামী তিনমাস আমাকে কোনরকম প্রসাধনী কিনতে হবে না।

আমার হঠাৎই মনে পড়ল- একটা লোশনের ক্যান এখনো আনওপেনড (যেটা কীনা অফিসে বসে আমার সারা গায়ে মাখার কথা)। ওটা আমার ব্যাগেই ছিল। ফার্মেসীতে গিয়ে ফিরিয়ে দিয়ে এলাম। ওই একটা লোশন ফেরত দিয়ে কত টাকা পেলাম, জানেন? ৪৬০০ টাকা।

মোরাল অব দ্য স্টোরি: ডান হাত চুলকালে টাকা আসে। বাম হাত চুলকালে যায়। আর সর্বাঙ্গ চুলকালে মতিভ্রম হয়। তারপর… তারপর…পকেটটা পাতলা হয়ে যায় আর মনটা ভারি হয়ে যায়। আর তারপর মনে হয়, বাংলা প্রবাদবাক্যগুলো রিভিউ করা দরকার। বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, আর ডাক্তার ছুঁলে ???

ম্যাজিক ডায়েরি

১৪ নভেম্বর, ২০১২
বিভু এ জগতের কেউ না। কিন্তু ওর বিশ্লেষণী ক্ষমতা আর অনুভূতি দেখে অনেক সময় মনে হয় যেন ও-ও আমাদেরই মত রক্ত মাংসের মানুষ। ওকে কিছু বলা লাগে না, এমনিতেই বুঝে যায়। আজ সকাল বেলায় যখন ডাইনিং টেবিলে বসে ওর বানানো কফি খাচ্ছিলাম, তখন ও অদ্ভূত একটা কথা বলে উঠল।
“ ঋতু, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আপনি কষ্টটা পুষে রেখে আনন্দ পাচ্ছেন, তাই কি?” কফির মগটা নামিয়ে রেখে বিভু জিজ্ঞেস করল। ওর চোখে মুখে মনোবিজ্ঞানীদের মত সবজান্তা ভাব।
“একদম বাজে কথা বলবেন না। কষ্ট পুষে রাখব কোন দুঃখে? আমি কি কবি না ভিক্ষুক যে কষ্ট বেচে খাব?” ওর কথা শুনে এত বিরক্ত লাগল যে একটু রুক্ষ না হয়ে পারলাম না।
“ মারাত্মক মেটাফর দিলেন তো! তবে এত সরাসরি কথা শুনলে কবিরা কিন্তু চরম খেপবে। ” বলেই হা হা করে হা হা করে হাসতে থাকে বিভু।
ওর হাসির শব্দটা কেমন যেন অন্যরকম। শুনলেই মনটা ভাল হয়ে যায়।
“দুরো মিয়া! বিন্দুমাত্র সেন্স অব হিউমার থাকলে এই কথা শুনে কেউ খেপবে না। আর সত্যিকারের কবি হলে তো খেপবেই না। যাহোক, কাজের কথায় আসি, আপনার কেন মনে হল যে আমি কষ্টটা পুষে রাখতে চাচ্ছি?”
“শুধু আপনি না, এটা অনেকের ক্ষেত্রেই সত্যি। মানুষের জীবনে যখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে তখন সে সেটা অস্বীকার করতে চায়। তার মনপ্রাণ সব তখন একসাথে বলে ওঠে, না এটা হতে পারে না। এটা হল কষ্টের মুহুর্তে মানুষের প্রথম রি-অ্যাকশন।”
“দ্বিতীয় রি-অ্যাকশনটা কী?”
“রাগ। যে দুঃখ দিয়েছে তার প্রতি রাগ হয়, যদি সরাসরি কাউকে দায়ী করার না থাকে তাহলে সৃষ্টিকর্তার উপর রাগ হয়। মানুষ মনের ঝাল মিটিয়ে বেচারা বিধাতার গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকে।”
মুখে প্রকাশ না করলেও ভিতরে ভিতরে ভালই বুঝছিলাম, প্রত্যেকটা কথা অক্ষরে অক্ষরে আমার সাথে মিলে যাচ্ছে।
গলায় যথাসাধ্য নিরাসক্তির ভাব ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তাই নাকি, তারপর কী হয়?”
“তারপরই সবচেয়ে কঠিন মুহুর্তটা আসে। মানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহুর্ত। কেউ কেউ দু:খটাকে ভুলে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং ভুলে থাকার বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিও বের করে ফেলে। কিন্তু কারো কারো জেদ চেপে যায়। দিনে রাতে, কাজে অকাজে, সারক্ষণ ওই স্মৃতিটাকে নিয়েই নাড়াচাড়া করতে থাকে। এতে করে একরকম বেদনামধুর অনুভূতি হয়। মশা কামড়ালে সেই জায়গায় চাপ দিলে যেরকম হয়, অনেকটা সেইরকম। ব্যাথা ব্যাথা লাগে, তারপরও চাপ দিতে ভাল লাগে।”
খুব হাসি পেয়ে গেল আমার। “আপনি তো কোনদিন মশার কামড় খান নি। তাহলে এত কিছু বোঝেন কী করে? আপনাদের জগতে কি মশা আছে?”
“আপনার বাসায় যখনি আসি তখনি তো মশার কামড় খাই! আপনি তো কয়েল জ্বালান না।”
“হুম, কয়েলে আমার চোখ জ্বলে, কিন্তু আপনার কি ধারণা যে আমিও ওই বেদনামধুর অনুভূতিটা পাওয়ার জন্য জেদ করে এই দুর্ঘটনাটা মনে রেখেছি?”
“না, আপনার ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। আপনি ভুলতে চান, আবার চান না। সেটা আরেকদিন বুঝিয়ে বলব, কারণ এখন তো আপনি অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হবেন।”
“দূর ছাতা, একেবারে মেগা সিরিয়ালের মত সাসপেন্স! ভাল্লাগে না!”
বিভু একটু মুচকি হেসে বের হয়ে গেল।

১৫ নভেম্বর, ২০১২
কয়েক বছর ধরে এই অ্যাড ফার্মটায় কপিরাইটারের কাজ করছি। খুব ঝামেলার কাজ। তার ওপর আজ সারাদিন আবার কাজের চাপ খুব বেশি ছিল। অফিসে আর একটু হলেই ডেডলাইন মিস হয়ে যেত। এখানকার এত চাপ সামলানোর পর বাসায় গিয়ে নিজের কাজগুলো নিয়ে আর বসা হয় না। কোন বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করি না। সবাইকে বলি, সময়ের অভাব। কিন্তু আমি জানি, আমার সমস্ত সময়টা ইদানীং কাটছে শুধু ওই তিক্ত মুহুর্তগুলো ভুলে থাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টায়। সমস্ত উদ্যম হারিয়ে ফেলেছি। ইদানীং বিভু চেষ্টা করছে আমাকে একটু জাগিয়ে তোলার। দেখি আজকে বাসায় গিয়েই আমার ল্যাংগুয়েজ স্কুলের অ্যাডভান্সড লেসনগুলো বানিয়ে ফেলতে হবে। এই স্কুলটা বানাব বিদেশীদের জন্য- ওদেরকে বাংলা শেখানোর জন্য। কিন্তু অন্য স্কুলগুলোর মত এখানে খালি ভাষা শিখিয়েই আমি দায়িত্ব শেষ করব না। আমি চাই ওরা যেন আমার দেশের কৃষ্টি- কালচার, শিল্প-সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ সেটাও বুঝতে পারে। অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখছি কয়দিন। বিভু এসেই স্বপ্নটা আরো বেশি করে জাগিয়ে দিল।
তবু কাজের ফাঁকে ফাঁকে পুরনো ক্ষতটা কেমন টনটন করে ওঠে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও মনটা জাবর কেটে চলে। আজকে আবার বিভুর কালকের সেই কথাটা থেকে থেকে মনে পড়ে যাচ্ছে। আমি নাকি জেদের বশে এই ঘটনাটা ভুলতে চাচ্ছি না!
বিভু আসলে ওর সাথে একটু বসা যেত। ও অবশ্য আমার অফিসে কখনো আসে না। তবে কয়েকটা ল্যাংগুয়েজ লেসন নিয়ে ওর আমার সাথে বসার কথা ছিল। দেখি বাসায় আসে কীনা।
এই কয় মাসে বিভুর সাথে আমার অন্যরকম একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেছে। অনেকটা অতিপ্রাকৃত বন্ধুত্ব। ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হওয়ার বর্ণনা শুনলে যে কারোর গা ছমছম করে উঠবে। খানিকটা ভুতুড়ে ব্যাপার।
সেদিন বাড়িতে বসে আমার অনেক বছরের পুরনো ডায়েরীটা নাড়াচাড়া করছিলাম। হঠাৎ করেই দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে কেমন যেন চিনচিনে একটা ব্যাথা হতে লাগল। আমি দুই চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কিন্তু জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি ভেবে জোর করে চোখ খুলতেই দেখি একটা ছেলে আমার সামনের চেয়ারটায় বসে আছে।
আমি ভেবে পেলাম না, ছেলেটা কোন দিক দিয়ে এখানে ঢুকল। কাজের মেয়ে চলে যাওয়ার পর আমি নিজে হাতে দরজাটা লাগিয়েছি। ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল, “খুব ভয় লাগছে? কফি বানিয়ে দেব? মাথাটা ছেড়ে যাবে তাহলে।”
”আপনি কে? কোন দিক দিয়ে ঢুকলেন?”
“সত্যি উত্তরটা দিলে আপনি এখন নিতে পারবেন না। ওটা পরে বলব।”
ঠিক সেই সময়ে দরজায় টোকা পড়ল।
“আপনার স্বামী এসেছেন বোধহয়। ভয় নেই, দরজা খুলে দেন। উনি আমাকে দেখতে পাবেন না কারণ তার মনের বেটা বা গামা- কোন লেভেলেই আমার কোন অস্তিত্ব নেই।”
বিভু ঠিকই বলেছিল। ও একদম দরজার সামনে বসে থাকা সত্ত্বেও রাতুল সত্যিই সেদিন ওকে দেখতে পায় নি। অন্য যে কোন দিনের মতই বিরক্ত মুখে রাতুল বেডরুমে ঢুকে পড়ল।
আমারও তখন বিভুর দিকে মনোযোগ দেওয়ার মত সময় ছিল না। তখন আমার রুটিন ওয়ার্ক করার সময়। কারণ সারাদিনের অফিসের সমস্ত বিরক্তি রাতুল এখন আমার উপর তুলবে। যে কোন কথা জিজ্ঞেস করতে গেলে এখন খেঁকিয়ে উঠবে। আমাকে তাই যথারীতি মুখ বুজে ওকে খাইয়ে দিতে হবে। তারপর ওর পাশে চুপচাপ বসে প্রসঙ্গ খুঁজে খুঁজে কথা বলতে হবে। কথা না বলে চলে গেলে ও আরো রেগে যাবে। আর তারপর আমার কথা চালিয়ে যাওয়ার একটার পর একটা প্রচেস্টা ব্যর্থ করে দিয়ে হঠাৎ করে আমাকে জড়িয়ে ধরবে। তখন কিছুক্ষণের জন্য ওর স্ত্রী ছাড়া আমার আর অন্য কোন পরিচয় থাকে না। আমি ওই মুহুর্তটাতেও ওকে খুঁজে পেতে চেস্টা করি। দুজনের শরীরের এত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের পরও ওকে আমার ভীষণ দূরের মনে হয়। তবু ওর ভিতরের শিশুটা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ত তখন ওর দিকে তাকিয়ে আমার ভেতর কেমন যেন একটা মাতৃস্নেহ জেগে উঠত। মনে হত, ওর ভিতরের অবুঝ শিশুটা আমার বুকের মধ্যে মুখ রেখে সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে থাকতে চাচ্ছে। সমস্ত নিষ্ঠুর বাস্তব থেকে সরে থাকার জন্য আমিই বোধহয় ওর শেষ আশ্রয়।
সে রাতে রাতুলকে ঘুম পাড়িয়ে বের হওয়ার পর বিভুকে আর দেখতে পাই নি।

১৭ নভেম্বর, ২০১২
বাসায় এসে থেকে বিভুর জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু বিভু তো এল না। বেশ রাগ লাগছে।
ডায়েরিটা হাতে তুলে নিলাম। দুই ভ্রুর মাঝখানে আবারো ব্যাথা করে উঠল। কিন্তু চোখ খুলে ওকে দেখতে পেলাম না। কিন্তু এরকম তো ও করে না। যেদিন আসার কথা থাকে, সেদিন তো ও চলে আসে।
ও আচ্ছা! ও তো বলেনি যে আজ আসবে। তবু বারবার বিভুকে ডেকে আনার ব্যর্থ চেষ্টা চালাতে গিযে মাথাটা কেমন ফেটে যেতে চাচ্ছে!
অর্ধচেতন অবস্থায় বিভুর দ্বিতীয় দিনের আসার স্মৃতিটা মনে পড়ল। ততদিনে এক আইনজীবি বন্ধুর মারফত জেনেছি, রাতুল নাকি আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমি কদিন ধরে খুব কেঁদেছিলাম। কেমন যেন অস্থির লাগছিল। ওকে ভোলার জন্য তাড়াতাড়ি করে টিন এজ বয়সের একটা পুরনো ডায়েরি শেলফ থেকে বের করে নিয়েছিলাম। ঠিক তখনি বিভু হাজির।
চুপ করে আমার মুখোমুখি কিছুক্ষণ বসে থাকল।
“কী হয়েছে?” এমনভাবে জিজ্ঞেস করল যেন উত্তরটা আগে থেকেই জানে।
“বন্ধ দরজা ভেদ করে ঢুকে পড়তে পারেন আর কী হয়েছে সেটা বুঝতে পারেন না?”
“পারি তো। কিন্তু আমি তো জানার জন্য জিজ্ঞেস করি নি। বললে আপনারই মন হালকা হবে।।
“হবে না। আমি খুব কমপ্লিকেটেড চরিত্রের মেয়ে। কারো কাছে মনের কথা বললে আমার নিজেকে কেমন ছোট লাগতে থাকে। তার চাইতে আপনি বলেন তো, আপনি কোথায় থেকে এরকম মাটি ফুঁড়ে উদয় হন?”
“হুম, তাহলে তো বিরাট লেকচার দিতে হয়। শোনার ধৈর্য আছে?”
“বলেন, শুনি।”
“আপনার অবশ্য বুঝতে বেশি কষ্ট হবে না। কারণ আপনার তো প্লেটোর আইডিয়াল ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে পড়া আছে। ব্যাপারটা অনেকটা সেই রকম। আপনাদের এই পৃথিবীর বাইরেও আর একটা পৃথিবী আছে। বিশ্বাস করতে অনেকটা কষ্ট হবে কিন্তু একটু মন দিয়ে ভাবলেই বুঝতে পারবেন। আপনাদের এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ কল্পনাপ্রবণ। শিশুরা সবচাইতে বেশি। দেখবেন, ওরা একা একা কথা বলে, বাসার সোফাটাকে অনায়াসে গাড়ি কল্পনা করে সেটা নিয়ে খেলতে শুরু করে। ওদের ছোট্ট বারান্দাটাকে একটা জঙ্গল ভেবে বিভিন্ন রকম অভিযানে বের হয়। ওর সাথে থাকা বিভিন্ন খেলনা হাতি, ঘোড়া, আর পুতুলগুলো হয়ে যায় ওর কল্পনার বিভিন্ন চরিত্র। কেউ রাক্ষস, কেউ রাজকন্যা। ্ওর এইসব কার্যকলাপ বড়দের চোখে হাস্যকর, কিন্তু ওর কাছে ওটা একটা অন্য লেভেলের রিয়ালিটি।
এই পর্যন্ত বলতেই আমি ওকে থামিয়ে দিলাম। “কিন্তু এর সাথে আপনার সম্পর্ক কী? আপনি কি বলতে চান, আপনি প্লেটোর আইডিয়াল ওয়ার্ল্ড থেকে এসেছেন?”
“না, অল্টারনেটিভ রিয়ালিটি থেকে এসেছি। এই পৃথিবীতে মানুষ অনেক কিছু কল্পনা করে। তার অজান্তেই এই কল্পনাগুলো অল্টারনেটিভ রিয়ালিটিতে কপি হয়ে যায়। আপনি সারাজীবন ধরে আমার মত একজন বন্ধু পেতে চেয়েছেন। কিন্তু আপনার মন বা বয়স কোনটাই তখন আমাকে গ্রহণ করার জন্য তৈরি ছিল না। আর যখনই আপনি আপনার পুরানো ডায়েরিটা ধরেন, আপনার মনের অজান্তেই আপনার মনের মধ্যে একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়। মনে হয়, ডায়েরিতে যার কথা লিখেছিলাম, সে যদি সত্যি সত্যি থাকত!— ”
“আর তাই আপনি আজ সত্যি সত্যি হাজির হয়ে গেলেন, তাই তো? কিন্তু এর আগেও তো আমি বহুবার ভেবেছি আপনার কথা। তখন কেন আসেন নি?”
“ঘা না খেলে মন পরিণত হয় না। আর আজকে চোখটা বন্ধ করে আপনি আপনার ‘ভেনা আমোরিস’-টা ডায়েরির ঠিক মাঝখানে রেখেছিলেন।”
“ভেনা আমোরিস আবার কী জিনিস?”
“আমাদের বাম হাতের অনামিকা আঙুল থেকে সরাসরি একটা ভেইন চলে গেছে হৃদপি- পর্যন্ত। রোমানরা এটাকে ভেনা আমোরিস বলে ডাকত। এই কারণেই বিয়ের আঙটি সবাই এই আঙুলে পরে। অবশ্য কারণটা না জেনেই পরে। তাই আজ ওই আঙুলটা ডায়েরির মাঝখানে-মানে আপনার টিনএজ বয়সের সেই ইমোশনগুলোকে ভেনা আমোরিস দিয়ে ছোাঁয়ার সাথে সাথে আপনার মনের আলফা লেভেলে সিগন্যাল চলে গেল। কারণ, প্রথমত, আপনার মন আজ আপনার সহ্যশক্তির সর্বোচ্চ সীমায় পেঁছে গিয়েছিল, দ্বিতীয়ত, ভেনা আমোরিস দিয়ে ডায়েরিটা ছুঁয়ে দিলেন। ব্যস সিগন্যাল অল্টারনেটিভ রিয়্যালিটিতে পৌঁছে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আমিও হাজির।”
আমি অবাক হয়ে সেদিন ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নিজের কল্পনাকে এত কাছে , চোখের সামনে দেখব কখনো ভাবি নি। এই জন্যেই কি ওর এরকম অদ্ভূত আবির্ভাব দেখেও আমার ভয় লাগে নি? আমার অবচেতন মন ওকে দেখে চিনতে পেরেছিল?

১৮ নভেম্বর, ২০১২
আজ বিভু এসেছে। আমার বাসার একটা ঘর এখন ওর হয়ে গেছে। যখনি আসে, ওই ঘরটায় থাকে। আমি বসে বসে ল্যাংগুয়েজ লেসনগুলো ঘষামাজা করছিলাম। ও পাশে বসে বসে দেখছিল, এটা ওটা মন্তব্য করছিল। ও পাশে না থাকলে কাজটা শেষ করতে পারতাম না। কখনো পরামর্শ দিয়ে, কখনো নিজেই একটা লেসন প্ল্যান করে আমার পুরো কাজটাকে ও-ই প্রায় শেষের পথে এনে দিয়েছে। তার বদলে অবশ্য ওকে খাওয়াতে হবে। ও আগেই বলে রেখেছে। আমাদের জগতে এলেই নাকি ওর ক্ষুধা লাগে।
সেই খাবারটাও আবার আমাকে নিজে হাতে বানাতে হবে। সেটাও আবার নতুন কিছু হতে হবে। কী আর করা! ওর আবদার মেটানোর জন্য বেশ কয়েকটা রান্নার বই কিনেছি। ছুটির দিনে ওইগুলো প্র্যাকটিস করতেই করতেই সময় কেটে যায়। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়। ও কি সত্যই খাওয়ার জন্য এইরকম অদ্ভূত বায়না ধরেছে নাকি আমাকে ব্যস্ত রাখার একটা কৌশল এটা?
“প্রশ্নের উত্তরটা পেলেন?” হঠাৎই জিজ্ঞেস করে উঠল বিভু।
“কোন প্রশ্ন, ভুলতে চাওয়া না চাওয়া? কিন্তু সেটার উত্তর তো আপনি দেবেন বলেছিলেন।”
“না, আমি আপনাকে ভাবাতে চাচ্ছিলাম। একটু ঠা-া মাথায় না ভাবলে আপনার নিজের কাছে সব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হবে না।”
“আমি জানি আমি কী চাই।”
“তো, সেটা আমার সাথে শেয়ার করেন। আচ্ছা, ঠিক আছে, আগে বলেন, রাতুলকে কি আপনি আবার ফিরে পেতে চান?”
“অসম্ভব! সেটা কেন চা’ব? যে একবার আমাকে ছেড়ে অন্য কারোর কাছে যেতে পারে তাকে ফিরে চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি আসার আগে ওর জীবনে যাই হয়ে থাক, আমি ওর জীবনে থাকা অবস্থায় যদি কেউ ঢুকে পড়ে তাহলে সে ছেলেকে বিশ্বাস করা কোনভাবেই সম্ভব না।”
“সে-ও ফিরে আসছে না, আপনিও আর তাকে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন না। ব্যস, মিটে গেল। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?”
“ সমস্যাটা ওর হিপোক্রেসি নিয়ে। শেষ যেবার আমাদের ঝগড়া হল তখনই মাসখানেক পর থেকে আমার সিক্সথ সেন্স আমাকে বলছিল যে ওর জীবনে অন্য কেউ এসেছে। কেন জানি আমি বুঝতে পেরেছিলাম। ওর কোন বন্ধুর সাথে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। ওর কোন রকম আপডেট পাওয়ারও কোন সুযোগ ছিল না। তবু কেন জানি মনে হয়েছিল যে, ওর জীবনে কেউ এসেছে। তবু চুপচাপ ওর জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, যদি সত্যি সত্যি ওর সাথে আমার সম্পর্কটা টেকার হয়, তাহলে ও একবারের জন্যেও ফিরে আসবে। একটা ফোন করবে।”
“ সে তো ফোন করেছিল এবার। করে নি?”
“হ্যাঁ করেছিল। ফোন করে কী বলেছিল জানেন? বলেছিল, ‘ তোমার বন্ধুত্বটা আমি এখনো খুব মিস করি। আমরা চাইলে এখনো বন্ধু থাকতে পারি। এভাবে একা একা থেকো না। তুমি যদি চাও, আমি তোমার জন্য কাউকে খুঁজে দিতে পারি।’ সাথে সাথে আমার ওকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছিল, ‘ ও, তাহলে তোমার নিজের কাজটা জায়েজ হয়, তাই তো?’ কিন্তু ও হজম করতে পারবে না বলে বলিনি। এর পরেও কয়েকবার আমি ওকে ফোন করেছি, ও আমাকে ফোন করেছে। কিন্তু প্রতিবারই ওকে খুব দূরের মানুষ বলে মনে হত। মনে মনে বুঝতাম, ও এখন অন্য কারোর হয়ে গেছে। তাই আমাকে এড়িয়ে চলতে চায়। হয়তো নতুন মানুষটার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য।”
“ এই ব্যাপারে সরাসরি ওকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি?”
“সরাসরি জিজ্ঞেস করার আগেই আমি সবকিছু জেনে গিয়েছিলাম। এমনকি মেয়েটার নাম পর্যন্ত জানতাম। একটা ইরানী মেয়ে। এই দেশের একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরও আমি চাইতাম, ও আমাকে সরাসরি বলুক। তাই অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, ‘তোমার কি নতুন গার্লফ্রে- হয়েছে?’ ও প্রশ্নটা শুনলেই কেমন যেন হয়ে যেত। অপ্রস্তুত ভাবটা ঢাকার জন্য কখনো হাসত, কখনো বলত, ‘সেটা জেনে কি লাভ হবে তোমার?’ আমি যদি আর একটু জোরাজুরি করতাম তখন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকত, তারপর বলত, ‘না, হয়নি।’ এই মিথ্যেটা আমাকে এখনো খুব কষ্ট দেয়। এরকম একটা মিথ্যাবাদী, কাপুরুষকে এতদিন ভালবেসেছি, এর পিছনে এতটা সময় নষ্ট করেছি মনে হলে নিজের প্রতি খুব বিরক্ত লাগে।”
“মিথ্যা বলার কারণটা কি এখন ধরতে পারেন?”
“ হয়তো ওর নতুন রিলেশনশিপটা তখনো প্রপোজালের সীমা ডিঙ্গিয়ে অফিসিয়ালি কনফার্মড হয় নি। সেই জন্য আগে থেকে বলতে চায় নি। কিন্তু মনে মনে ও যে মেয়েটার প্রতি সর্ম্পূণ ডেডিকেটেড হয়ে গেছে সেটা ওর হাবে ভাবেই বোঝা যেত। কিন্তু ওর নতুন আকর্ষণের কথা আমার কাছে স্বীকার করার সাহসটুকু ওর হয় নি। কিন্তু আমি এটুুকু সৎ সাহস ওর কাছ থেকে আশা করেছিলাম। যদি সত্যি সত্যিই ও আমাকে একফোঁটা চিনে থাকত, তাহলে কথাটা আমার কাছে স্বীকার করত। এইটুকু রেসপেক্ট আমাকে দিত। শেষ যে দিন দেখা হল সেদিনও বলল, আমিই নাকি ওর বেষ্ট ফ্রেণ্ড। ও আমাকে বন্ধু হিসেবে সারাজীবন মনে রাখবে। আমি যদি এভাবে ভেঙ্গে না পড়তাম, তাহলে নাকি ও এখনো আমার সাথে বন্ধুত্ব রাখত। কতখানি হাস্যকর কথা একবার ভেবে দেখেছেন?”
বিভু হা হা করে হেসে উঠল। “ব্যাপারটা কেমন হল আমি বলি। হাইজ্যাকার সব কিছু কেড়ে নিয়ে যদি বলে, ‘কিপ ইন টাচ।’- এই কথা শুনলে যেমন লাগবে আপনারও ঠিক তেমন লেগেছে।”
আমারও হাসি এসে গেল। বিভু এই জগতের মেটাফরগুলো এত মোক্ষম জায়গায় ব্যবহার করে যে, না হেসে পারা যায় না।
“আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় যে আপনার প্রতি ওর এখনো কোন আকর্ষণ আছে?”
“আরে না! আগেও আমার প্রতি ওর খুব একটা আকর্ষণ ছিল না। কিন্তু ও একা থাকতে পারত না। সেই সময় অন্য কোন মেয়ে বন্ধু ওকে এত সময় দিচ্ছিল না। আমি তখন নতুন ছিলাম ওর কাছে। আমার কাছে ওর আগের রিলেশনশিপটা নিয়ে ইচ্ছেমত কাঁদুনি গাইতে পারত। অন্য কারোর তো এত ধৈর্য ছিল না ওইসব প্যাঁচাল শোনার। কিন্তু আমি শুনতাম। ওর একাকীত্ব আমাকে খুব ছুঁযে যেত। ভাবতাম, ও-ও আমার মত শুদ্ধতাবাদী, আর দশজন ছেলের মত বহুগামী নয়। ওর প্রথম প্রেমের খুঁটিনাটি বর্ণনা আমাকে শোনাত, ওর ওই ইমোশনগুলো আমার কাছে খুব পবিত্র মনে হত। কিন্তু ও আসলে আমাকে আমার কাছে ওর সমস্ত দু:খ কষ্টের কথা বলতে পারত, তাই, নি:সঙ্গতা কমানোর একটা হাতিয়ার হিসেবে এতদিন আমাকে ব্যবহার করে গেছে। সেইজন্য, প্রতিবার ঝগড়ার পর শুধু আমিই ওর কাছে ফিরে গেছি। ও কিন্তু একবারের জন্যও ফিরে আসে নি। এতেই তো স্পষ্ট যে, আমি ওর জীবনে জাস্ট একটা অপশন ছিলাম, কোন ডেসপারেট নিড ছিলাম না। আর এবার ঝগড়ার পর যেই পছন্দসই একটা মেয়েকে পেয়ে গেল, ওমনি আমাকে দূরে সরিয়ে দিল।
“তাহলে আপনি ওকে আপনার জীবনে এতখানি জায়গা দিতে গেলেন কেন?”
“ওর যখন মন ভাল থাকত, তখন ও আমাকে খুব ভালবাসত। খুব ইমোশনাল হয়ে যেত। একবার জ্বরের ঘোরে আমাকে খুব কাকুতি-মিনতি করে বলেছিল, ‘কখনো যদি আমি খুব অভিমান করে থাকি, তবু তুমি যেন আমাকে ভুল বুঝ না, আমাকে আবার ফিরিয়ে নিও, আমার কাছে ফিরে এস।’ আমি সেদিন ওকে কথা দিয়েছিলাম। আর তাই শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছি ওকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ আমার মনে হত, পৃথিবীতে একটা অন্তত এমন মানুষ আছে যার জীবনে আমি অপরিহার্য, ইররেপ্লেসিবল। কিন্তু যেই বুঝতে পারলাম যে, আমি যে কোন মুহুর্তে যে কারোর দ্বারা রিপ্লেসড হয়ে যেতে পারি, সেই মুহুর্ত থেকে মোহটা ভেঙ্গে গেল।”
গলার কাছে কেমন যেন একটা বিশ্রী দলা পাকাতে লাগল। ভয় হল, বিভুর সামনেই কেঁদে ফেলব না তো? কান্না আড়াল করার জন্য বিভুর দিক থেকে একটু ঘুরে বসলাম। ভান করলাম যেন ওপাশে প্রিণ্ট করে রাখা লেসনগুলো চেক করার জন্য এবার আমাকে বাধ্য হয়ে ঘুরে বসতে হয়েছে।
“একটা প্রশ্ন করি, খুব ভেবে উত্তর দেবেন। কোনটা ভেবে বেশি কষ্ট হয়? ওকে আর পাবেন না বলে নাকি ওর জীবনে নতুন কেউ এসেছে বলে?”
“দুটোর কোনটাই না। একটা সম্পর্ককে যে পুরনো জামাকাপড়ের মত বদলে ফেলতে পারে, তাকে পেতে চাওয়ার কোন মানে হয় না। আর, ওর নতুন রিলেশনশিপ হওয়াতে আমি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছি। আমি নিজেও চাচ্ছিলাম, এটা হোক। কারণ রিলেশনশিপ না হলে, শত তিক্ততার পরেও এখনো আমার ভেতরে ওর জন্য একরকম দায়বদ্ধতা কাজ করত। মনে হত, ও হয়ত ঠিকমত খায় নি। হয়তো আবার জ্বর এসেছে। ওর খুব ঘন ঘন জ্বর আসত। একা একা আছে, দেখাশোনা করার জন্য কেউ আছে কীনা- এরকম হাজারটা টেনশন ভিড় করত। এখন ওই দায়টা থেকে আমি মুক্ত।”
“ওর বাড়িতে কেউ নেই?”
“ওর বাবা-মা চিটাগাংয়ে থাকে। ও আর ওর ছোট ভাই ঢাকায় থাকে।”
“বিয়ের পর আপনারা কোথায় ছিলেন?”
“কখনো কখনো আমার সাথে আমার বাসায় থাকত। মাঝে মাঝে ওর ভাইয়ের কাছে গিয়ে থেকে আসত।”
“আপনাদের বিয়ের কথা কে কে জানত?”
“দুজনের কেউ-ই মা-বাবাকে বলি নি। আসলে আমি চেয়েছিলাম দুজনেই ঠিকমত নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তারপর বিয়েটা করব। কিন্তু ও কিছুদিন এমন অসুস্থ হয়ে যেতে লাগল যে ওর দেখাশোনা করার জন্যই হুট করে বিয়েটা করে ফেললাম। কিন্তু মা-বাবার কানে যাতে না যায় সেজন্য আমি আমার কোন বন্ধুর কাছেও একথা বলি নি। কেন যে কাউকে বলি নি সেটা কিন্তু ও-ও জানত। আর ওর সাথে পরিচয় হওয়ার পরে অন্য সব বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলাম। ও ছাড়া আমার আর কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে সময় ছিল না। কিন্তু এখন ও আমার নামে কী বলে জানেন? আমি নাকি ওর পরিচয় দিতে লজ্জা পেতাম বলে কারোর কাছে ওর কথা বলি নি! এতদিনে এ-ই চিনেছে ও আমাকে?”
কান্না আর সামলাতে পারলাম না। বাঁধ ভেঙে সব কষ্ট যেন বের হয়ে আসতে লাগল। গলা আটকে গেল। কথা বলার জন্য মুখটা যে-ই খুলতে যাচ্ছি, গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। ভাগ্যিস, তা-ও মুখটা একদিকে ফেরানো। বিভু আমাকে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে না।
ওপাশে বসে বসেই বিভু এবার একটা টিস্যু বাড়িয়ে দিল। বুঝলাম, মুখ ফিরিয়েও কোন কাজ হয় নি। মুখ ঢাকলেও, কণ্ঠস্বর তো আর ঢেকে রাখতে পারছি না।
“আমি বুঝতাম যে ও আমার সাথে একেবারেই সুখী ছিল না। সব ছেলের কল্পনায় একটা নরম নরম, কোমল কোমল গার্লফ্রেন্ডের প্রত্যাশা থাকে। আমি তো সেরকম না। আমার সাজগোজের কোন সেন্স নেই। রুক্ষ, পুরুষালি ধরণের একটা মেয়ে। আমাকে নিয়ে যদি কোন বন্ধুর কাছে গার্লফ্রে- হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়, তাহলে তারা আড়ালে হাসবে। আমার আরো একটা সমস্যা ছিল, আমি নতুন মানুষের সাথে মন খুলে কথা বলতে পারি না। ওর সাথে যত বকবক করে কথা বলতাম, ওর বন্ধুদের সাথে পারতাম না। অনেক মানুষের মধ্যে গেলে নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগত। এটা নিয়ে ওর মনে মনে একটু আফসোস ছিল। আমি বুঝতে পারতাম। ওকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি এই কথা। কিন্তু ও সে কথা স্বীকার করত না। বলত, তুমি যেরকম, সেরকমই থাকো। আমি তোমাকে তোমার মত করে ভালবাসি। সেসব যে কত বড় মিথ্যা সেটা এখন বুঝি।”
বিভু আবার একটা টিস্যু এগিয়ে দিল।
জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, যার সাথে রিলেশন হয়েছে তার উপর কি আপনার রাগ হয়?”
“নাহ, তার উপর কেন রাগ হতে যাবে? সে বেচারীর তো এখানে কিছু করার নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ও মেয়েটার কাছে সব কিছু চেপে গেছে। এমনকি যদি মেয়েটা জেনেও থাকে, তবু আমি মেয়েটার কোন দোষ দেব না। কারণ সম্পর্কটা আমার রাতুলের সাথে, মেয়েটার সাথে না। রাতুলই যদি বিশ্বস্ত না থাকে, তাহলে মেয়েটার কি গরজ আমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার?”
“হমম্, একটা কথা স্পষ্ট যে, দুজনের কেউই সুখী ছিলেন না। তাই হয়তো ছেলেটা চলে গেছে। সুখী হওয়ার অধিকার তো সবারই আছে, তাই না?”
“খুবই খোঁড়া যুক্তি। পৃথিবীর সমস্ত বহুগামী, অস্থিরচিত্ত মানুষ এই যুক্তিটাই দেখাবে। সুখে থাকার অধিকার তো আমারও ছিল। কই, আমি তো ওকে ছেড়ে সুখের পিছনে ছুটি নি? আমার সামনেরও তো অনেক অপশন ছিল! তবু, আমি তো ধৈর্য ধরে ওর জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছিলাম? ভেবেছিলাম, ওর অফিসের চাপটা কমলে ও ফিরে আসবে, তখন আমরা আমাদের সমস্যাগুলো নিয়ে বসব। সবচেয়ে রুচিহীন ছিল ওর শেষ কথাটা। ও বলেছে, ‘আমি নাকি অনেক দেরি করে ফেলেছি ওর কাছে ফিরে আসতে।’ তার মানে ফিরে আসার ঠেকা শুধু আমার। ওর কোন দায়িত্ব নেই সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার। আচ্ছা, বিভু, আমাদের মা-বাবার সবকিছু কি আমাদের ভাল লাগে? তারপরও কি সেসব মেনে নিয়ে আমরা তাদের সাথে থাকছি না? সন্তানের সব কিছুই কি মা-বাবার ভাল লাগে? কই, মা-বাবা তো সুখে থাকার জন্য সন্তানকে ত্যাগ করে না? আপনি হয়তো বলবেন যে, ওগুলোর সাথে প্রেমের তুলনা চলে না। কিন্তু ও যে আমাকে বারবার করে শুধু বলত, আমি নাকি ওর জীবনে সবচেয়ে বেশি দামী। আমাকে ও সবকিছুর চাইতে বেশি ভালবাসে? এই সব কথা তাহলে মিথ্যা ছিল? শুধুমাত্র প্রেম জমানোর জন্য ও এতগুলো মিথ্যা কথা আমাকে বলে গেছে? আমার একটাই দুঃখ, বিভু, যদি ছেড়েই যাবে, আগে কেন যায় নি? আমার সমস্ত দোষ তো ও আগে থেকেই জানত। কেন আমার জীবনের এতগুলো বছর নষ্ট করে দিল? আমি তো ওর কোন ক্ষতি–”
আর কথা বলতে পারলাম না। কথা বলার সমস্ত শক্তি নি:শেষ হয়ে গেছে। নিজেকে উজাড় করে দিয়ে কাঁদতে থাকলাম। বিভু আবার আরেকটা টিস্যু এগিয়ে দিল। কেমন অসহ্য লাগল এবার ব্যাপারটা। ও তো বুঝতেই পারছে, আমি কাঁদছি। শুধু রোবটের মত তখন থেকে একটা করে প্রশ্ন করে যাচ্ছে আর টিস্যু দিয়ে যাচ্ছে। ওর কি আর কিচ্ছু করার নেই? অল্টারনেটিভ ওয়ার্ল্ডের মানুষগুলোর কি অনুভ’তি বলে কিচ্ছু নেই?
মুখ ফিরিয়ে বিভুর দিকে তাকালাম। দেখলাম, ওর কোলের উপর ব্যবহৃত টিস্যুর একরাশ স্তুপ। বুঝলাম, আমার টিস্যুবক্স এতক্ষণ দু’জোড়া চোখকে সার্ভিস দিয়ে গেছে।
মুখ নিচু করে বসে থাকলাম। হাতের টিস্যুটা ফেলে দিলাম। সমস্ত লজ্জা-দ্বিধা-ভয় ভুলে মনটা উজাড় করে কাঁদতে লাগলাম।

২৫ নভেম্বর, ২০১২
আজকাল আর বিভুকে বেশি ডাকতে হয় না। ডায়েরিটা পাশে থাকলেই ও অনেক সময় নিজে থেকেই আসে। সেদিন জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ এরকম পরিবর্তনের কারণ কী। আগে তো প্ল্যানচেট করে আত্মা নামানোর মত করে ওকে ডাকতে হত। এখন হঠাৎ এত উন্নতি কী কারণে।
ও শুনে হাসল। বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয়, আপনি হয়তো ব্যস্ত আছেন। তাই, ডাকার সময় পাচ্ছেন না। কিন্তু আমি থাকলে আপনার ভাল লাগবে। তাই, যখন তখন চলে আসি।”
বিভুর এই ব্যাপারটা খুব মজার। এ জগতের কোন ছেলে হলে বোধহয় এত সহজে এই উত্তরটা দিত না। হয় একটু রেগে যেত, নাহয় আমাকে আর একটু খেলাত। কিন্তু ও সরলভাবে ওর মনের কথাটা বলে দেয়। তাই, চোখ বন্ধ করে ওর কথার উপর আমি ভরসা করতে পারি।
আজকে রাত বারোটার সময় হঠাৎ আমার কানের কাছে ডি. এল. রায়ের “আজি এসেছি এসেছি বঁধু হে” গানটা বাজিয়ে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। ঘুম ভাঙতেই বলল, “শুভ জন্মদিন!”
জন্মদিনের কথা আমার মনে ছিল। তাই, ইচ্ছে করেই মোবাইল বন্ধ করে ঘুমিয়েছিলাম। মোবাইল খোলা থাকলেই বন্ধুদের ফোন আসত। আর আমি না ঘুমিয়ে কিছ্ক্ষুণ পর পর চমকে চমকে ফোনের স্ক্রীণের দিকে তাকাতাম। সারক্ষণ মনে হত থাকত, বোধহয়, ও ফোন করেছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি ভাল করেই জানি যে, ও কোনভাবেই ফোন করবে না, এমনকি হয়তো ভুলেই গেছে দিনটার কথা।
কিন্তু বিভু মনে রেখেছে। ওর কার্যকলাপ দেখে বোঝা গেল যে, অনেকদিন ধরে ও দিনটা পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে। গান বাজতে থাকল আর ও আমার হাতে একটা গিফ্ট ধরিয়ে দিল। উপনিষদ আর রুমির একটা বই কিনে এনেছে আমার জন্য। বলল, আপনার লাইব্রেরিতে এ দুটো নেই দেখে নিয়ে আসলাম। আরো একটা কী যেন ছিল। প্যাকেটে মোড়ানো। আমি খুলতে গেলাম। ও খুলতে দিল না। বলল, “পরে খুলবেন। এখনো সময় হয় নি।”
আমি আর জোর করলাম না। বই দুটো উল্টে প্রকাশনীর নাম দেখে বললাম, “এটা তো আর অল্টারনেটিভ ওয়ার্ল্ড থেকে আমদানি করা হয় নি। এ জগতের দোকান থেকেই কেনা হয়েছে। টাকা পেলেন কোথায়?”
“আপনার আলমারি থেকে নিয়েছি। আপনাকে বলে নিলে তো আর সারপ্রাইজটা থাকত না। তাই…”
খুব হাসি লাগল। আমার আগে কেউ কোন চোরের উপর এত কৃতজ্ঞ হয়েছে কীনা আমি জানি না। কোন একজনকে বিশেষ সম্মান দিতে গিয়ে আমার নিজের বিশেষত্বটা এতদিন ভুলেই গিয়েছিলাম। আনন্দে চোখে পানি এসে গেল।
বিভু আবার একটা টিস্যু এগিয়ে দিল। আজকে হঠাৎ অনুভব করলাম, বিভু আমাকে কখনো ছোঁয় না। আজ যদি টিস্যু না দিয়ে আঙ্গুল দিয়ে আমার চোখের পানিটা মুছে দিত, আমি বেশি খুশি হতাম। কিন্তু ও তা করল না। অল্টারনেটিভ ওয়ার্ল্ড থেকে এসেছে বলেই কি ওদের মধ্যে স্পর্শের কোন অনুভূতি কাজ করে না? নাকি ইচ্ছেটাকে ও দমন করে রাখে?
“ঋতু, আজ আপনার জন্মদিন। আমি চাই, আপনি আজকের দিনে আপনার অতীতের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হন। আপনি যেটাকে বিচ্ছেদ ভাবছেন সেটা আসলে কোন বিচ্ছেদ না, কোন লস না, সেটা আসলে আপনার মুক্তি, আপনার সৌভাগ্য। মুক্তিটাকে সেলিব্রেট করতে শেখেন।”
আজকে আর আগের দিনের মত অসহায় লাগল না। শান্ত মনে ওর কথা শুনছিলাম। বললাম, “সেটা হয়তো আস্তে আস্তে মেনে নিতে পারব, কিন্তু ও শেষ দিনে অনেক উল্টা পাল্টা যুক্তি দেখিয়েছে। আমার নামে অনেক মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে। ও বলে, আমি নাকি ওকে নিয়ে বন্ধুদের কাছে লজ্জা পেতাম, সম্পর্কটা আমিও নাকি ভাঙতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন শুধুমাত্র জেদের বশে ওকে ফেরত চাচ্ছি। আমরা নাকি ভীষণ অসুখী ছিলাম। অথচ, বিভু, আপনি জানেন কতশত সুখের স্মৃতি আমাদের আছে। বন্ধু হিসেবেও আমরা অনেক ভাল সময় কাটিয়েছি। স্বামী-স্ত্রী হিসেবেও দুজন দুজনকে সাপোর্ট দেওয়ার মত অনেক স্মৃতি আমাদের আছে। কিন্তু সেগুলো ও একটুও স্বীকার করছে না।”
“কেন স্বীকার করবে, ঋতু? স্বীকার করলে তো তার এই সিদ্ধান্তটার কোন ভিত্তিই সে দাঁড় করাতে পারবে না।”
“তবুও বিভু, যার সাথে এতগুলো বছর কাটিয়েছি তার মুখ থেকে মিথ্যে অপবাদ শুনতে খুব কষ্ট হয়। ও বলে, আমি নাকি সারক্ষণ বসের মত আচরণ করেছি ওর সাথে। ও নাকি অনেক চেষ্টা করেছে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভু, যে ছেলেটা কোনদিন আমার কাছে ফিরে আসে নি, সে এরকম অপবাদ কীভাবে দেয়? আমি সারাক্ষণ যার রাগের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম, সে কীভাবে আমাকে বস অপবাদ দেয়?”
“ঋতু, শোনেন। ভাড়াটে খুনীও নিজের অপরাধের পেছনে হাজারটা যুক্তি দাঁড় করাতে পারবে। তাই বলে সেই খুন জায়েজ হয়ে যায় না। ঐ ছেলেটাও এখন তাই করছে। কিন্তু এসব ভেবে আপনার কী লাভ, বলেন তো? সে আপনার সম্পর্কে কি বলল, কী ভাবল- তাতে কি সত্যিই আর কিছু আসে যায়?”
“না।”
“তাহলে? ও যদি আপনাকে ছেড়ে না যেত, আপনি কোনদিন ওকে ছেড়ে যেতে পারতেন না। অথচ আপনাদের ভুল বোঝাবুঝিটাও কোনদিন মিটত না। কারণ যে আপনাকে তিন বছরে বোঝেনি, আপনার মূল্যায়ণ করতে পারে নি, সে সারা জীবনেও পারত না।”
“তাহলে এখন কী করতে বলেন? ওকে ক্ষমা করে দেব?”
“ভুলেও সে চেষ্টা করবেন না। কাওকে ক্ষমা করতে যাওয়া মানে নিজেকে তার চাইতে শ্রেষ্ঠ ভাবা। আপনি তাকে ক্ষমা করার কে? সে আপনার সাথে সুখী হয় নি, তাই অন্যখানে থেকে সুখ খুঁজে নিচ্ছে। তাকে সুখী করার দায়িত্ব এখন আর আপনার না। এখন সেটা ওই মেয়েটার দায়িত্ব। অতএব, আপনি ওকে সিম্পলি নিজের মন থেকে বের করে দেন। সব রকম দায় থেকে রাতুল আপনাকে মুক্ত করে দিয়ে গেছে। চেষ্টা করুন, ওর কাছে কৃতজ্ঞ থাকার।”
চুপ করে থাকলাম। আজকে কথাগুলো মেনে নিতে কোন কষ্ট হল না। রাতুলকে এই মুহুর্তে পেলে সত্যি সত্যি একটা থ্যাংকস দিতাম।

২৬ নভেম্বর, ২০১২
গত দুইমাস মান্থলি চেকআপের জন্য আমি একাই এসেছি। আজ বিভু কিছুতেই আমাকে একা ছাড়ল না। ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। আমার সামনের সারিতেই খুবই সুন্দরী একটা মেয়ে বসে আছে। শুধু সুন্দরী বললে ভুল হবে, চোখেমুখে একটা অন্যরকম আবেদন আছে। আশেপাশে রোগীর সাথে আসা যেসব ছেলেরা অপেক্ষাকৃত কম দু:শ্চিন্তাগ্রস্ত, তারা বারবার মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে। তাদের চোখেমুখে আগ্রহের ছাপ স্পষ্ট। মেয়েরাও না তাকিয়ে থাকতে পারছে না। তাদের দৃষ্টিতেও সমান আগ্রহ, তবে সেটা খানিকটা ঈর্ষামিশ্রিত।
ব্যতিক্রম একমাত্র বিভু। খুবই মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে। ওকে একটু জ্বালাতে খুব ইচ্ছে হল।
জিজ্ঞেস করলাম, “এ জগতে আসলে তো আমাদের মতই আপনাকেও মশা কামড়ায়, আপনারও ক্ষুধা লাগে। তাহলে এ ব্যাপারে এরকম সাধু সন্ত সেজে থাকার মানে কী?”
“কোন ব্যাপার? বুঝলাম না।”
“পুরো হল মেয়েটাকে হাঁ করে দেখছে। একমাত্র আপনি ছাড়া।”
“ও, এই ব্যাপার! পেট ভরা থাকলে আর অন্য কোন খাবারের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। তা সে যতই লোভনীয় হোক!”
মুখে বললাম, “খুব্ব্ই স্থুল ছিল উপমাটা!” কিন্তু বুকের ভিতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ও কী বলতে চায়?
“সত্যি কথা সোজাসাপটা হওয়াই ভাল। বেশি সূক্ষœ হওয়ার দরকার কী?”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। এখনো জানি না, আমার ভিতরে যে বেড়ে উঠছে সে ছেলে না মেয়ে। আমার সিরিয়াল আসতে এখনো দেরি আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের চারপাশে তাকালাম।
হঠাৎই দেখলাম, কাঁচের দরজার ও পাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে আগে কোথায় যেন দেখেছি বলে মনে হল। তার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটার ঘাড় এতক্ষণ ওপাশে ফেরানো ছিল, ছেলেটা এ পাশে মুখ ফেরাতেই বুঝলাম- ওটা রাতুলের ছোট ভাই মৃদুল। মেয়েটাকেও এবার চিনলাম। রাতুলের নতুন গার্লফ্রে-। সেই ইরানী মেয়ে। ফেসবুকে দেখেছিলাম। মেয়েটা আসলেই ভীষণ স্নিগ্ধ। মাথায় ঘিয়ে রঙ্রে একটা স্কার্ফ জড়ানো। গায়ে শর্ট বোরখা। কাঁধের ব্যাগটা বোধহয় দেশালের। মৃদুলের সাথে আরো কয়েকজন ছেলে আছে। কয়েকজনকে আমি চিনি। রাতুলের বন্ধু। দেখে মনে হল, সবাই-ই মেয়েটার পরিচিত। হ্যাঁ, রাতুলের জীবনের জন্যে এই মেয়ে সত্যিই ভীষণ মানানসই। কিন্তু ওরা সবাই দল বেঁধে হাসপাতালে কেন? রাতুলের কিছু হয় নি তো?
বিভুকে বলাতে ও রিসেপশন থেকে খোঁজ এনে দিল। রাতুলের ডেঙ্গু হয়েছে। এখানেই একটা কেবিনে ভর্তি আছে। এখন অবস্থা ভালোর দিকে। একবার ভাবলাম, আমার বোধহয় দেখে আসা উচিত। কিন্তু না, সেটা বোধহয় ঠিক হবে না। আমার যাওয়াটা রাতুল ভাল চোখে দেখবে না। যদি স্বাভাবিকভাবে কথা বলি, তাহলে ও ভাববে, নিজের শক্ত-পোক্ত ইমেজের বিজ্ঞাপন দিতে এসেছি। আবার বলা যায় না, ভেবে ফেলতে পারে যে, আমি এখনো ওর আশা ছাড়ি নি। না, সেটা ভাববে না, আমি নিশ্চিত। আমার শুদ্ধতার বাতিক ও জানে। নতুন রিলেশনশিপের পর ওকে আর কোনভাবেই গ্রহণ করা সম্ভব হবে না, এটা তো ওর চেয়ে ভাল করে কেউ জানে না।
যাহোক, মেয়েটাকে দেখে খুব নিশ্চিন্ত লাগল। রাতুলের পরিচিত বলয়ের মধ্যে ও যেভাবে মিশে গেছে, তাতে ওদের সম্পর্কটার মধ্যে অন্য কোন জটিলতা ঢোকার সুযোগ পাবে না। আমি সত্যিই মুক্ত। কোন মানবিকতার দায়ও আমার আর থাকল না। ভীষণ নির্ভার লাগল নিজেকে।
“চেকআপ করাবেন, নাকি আজ বাড়ি যাবেন?” বিভু জানতে চাইল।
“আজ থাক। ওরা কেউ দেখে ফেললে অহেতুক একটা জটিলতা তৈরি হবে। চলেন, চলে যাই।”
বিভু বাধা দিল না।

১২ ডিসেম্বর, ২০১২ (সন্ধ্যাবেলা)
বিভু আর কোনদিন আসবে না। সেটা অবশ্য আমারি ভুলের কারণে। ডায়েরিটা পাশে রেখে চুলাটা সেদিন ওভাবে জ্বালিয়ে রেখে যাওয়াটা ঠিক হয় নি। কিন্তু ঠিক কী করে যে জিনিসটা গিয়ে চুলার ঠিক মাঝখানে পড়ল, সেটা আমি এখনো ভেবে পাই না।
বিভুকে মিস করি, কিন্তু একাকীত্বের অসহায়ত্বটা এখন আর তেমন চেপে ধরে না। ও আমার পুরনো ‘আমি’টাকে জাগিয়ে দিয়ে গেছে। যে কোন কিছুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর মত মনের জোরটা এখন ফিরে পেয়েছি।
আমার কল্পনায় এখন দুটো স্রোত চলে। একটা আমার শরীরে বেড়ে ওঠা সত্তা, আর একটা হল কল্পনার সমস্ত রঙে রাঙানো বিভু। দুজনের কথা ভাবতে গেলেই আমার মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। এক্ষুনি দুজনকে একসাথে দেখতে ইচ্ছা করে। এক্স-রে করে যদি হার্টের ভেতরটা দেখা যেত, তাহলে নিশ্চয়ই দুজনকেই একসাথে দেখতে পেতাম।
টেবিলের উপরে অনেক জিনিসের স্তুপ হয়ে আছে। জিনিসগুলো গোছাতে শুরু করলাম। তখন র‌্যাপিং পেপারে মোড়া সেই গিফট-টা চোখে পড়ল। একটা সিডি। ড্রাইভে ঢোকাতেই বিভুর কণ্ঠস্বরে বেজে উঠল,
“বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই,
তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই।
সুদূর কোন নদীর ধারে,
গহন কোন বনের ধারে,
গভীর কোন অন্ধকারে,
হতেছ তুমি পার
পরাণসখা বন্ধু হে আমার।”

সামাজিকতার গ্যাঁড়াকলে

গ্রামে এসেছি। নানীবাড়িতে। এখন কিছুদিন কিছু সহজ উষ্ণতা মন ছুঁয়ে যাবে। শহুরে কোলাহল থেকে মুক্ত, আমা্র খুব প্রিয় কিছু মানুষের নিরাপদ সান্নিধ্যে আর প্রশ্রয়ে থাকতে পারব কটা দিন।

কিন্ত, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে।  ঈদের সময় ঘুরতে এলে অনেক সামাজিকতার প্যাড়া আছে। এর বাড়ি যাও। ওর বাড়ি যাও। যদি না যাও, তুমি অসামাজিক, দেমাগী, অমুকের মেয়ের মাটিতে পা পড়ে না। কী যে ভাবে নিজেকে! আরো কত কী!

দাঁতে দাঁতে চেপে সে পর্ব যদি কোনরকমে সারাও যায়, তার পরই আসে মহা এপিসোড। বাড়িতে বেড়াতে আসা লতায় পাতায় সম্পর্কিত আত্মীয়-পরিজনের সাথে কুশল বিনিময় এপিসোড। ‌আমার মায়ের বিশাল পরিবার। আমার একটা জন্ম চলে গেল শুধু কে কী হয়, তাই মনে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে করতে। এর সাথে বোনাস হিসেবে আছে সমগ্র এলাকাবাসী। আমার নানার চেয়ারম্যানির সুবাদে গোটা তল্লাট কোন না কোনভাবে আমাদের আত্মীয়। কখন যে কে কোনদিক দিয়ে কোন প্রশ্ন করে বসবে তার কোন ঠিক নেই। শুরুটা হতে পারে এরকম:

“আমাকে চিনতে পারছ নাকি গো?”

অত্যন্ত রিস্কি প্রশ্ন। ছোটবেলায় শার্লক হোমসগিরি করতে গিয়ে বহুবার ধরা খেতে হয়েছে। ছোটবেলায়, আমার সায়েন্স অব ডিডাকশনগুলো এরকম ছিল-আমার মায়ের জেলার সম্বোধনগুলো হবে নানা-নানী মামা-মামী, অথবা খালা-খালু। অন্য সম্বোধনগুলো সব আমার বাবার জেলার। তো, সায়েন্স অব ডিডাকশনের ফর্মূলা মেনে আমি নিয়ে ফেলি আমার দ্বিতীয় অনুসিদ্ধান্ত। যেহেতু ভদ্রলোকের চুল অনেকটাই কাঁচাপাকা, এবং তিনি আমার মায়ের চেয়ে বয়সে বেশ খানিকটা বড়, অতএব তিনি আমার মামাই হবেন। আমি মুখে যথাসাধ্য ভদ্রতা ফুটিয়ে বলি-মামা! ঠিক তখনি দশদিক প্রকম্পিত করে সবাই সমস্বরে বলে উঠতেন- “পাগলী কী বলে? উনি তোমার ভাইয়া !” বোঝ ঠ্যালা! এই মধ্যবয়সী লোকটি কিনা এক দশ বছরের বালিকার ভাইয়া হয়! বহুবার ঠেকা খেয়ে ইদানীং সৎ থাকার নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।এরকম প্রশ্নের উত্তরে তাই ঘাড়টা দ্বিধার সাথে দুই দিকে দুলিয়ে অস্ফুটে না বলি। একইসাথে মুখে ভদ্রগোছের একটা মহাদু:খপ্রকাশের ভঙ্গিও ফুটিয়ে রাখতে হয়। নইলে, আমার মাকে শুনতে হবে-তার মেয়ে কোন আদব জানে না।

অতিথি আমার মুখময় লেপ্টে থাকা ভদ্রতায় সন্তুষ্ট হয়েছেন কীনা বোঝার আগেই ধেয়ে আসে আরো প্রশ্নবাণ। কী করছ, কোথায় পড়ছ, পড়াশোনা কবে শেষ হল, ও তুমি তাহলে অমুকের সাথে একই ব্যাচ, তমুককে চেন কীনা? (যেন এক ব্যাচের বা জেলার হলেই সবাই সবাইকে চিনতে বাধ্য)  অমুকের ছেলে/মেয়ে তো খুবই ব্রিলিয়ান্ট। n সংখ্যক A+ বা ফার্স্ট ক্লাসে অলংকৃত। উনার পরিচিত সমস্ত ব্রিলিয়ান্টদের জীবনী মুখস্থ না করে কোন উপায় থাকে না তখন।

এরপরের অবশ্যাম্ভাবী প্রশ্নটা হল- কী করছ? আমার উত্তর শুনে তার দ্বিধাহীন মন্তব্য- “কিন্তু সরকারী চাকরি যে করতে হবে ভাইয়া। সরকারী চাকরির একটা আলাদা মর্যাদা। হ্যালোর দাম থাকতে হবে। এসব চাকরিতে বেতন যতই দিক, তোমার তো হ্যালোর দাম নাই। বিসিএসটা দিতেই হবে।”

আমি জানি, সরকারী চাকরির পক্ষে-বিপক্ষে কোনরকম তর্ক এনাদের সাথে করে লাভ নেই। এদের সামনে মার্ক জুকারবার্গকে এনে দাঁড় করিয়ে দিলে তাকেও এরা বিশ্বাস করিয়ে ছাড়বে যে, সে কোন সরকারী চাকরিতে জয়েন না করে নিজের জীবনটা নষ্ট করে ফেলল।

এর পরের প্রশ্নটা আরো মারাত্মক। সে প্রসঙ্গে না যাই। তবে, এই যুগে এসে আমাদের বোঝা উচিত, পৃখিবীর সব দেশে, সব ভাষায় ‘ব্যক্তিগত’ বলে একটা শব্দ আছে। বাংলা ভাষায়ও আছে । শব্দটা আমাদের পরিচিত। মানেটা কী জানা?

সবশেষে বলি, সামাজিকতা, তোমার ক্ষুরে সালাম!

 

 

The tale of the sower

All those dry faces with cold looks were ready to suck my inner strength. None of the motivational verses seemed to work. They are determined not to be influenced by any positive thoughts. They were so comfortable with their melancholic, mechanical atmosphere. All the verses on positive attitude seemed to be fruitless. I could sense an invisible solid wall between me and my audience.

This class is my least favorite one. Once in a month I visit this class just because I have to and it is a part of my job. I am being paid for it. I talk about values to these people. They listen to me just because hey are instructed by their authority.I can always sense the cold annoyance on their faces. They were just waiting for me to finish. One of them even reminded me about shortening the session. Such a tiring job!

What is the use of talking about values to these people? Suddenly, I saw a very eager face looking towards me the entire time. I never saw that face before. She was receiving each and every word of mine so eagerly. I immediately became energized. I talked more vibrantly. After the session, that girl shared her story with me. She shared that how these values session help her to confront the everyday injustice in a more bold way.

Her joyful eager eyes touched my heart. I needed that encouragement.  I remembered the famous sower parable. He explained how different soils received the same seed in different ways. Right before me was the good soil!

But the seed falling on good soil refers to someone who hears the word and understands it. This is the one who produces a crop, yielding a hundred, sixty or thirty times what was sown.”

Thank you, God! I love you!

Once upon a time the script failed….

Once upon a time, there was a scriptwriter who wanted to write the scripts for her own life. She designed the entire scene in her head and expected everyone to follow that.

Sometimes, she waited for her parents to follow her story line. She expected them to utter the dialogues from her script. Why not? They were carrying the same gene!

To her utter disappointment, she learnt that the generation gap could speak much louder than the dialogues of her script. Even louder than the gene!

She met her love and expected him to follow the script line by line. Why not? He was the most intimate friend after all!

To her greatest sorrow, she realized that gender gap could be much sharper than the knife. The lust in his eye overlooked her soul’s desire; it cut her heart in two!

She met herself. She expected herself to be the most faithful artist. Why not? She was the playwright after all. She will faithfully do her part.

Alas! She realised that narcissistic outlook could be much more confusing than smog. It would never let you know the thin line between reality and fantasy.

Then she moved her eyes to see the world. She looked at the lives around her. She recognized the best scriptwriter of all.

She understood that her life’s script was written by the Almighty.

Then she started living happily ever after with hope and joy- the inseparable partners of life.

Imaginary Reality

Sometimes I visualize many scenes in the middle of a dream. So many unknown characters. So many new stories. I hardly remember the whole story after being awake. Very interestingly, I have never been one of the characters in any of the scenes of those particular dreams. It’s not even connected to my personal life anyhow.

Still, it’s nothing like reverie or trance that Coleridge used to experience. That’s why I miss the opportunity of keeping record of the actions that keep occurring. Everything happens while I’m sleeping. The only option is to start writing after the very moment of being awake. Still, some scenes will definitely be deleted. The unity of the plot will be hampered. But, it would be fun to try it once instead of watching the play as an inactive audience while dreaming and sleeping at the same time. May be, I can add some thing to the extract of the story left  in my brain. It would be like showing a little unfaithfulness to the original story but that’s what we always do to most of our ideas and plans. We dream of becoming something and then end up being something else. We wish to have someone  who will understand us perfectly, will share same interest and the same level of intellectuality. However, in reality, we pass our life compromising everything with a “Would Have Been Mr./Mrs Perfect”. May be those unfulfillments  are the keys to creativity. What we can’t achieve finds expression in our works. For someone, the medium is word, for someone it is brush and colour. No matter what it is, it is all about that unfulfilled desire which forces us to create an alternative imaginary world.