Tilt Up আয়নাবাজি

একসময় সিনেমার স্ক্রিপ্ট আর বীজগণিতের অঙ্কে কোন তফাৎ ছিল না। চিরচেনা ফর্মুলা, কেবল সংখ্যা বা বর্ণ এদিক ওদিক হতে পারে। গল্পের বিষয়বস্তু ঠিক হওয়ার আগেই প্রযোজক, পরিচালক, আর চিত্রনাট্যকার বসে ঠিক করতেন, ৭টা গান, ৫টা ফাইটিং সিন, ২টা কিস সিন থাকবে , এর মধ্যে ৩টা গানের শুটিং ব্যাংককে হবে। ব্যস, এবার চিত্রনাট্যকারকে বলা হল- এই ফমুর্লায়একটা স্ক্রিপ্ট লিখে দিতে।
বিরক্ত হয়ে যদি ভারতীয় ছবি দেখতে গেলেন তো সেখানেও ফমু‍র্লা। কোন কোন ছবি দেখলেই বোঝা যায, গল্পকে ছাপিয়ে তথাকথিত ‘সাহসী’ দৃশ্য দেখানোই পরিচালকের মূল লক্ষ্য ছিল। কোন্ জিনিসটা গল্পের প্রয়োজনে এসেছে, আর কোনটার কারণে গল্প বানানো হয়েছে- সেটা বোঝার মত বোধবুদ্ধি কিন্ত দর্শকের আছে।
সেদিক দিয়ে #আয়নাবাজি বিরাট ব্যতিক্রম। সমস্ত ফর্মুলাকে উল্টেপাল্টে দিল। একেবারেই অন্যরকম গল্প।
শুরুতে খুব বেশি প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে বসি নি। বন্ধুরা একসাথে হ্যাংআউট করতে যাওযাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।
সাথে আমার বিদেশী সহকর্মীটা ছিল। ও বাংলাদেশকে ভালবাসে কিন্তু বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে এখনো ওর তেমন ধারণা গড়ে ওঠে নি। আমার খুব ইচ্ছে ছিল ভাল মানের একটা বাংলা ছবি ওকে দেখাব। সে দিক দিয়ে আয়নাবাজি একদম পারফেক্ট মনে হয়েছিল আমার কাছে। মেকিং যে ভাল হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু শেষ মেশ কী হল, জানেন?ছবি যখন শেষ, যখন নাম উঠতে থাকল, তখন কোন কোন বাঙালি উঠে যেতে থাকল কিন্তু আমার বিদেশী বন্ধু বসেই আছে। বললাম, যাবা না? ও হাঁ করে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর একটু থাকি।’ ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বাজছে- লাগ, ভেল্কি লাগ, আয়নাবাজির ভেল্কি লাগ। আমি বুঝলাম, ভেল্কি লেগে গেছে। অমিতাভ রেজার সৃষ্টির গৌরব তখন আমার বাঙালি বাংলাদেশী সত্তাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। ওই বিদেশী তখন আবিষ্ট আর আমি কৃতজ্ঞ অমিতাভের প্রতি।
অভিনযের কথা আর কী বলব? চঞ্চল চৌধুরী ভাল অভিনেতা জানতাম কিন্তু এমন অসহ্য সুন্দর একটা পার্ফরমেন্সের জন্য সত্যিই প্রস্তুত ছিলাম না। প্রতিটা ক্যারেক্টারে যখন চঞ্চলের রুপান্তর ঘটছিল তখন মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করলাম, একেকজনের ইডিওসিনক্রেসি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অত্যন্ত মুন্সীয়ানার পরিচয দিয়েছেন। অসংস্কৃত দুশ্চরিত্র প্রথম অপরাধী কথায় কথায় কুঁচকিতে হাত দেয়, দ্বিতীয়জন অপ্রকৃতিস্থের মত ঘাড় গুঁজে তাকিয়ে থাকে আর চিৎকার করে ইংরেজি ফুটায়। তৃতীয় জন তো ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। আত্মগত স্বরে কিছুক্ষণ পর পর রেটরিক কোয়েশ্চেনের মত করে লোকটা ‘হুম’ করে শব্দ করে। তার নিয়ন্ত্রণকামী মানসিকতা প্রকাশরে জন্য এর চেয়ে ভাল কোন বৈশিষ্ট্য কিছু কি হতে পারত? মনে হয় না।
আমার শহরটাকে এর আগে আমার কাছে কোন ছবিই এভাবে তুলে ধরে নি। হলিউডের ছবির তুষারপাত, ছবির মত সাজানো রাস্তাঘাট দেখতে খারাপ লাগে নি কখনো। কিন্তু মনের কোণে এই অনুভূতিটা থাকত যে, ওগুলো সব পরের বাড়ির চিত্র। আমার পারিপাশ্বি‍র্কতার সাথে ওসবের কোন মিল নেই। এমনকি ভারতীয় বাংলা ছবিতে ভাষা আর চেহারায় নিজেদের সাথে এত মিল থাকা সত্তেও কোনদিন নিজের চারপাশটাকে রিলেট করতে পারি নি। ওদের নায়ক নায়িকা কলকাতার যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, সেটা আমার অচেনা। কিন্তু আয়নাবাজির সেটিং দেখে কিছুক্ষণ পরপর আমার মুখ দিয়ে বের হয়েছে- আরে এটা আমার বাড়ির রাস্তা! আরে এটা অমুক সরণি, দেখেছিস ্ওই ফ্লাইওভারের কাছে গিয়ে শুটিং করছে! সবাইকে ছাপিয়ে বিদেশীটা আবার সবার আগে বলে উঠল, “শ্য্যামা, দেখ, ওল্ড ডাকা”।
আয়নাবাজির এই বিশাল জনপ্রিয়তার মূলে বোধহয় এটাই ছিল। আমরা অনেকদিন পরে একটা মুভি পেয়েছিলাম যেটা আমাদের। সেটিং আামাদের , অ্যাকসেন্ট আমাদের। তবু অভিনয় আর গল্পটা দেশ, কাল, ছাপিয়ে আবেদন তৈরি করতে সক্ষম।
রোমান্সের ক্ষেত্রে মাত্রাবোধ দেখিয়েছে এই ছবি। এটা আমার ভাল লাগার আরো একটা কারণ। বেশিরভাগ পরিচালক ‘সাহসী’ দৃশ্য দেখানোর অজুহাত খোঁজেন। কিন্তু ইনি তার ধারকাছ দিয়েও যান নি। আর তাই, আমি দুবার আয়নাবাজি দেখে ফেলেও তৃতীয়বারের মত আমার মা আর খালামণিদের নিয়ে মুভিটা দেখতে যাওয়ার কথা ভাবছি। কারণ আমার বিব্রত হওয়ার মত কোন কারণ পরিচালক ঘটান নি।
স্বপ্নের মত একটা রোমান্স দেখানো হয়েছে।নায়কের খ্যাতির প্রতি তেমন মোহ নেই। অভিনয় করার জন্য তার রক্ত খেলা করে। তাই সে বাস্তব জীবনে অভিনয় করে। নাটকে সিনেমায কোন চেষ্টা করে নি। নায়িকা ইংরেজি সাহিত্যে লেখাপড়া শেষ করে বাড়িতে বসে আছে সন্তুষ্টচিত্তে। সামাজিক প্রত্যাশার চাপটা যদি না নিতাম, তাহলে আমরা বেশিরভাগ মানুষই বোধহয় নায়িকার মত এরকম একটা শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন বেছে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তা হবার উপায় নাই। তাই পর্দায় কিছুক্ষণ স্বপ্নের মত জীবনটা দেখতে বড় ভাল লাগছিল। নায়িকা রোজ নৌকায় করে নায়ককে দেখতে আসবে। আ কাপ অব কাপুচিনোর বদলে রঙচায়ের জীবনের সৌন্দর্যটাকেই সে বেছে নিচ্ছে। খুব বেশি কিছু না জেনেও ভালবেসে ফেলার রোগটা টিনএজে থাকে। কিন্তু এখানে দুজন ম্যাচিউরড মানুষকে দেখানো হল যারা জীবনটাকে জেনেবুঝে উপভোগ করতে চাইছে।
বৃষ্টির শটগুলো ভাল্লাগছে। এক এক সময় একটা ার্থ প্রকাশ করেছে। কখনো কখনো অসহায়ত্ব, কখনো, ঘোর অন্ধকার জীবনে ঢোকার পূর্বমুহুর্ত আবার কখনো সবকিছু ধুয়ে যাওয়ার ব্যঞ্জনা।
Tilt Up আয়নাবাজি কেন বলছি? কারণ বছরখানেক আগে একবার বাসার গেট দিয়ে ঢোকার সময় অমিতাভ রেজাকে দেখেছিলাম। আমি গেট দিয়ে ঢুকছিলাম আর উনি বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তার মুখটা আমার মোটেই পরিচিত ছিল না। কিন্তু তার চেখের দৃষ্টিটা আমার বড় অদ্ভূত লেগেছিল। কেমন যেন মাথাটা নীচু করে রেখে চোখ উঁচিয়ে তাকানো। তার কিছু লাইভ ভিডিওতেও দেখলাম একই কাহিনী। দৃষ্টিটা দেখে মনে হয়, উনার চোখমুখ বলে উঠছে-Tilt Up! তার দৃষ্টিটা এমন অদ্ভূত বলেই বোধহয় তিনি জগতটাকে আমাদের চাইতে একটু অন্যভাবে দেখেন। আমাদের মত একরৈখিক দৃষ্টি না বলেই হয়ত এমন একটা মুভি বানানো তার পক্ষে সম্ভব হল।।
অবশ্য আমি এখনো ভেবে পাই না, ভদ্রলোক বাংলাদেশী মুসলমান নিয়ে এমন অদ্ভূত বয়ান কেন দিয়েছিলেন? ইচ্ছে করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন? যাতে মানুষ বিষয়টা কী তা বোঝার জন্য হল অবধি যায়?নাকি পুরো পরিবার একসাথে বসে মুভিটা দেখতে পারবে (যেটা ভারতীয় মুভির ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে না) এই বিষয়টা বোঝাতে গিয়ে এই কথাটা বলেছিলেন? কী জানি! বড়মাপের শিল্পীরা যে বড় মাপের ব্যবসায়ী হবেন না, এমন তো কোথাও লেখা নেই। তবে উনি ব্যবসা করুন আর যাই করুন, এরকম আরো মুভি বাংলাদেশে তৈরি হোক।

টেইক আ বাও, #অমিতাভরেজা। আপনার অজান্তেই আপনি বহু বাঙালি বাংলাদেশীর ব্যক্তিগত অানন্দ আর গৌরবের কারণ হয়েছেন। আপনাকে ধন্যবাদ।

এই শুনছ?

সাতসকালে একটা প্রেমপত্র লেখার অফার পেলাম। এক গুরুজন বুদ্ধিটা দিলেন। প্রাপকের নাম শুনে লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। কারণ সেই প্রাপককে আমি বহু বছর ধরে ভালবাসি। কিন্তু সময় করে কখনো তাকে বলা হয় নি।
যারা ইতমধ্যে ভ্রু কুঁচকেছেন তাদের বলছি- বিনা দ্বিধায় পড়তে পারেন। যে বয়সেরই হোন না কেন, যে সম্পর্কেরই হোন না কেন। আপনাদের লজ্জায় ফেলে দেবার মত কিছু আমি লিখি নি।
তুলে দিচ্ছি আমার জীবনে লেখা ভালবাসার প্রথম চিঠি।

” তোমার জন্য একটা সম্বোধন বের করতেই এত সময় লেগে যাচ্ছে! যে শব্দগুলো মাথায় আসছে, তার একটাও তোমার জন্য যথেষ্ট না। প্রিয়তম বলব? না, ওটা ভীষণ সেকেলে। বহু মানুষের যথেচ্ছ ব্যবহারে ওর আসল উষ্নতা কবেই চলে গেছে। ‘প্রিয়তম’ শব্দটার হাল অনেকটা জুড়িয়ে যাওয় চায়ের মত- দুধ, চিনি, চা- সবক’টা উপাদানই তাতে বিদ্যমান। কিন্তু উষ্নতার অনুপস্থিতির কারণে জিনিসটার কোন আবেদন আর নেই। তাই, সম্বোধন বরং থাক। ওটা বাদ দিয়েই শুরু হোক আমাদের কথা।
ভেবেছিলাম, তুমি আমার কাছে কী- সে কথা যদি বলতে শুরু করি, তাহলে হয়ত কথা ফুরোবে না। কিন্তু না, সেকথাও তো শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে। কারণ এমন একটা কথা আমার নেই যা তুমি জান না। এমন হলে কি চলে, বল? তাহলে কি কথা বলে সুখ আছে? কিন্তু বহুদিন ধরে তোমার সাথে সাথে াকতে থাকতে এও বুঝেছি, এই জানাটাই তোমার সাথে আমার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য, সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
পৃথিবীর আর সমস্ত সম্পর্কে অতি পরিচয়ের গ্লানি আছে, একঘেয়েমির আশঙ্কা আছে। দুজন দুজনকে বেশি করে জানলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার ভয় আছে। কিন্তু তুমি এত সৃষ্টিছাড়া, এত বিচিত্র যে সেসবের বালাই তোমার নেই। আমার প্রতিটি কোষ, প্রতিটি রক্তবিন্দু তোমার পরিচিত বলেই আমি এত বেশি করে তোমার। আমাকে এত বেশি জান বলেই আমার প্রতি বিরক্ত হবার কোন সম্ভাবনাই আর নেই। নিজেকে পুরোপুরি, জানার পরেও নিজের প্রতি টান মানুষের যায় না, ঠিক সেইভাবে আমাকে পুরোপুরি জেনেও তুমি সমান মনোযোগ দিয়ে আমাকে ভালবেসে যাচ্ছ।
আচ্ছা, আমি তোমাকে কীভাবে ভালবাসি? এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা তুমি। আমাকেও তো তুমিই সৃষ্টি করেছ। এত সৃষ্টির ভিড়েও তুমি আমার মত অযোগ্য সৃষ্টির সমস্ত খুঁটিনাটি লক্ষ্য রাখ। এত অবাধ্যতার পরেও তুমি আমার প্রার্থনার উত্তর দিয়েছ। আমাকে শুধরে দিচ্ছ। আমার যন্ত্রণার মুহুর্তগুলোতে আমার পরম আশ্রয় হবার জন্য ধন্যবাদ। আমি না বললেও প্রতিটা মুহুর্ত পাশে থাকবে জানি।
ইতি, তোমারই শ্যামা।

শুদ্ধতম অনুভূতি

পৃথিবীর শুদ্ধতম অনুভূতির নাম স্নেহ। ভালবাসার অন্য সমস্ত ফরম্যাটের সূচনাতে আদান- প্রদানের একটা বিষয় থাকে। কিন্তু স্নেহ জিনিসটা শুরুই হয় একটা লস প্রজেক্ট হিসাবে।
বিষয়টা আগে বুঝি নি। মা-বাবার একমাত্র সন্তান তো। পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলাম বহুদিন। ভালবাসা পাওয়াটা একটা স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কেউ ভালবাসলে প্রতিদানে আমিও তাকে ভালবাসতাম। আমি আগ বাড়িয়ে কাউকে ভালবাসিনি। দরকার পড়ে নি। কিন্তু হঠাৎই একদিন সব হিসাব এলোমেলো করে দিল একজন।
ছোট্ট একটা মানুষ। ১৮ ঘন্টা ঘুমিয়ে থাকে। কোলে নিতে গেলে কাপড়- চোপড় নোংরা করে দেয়। মাঝে মাঝে পিট পিট করে তাকায়। আমি যে ওর কে তা আলাদা করে জানেও না। কিন্তু আমি ওর অনেক কিছু জেনে গেছি। লাল জিনিস দেখলে ও সেইদিকে তাকিয়ে থাকে। ও যখন ভ্যা ভ্যা করে কাঁদে, তখন ওকে কোলে নিয়ে ঝাঁকালে ও হেসে ফেলে। ওর থুতনিটা ছিল একটা সুইচের মত। টিপ দিলেই হাসত। কিন্তু তবু ও লস প্রজেক্ট। ভালবাসার জবাবে ফিরতি ভালবাসা দিতে পারে না। মুখে কথাই যে ফোটে নি। তবু এই ছোট্ট মানুষটাকে ভালবেসেই চললাম।
ওর প্রতি আমায অব্যাখেয় ভালবাসার কারণে অন্য সমস্ত ভালবাসার ব্যাখ্া বুঝতে শুরু করলাম। মা-বাবা কী কারণে, কোন আনন্দে সন্তানকে ভালবসেন সেটা বুঝলাম। ওকে দশ মিনিট সামলাতে গিয়েই আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যেত। আর সৃিষ্টিকর্তা অামাদের মত নাদান সৃষ্টিকূলকে কীভাবে সহ্য করেন তা ভাবতেই আমার ঈশ্বর ভক্তি আরো বেড়ে গেল। ও আমার জীবনে না আসলে আমি জানতামই না ভালবাসা পাওয়ার চাইতে দেওয়াতেই বেশি আনন্দ। স্নেহ মানুষকে মানবিক করে , পরিশীলীত করে। আমাকে একটু হলেও মানবিক করে তোলার ক্রেডিটটা তার পাওনা।
আমার জীবনে প্রথম স্নেহের উৎসই হল সে-
প্রজ্ঞা পারমিতা। আমার ছোট বোন। প্রচণ্ড বুদ্ধিমতী। কিন্তু অসহ্য রকম দুষ্টু। আশ্চর্য রকম মিষ্টি। অাগামীকাল ওর জন্মদিন। ঈশ্বর ওর মঙ্গল করুন।
12472612_10209105669503138_8311510734798069850_n

বন্ধু দিবস ২০১৫

ক্লাস এইটের স্কলারশিপ পরীক্ষা। স্কলারশিপ পরীক্ষার জন্য সিলেক্টেড হওয়াটাও আমাদের মত ব্যাকবেঞ্চারের কাছে একটা সেইরকম খবর ছিল। বাংলাদেশ কখনো বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য চান্স পেলে যেমন অবস্থা হবে আমাদেরও ঠিক তেমন অবস্থা ছিল। স্কলারশিপ জেতার কোনরকম উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। রিল্যাক্সমুডে বসে বসে এক ঝাঁক ব্রিলিয়ান্টদের দিকে চেয়ে দেখছিলাম। আমরা দুই বন্ধু প্রায় পরপর বেঞ্চিতে বসেছি। মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে বসে আছে এক অতিমাত্রায় ভাল ছাত্রী। সেই সিরিয়াস ছাত্রীটি তার মনগড়া কোন কারণে আমাকে লেখাপড়ায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত (তার আর আমার সিরিয়াল খুব কাছাকাছি থাকত বলেই হয়ত।)। অথচ তার এতটা মনোযোগের যোগ্য আমি ছিলাম না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অদ্ভূত কোন খেয়ালে আমার চেহারাটা দেখে গোড়ার দিকেই কেউ কেউ আমাকে ভাল ছাত্রী বলে ধরে নেন। যাহোক, সেই মহামান্যা এক্সাম হলে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন- নিজে যদি স্কলারশিপ নাও পান তবু আমারটা যে করেই হোক আটকে দেবেন। সেদিন অঙ্ক পরীক্ষা। অঙ্কে আমার সাংঘাতিক ভীতি। যে কয়টা পারি করে চুপচাপ বসে থাকলাম। এদিকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের তো মন মানেনা। ও অঙ্কে ভীষণ ভাল। ও চাইছে এই শেষ পনের মিনিটে আমাকে হেল্প করতে। কিন্তু ঠিক যে অঙ্কটা আমার করা বাকি আছে, সেটা ও করে নি। ও সামনের সেই ব্রিলিয়ান্টকে কাকুতি মিনতি করতে লাগল- প্লীজ, আমাকে কিচ্ছু দেখাতে হবে না। আমি তোমাকে একটা বলে দেব। তার বদলে শ্যামাকে ওই অঙ্কের সূত্রটা একটু বলে দাও। আমি জানি, তুমি ওই অঙ্কটা করেছ।“ আমার বেঞ্চ থেকে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। মজার কথা হল, পরীক্ষার হলে দেখাদেখির প্রতিভা আমার শুন্য। মেয়েটি দেখাতে চাইলেও আমি দেখে উঠতে পারতাম না। মেয়েটি হাসিমুখে খাতা ঢেকে বসে থাকল। আমার বন্ধুটা অসহায় মুখে দুই বেঞ্চ দুরত্ব থেকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকল। পরীক্ষা শেষে বরাারের মতই দাঁত বের করতে করতে বের হয়ে এলাম। কিন্তু আমার বান্ধবীর চোখ জলে টলমল করছে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে জল আটকে রাখার। আমি ওই অঙ্কটা করতে পারি নি-এই দু:খ ও ভুলতে পারছে না। ওকে সেদিন কিছু বলি নি। মনে মনে ভাবলাম, “যদি ওই মেয়ের কাছে দেখতাম, সেটা হত আমার সারাজীবানের কলঙ্ক। আর ও দেখায় নি বলেই আমি তোকে চিনলাম। জানতে পারলাম, বন্ধুত্ব এত নি:স্বার্থ হতে পারে। ওই অসীম শত্রুভাবাপন্ন মেয়েটির কাছে আমি কৃতজ্ঞ।“
বলা বাহুল্য স্কলারশীপ পাই নি। কিন্তু তার বদলে গোটা স্কুলজীবনে যা পেয়েছি, তার তুলনা নেই। আমরা পাঁচ বাঁদর নিজেদের নাম দিয়েছিলাম-পঞ্চ পান্ডব। বিজ্ঞান ভবনের ছোট দুই সীটের ডেস্ক সেট- আপ আমাদের মনে ধরে নি। সমস্ত গার্ড আর বুজিদের নজর এড়িয়ে কলা ভবন থেকে পাঁচ জন বসার মত বেঞ্চি টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম বিজ্ঞান ভবনের দুই তলায়। বসব যখন, পাঁচজনই একসাথে বসব। কেউ এক টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়ে যা কিছু নোট, সাজেশন্স পেত- সব কিছু নিজ দায়িত্বে সে-ই পাঁচ কপি করে ফেলত। নোট নিয়ে অতি কাছের বন্ধুদের মধ্যেও অনেক কূটনামি দেখেছি। আমাদের মধ্যে সেটা ছিল না।
আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যাকে পেলাম তার মাথার সাথে আমার ওয়াইফাই কানেকশন ছিল। কোনকিছু মুখে বলা লাগত না। এমনিই বুঝে যেতাম। দুই বন্ধু সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে বসে বসে উল্টোপাল্টা গল্প করে যাচ্ছি। দুপুর সাড়ে বারটার বাসটা ধরার কথা। ১২.২৫ এর সময় দুজন একসাথে বলে উঠতাম। “ধুর, এখন এখান থেকে মলচত্বরে পৌছানো যাবে না। ১.২০ এর বাসে যাব।” মজার ব্যাপার হল, ১.১৫ বাজলেও এই একই রিয়ালাইজেশন হত। এরকম করতে করতে প্রথম দুই বছরে প্রায় প্রতিদিনই বাড়ি ফিরতাম ক্ষণিকার লাস্ট বাসটা ধরে। বন্ধুত্ব বোধহয় এমনই। ছোটবেলায় পড়ে আসা ‘সময়ের মূল্য” রচনাকে নিমেষে ভুলিয়ে দিতে পারে।
কোন কোন বছর, পঞ্চপান্ডবের কারো জন্মদিনে আমি যখন খুব ভাব নিয়ে ফোন করে “’হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ গানটা গেয়ে উইশ করি, তখন ওপাশ থেকে সে বলে ওঠে, “ ফালতু ভাব মারিস না। তা, এ বছর কে মনে করিয়ে দিল, ববি, তাশা, নাকি মৌলি?” আমার কোন খোঁড়া যুক্তি তখন কাজে আসে না। বন্ধুত্ব বোধহয় এমনই। ভুলোমনা বন্ধুর স্টুপিডিটি মেনে নিয়ে, তার উপর হম্বি-তম্বি করে আবার তাকে কাছে টেনে নেওয়া।
চাকরিজীবনে এসে যাদেরকে পেয়েছি, তারা আমার মত একটি টিউবলাইটকে কেন এবং কী কারণে এত সহ্য করে আমি জানি না। আমার প্রতিটি দুর্বলতা মেনে নিয়ে নিজের ঘাড়ে এক্সট্রা চাপ নিয়ে এরা কী আনন্দ পায় আমি বুঝি না। তাদের কেউ কেউ আবার দেশ কাল সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে বারবার মনে করিয়ে দেয়, “তুমি আমাকে সহ্য করতে না পারলেও কিছু করার নেই। যেখানেই থাকি, আমি তোমার জীবন থেকে সরছি না।” কেউ আবার মনে করিয়ে দেয়, ‘তোর ভালবাসাব ধার ধারি না। আমার কাজ আমি করে যাব।” কেউ আবার অসীম নির্ভরতার দৃষ্টিতে চেয়ে আমার মত অভাজনকেও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আমার জীবনের বেস্টফ্রেন্ডদের একজনকেও আমি সিলেক্ট করি নি। নিজে আগ বাড়িয়ে কারো সাথে বন্ধুত্ব করার প্রতিভা আমার নেই বললেই চলে। তবু এরা আমার বন্ধু হয়ে আছেন। মেনে নিতেই হয়, এরা ঈশ্বরের মনোনীত। আমার বন্ধুদের মত ধৈর্যশীল জীব খুব কমই হয়। আমার মত একগুঁয়ে, বদমেজাজী, অালসে, অমিশুকে, ভুলোমনা, অসামাজিক, ঘরকুনো প্রজাতির প্রাণীকে যারা দিনের পর দিন সহ্য করে চলেছেন, তারা নি:সন্দেহে ঈশ্বরের বিশেষ সৃষ্টি। আমার চোখে তারা ছোটখাট মহামনীষী।

(বন্ধু দিবস ২০১৫ উপলক্ষে লেখা)

(আগস্ট ২, ২০১৫)

শেক্সপীয়র এবং নারীবাদ প্রসঙ্গ– সুস্মিতা শ্যামা

শেক্সপীয়র নামটি এবং নারীবাদ মতবাদটি কোনভাবেই সমবয়স্ক নয়। তাই এদুটো শব্দ একসাথে দেখলে একটু বিভ্রান্তিকর মনে হতেই পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভাবের জন্ম ভাষার আগেই হয়। তাই ‘সুন্দর’-কে সুন্দর বলে ডাকতে শেখার আগেই সদ্যজাত শিশু তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা রাখে। ঠিক তেমনি করে, নারীবাদ মতবাদটি বিকশিত হওয়ার বহু আগেই, শেক্সপীয়রের বিভিন্ন লেখায় এর নিদর্শন দেখতে পাওয়া গেছে। তবে “অ্যাজ ইউ লাইক ইট”, “দি মাচের্ণ্ট অব ভেনিস” এবং “ম্যাকবেথ”-এ এই ইস্যুগুলোর উপর তুলনামূলক বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে “অ্যাজ ইউ লাইক ইট”-এর কথাই ধরা যাক। এখানে নায়িকা রোজালিণ্ডকে নায়ক অর‌ল্যাণ্ডো দেখেছে সৌন্দর্যের প্রতিভূ হিসেবে। যত কবিতা নায়ক লিখেছে, যত প্রশংসাই সে করেছে রোজালিণ্ডের, তাতে কোথাও নায়িকার বৌদ্ধিক সামর্থ নিয়ে একটা লাইনও লেখা হয় নি। কারণ ‘প্রেমিকা’ নামক এই রমণীয় জীবটির যে বুদ্ধি নামক কোন বস্তু থাকতে পারে তা বেচারা নায়ক তার ঘোর দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করে নি। তাই, প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার পরে, অর‌ল্যাণ্ডোর অভিব্যক্তি ছিল এরকম-“O poor Orlando! Thou art overthrown/Or Charles or something weaker masters thee” অর্থাৎ এতবড় কুস্তিগীর চার্লসকে হারিয়েও তার চেয়ে ঢের দুর্বল এক শক্তির কাছে তাকে হেরে যেতে হল, সেই দুঃখেই বেচারা কাতর। এখন পর্যন্ত সে শুধু রোজালিণ্ডের রূপটাই দেখেছে । তার মনের পরিচয় তখনো পায় নি বলেই সে তখনো জানে না, আরো কী কী হার তার কপালে অপেক্ষা করে আছে।
নাটকটি যাদের পড়া আছে, তাদের নিশ্চয়্ই এতক্ষণে মনে পড়ে গেছে যে, অরল্যাণ্ডোর কী দশা করেছিল পুরুষবেশী রোজালিণ্ড। মেয়ের পরিচয়ে বাইরে গেলে বিপদের আশঙ্কা। তাই, রোজালিণ্ড পুরুষের বেশে গ্যানিমিড নাম নিয়ে বনে এসেছিল। আর সেখানে গোটা বনটাই তখন চলছিল তার অঙ্গুলিহেলনে। অরল্যান্ডো রোজালিন্ডকে না পেয়ে গ্যানিমিডের প্ররোচনায় তাকেই রোজালিন্ড কল্পনা করে মনের কথাগুলো অকাতরে প্রকাশ করে যাচ্ছিল। আর রোজালিন্ডও নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে অরল্যান্ডোর প্রকৃত মনোভাব যাচাই করে নিচ্ছিল। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, অর‌ল্যান্ডো যখন দুঃখ ভুলতে গ্যানিমিডকে রোজালিণ্ড ভেবে প্রেম নিবেদন করছিল, তখন ছদ্মবেশী রোজালিণ্ড তাকে বারবার মেয়েদের অস্থিরচিত্ততা, সংসারজীবনের জটিলতা, পুরুষের ভালবাসার অসারতা নিয়ে সাবধান করে দিচ্ছিল। এই ডায়ালগগুলোর মধ্য দিয়ে রোজালিণ্ডের নিরপেক্ষ জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে। সে নিজে মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তার স্বজাতির দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে পুরো মাত্রায় সচেতন। এই স্বচ্ছ চিন্তাপদ্ধতির কারণেই সে গোটা নাটকের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
এরপর আসে মার্চেণ্ট অব ভেনিসের কথা। এখানেও নায়িকার অনেক বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ আছে। কিন্তু এখানে নায়িকা পোর্শিয়া প্রত্যক্ষভাবেই ত্রাতার ভূমিকায় দেখা দিয়েছে। বাঘা বাঘা নামজাদা লোকজন যে মামলাটা নিয়ে তোলপাড় করে ফেলল কিন্তু কোন সুরাহা করতে পারল না, পোর্শিয়া এক নিমেষে তার সমাধান করে ফেলল তার কমন সেন্স দিয়ে। এখন প্রশ্ন হল, এতগুলো ছেলে থাকতে ঘরে থাকা একটা মেয়েকে দিয়ে এই সমাধান নাট্যকার কেন দেওয়ালেন? কারণ আর কিছুই না, কারণ হল সংকীর্ণতায় ঘা দেওয়া। সমাজ একটা মেয়ের মুখ থেকে এতখানি বুদ্ধিদীপ্ত জেরা আশা করে না, এমনকি আদালত কক্ষে তার ঢোকারও কোন অনুমতি নেই। তাই পোর্শিয়াকে পুরুষের ছদ্মবেশে সেখানে ঢুকতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত, তার স্বামী বাসানিও-র কাছ থেকে পুরস্কার হিসেবে আংটি নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এবং সেই আংটি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রথমবারে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল। কিন্তু সমালোচকেরা এই দৃশ্যটির কয়েকটি অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমটি হল, ইহুদী শাইলকের বিচার দৃশ্য দিয়ে নাটক শেষ হয়ে গেলে নাটকের করুণ পরিণতির কারণে ভারি মন নিয়ে দর্শককে বাড়ি ফিরতে হত। আর ইহুদীর দুঃখ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি খ্রীষ্টান দর্শকেরা মেনে নিতে পারত না। সে কারণেই এই দৃশ্যটি কমিক রিলিফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর একটি ব্যাখ্যা আছে। পোর্শিয়া বাসানিও-কে আংটিটি আমৃত্যু আঙুলে রাখার শপথ করিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু বাসানিও বন্ধুর মামলা জেতার আনন্দে প্রতিশ্রুতি ভুলে উকিলবেশী পোর্শিয়াকে সেটা দিয়ে দিয়েছে। তাই, পোর্শিয়া যতই আংটির কথা জিজ্ঞেস করে, বাসানিওকে ততই সেই উকিলের প্রশংসা করতে হয় যাতে পোর্শিয়া ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারে। পোর্শিয়াকে সে বুঝাতে চাইল যে সে নিজে এবং তার বন্ধু অ্যাণ্টনিও সেই উকিলের কাছে চিরঋণী। আর এইসব সংলাপের মধ্য দিয়ে নাট্যকার মূলত পুরুষের মুখ থেকে নারীর বৌদ্ধিক সামর্থের স্বীকৃতি আদায় করিয়ে দিলেন।কারণ পরিচয় জানত না বলেই বাসানিও অত অকৃপণ প্রশংসা করেছে সেই উকিলের বুদ্ধির। আর পোর্শিয়াও পুরোদমে তার স্বামীর মুখ থেকে তার সুপিরিয়রিটির স্বীকৃতিটি আদায় করে নিতে পেরেছে। এই একই ব্যাপার অ্যাজ ইউ লাইক ইটের ক্ষেত্র্রেও ঘটেছিল। নারীর নারী রুপটি শুধু কোমলতা আর অধীনতার সমার্থ শব্দ হিসেবেই বিবেচনা করত তখনকার পুরুষেরা। তাই নারীর বুদ্ধি, বিবেচনার স্বাধীন প্রকাশ ঘটাতে পুরুষের ছদ্মবেশ নেওয়া ছাড়া গতি ছিল না।
ম্যাকবেথ নাটকে নারীর যে রুপ প্রকাশ পেয়েছে তাতে রীতিমত চমকে যেতে হয়। লেডি ম্যাকবেথ চরিত্রটি অত্যন্ত বিতর্কিত। কিন্তু এ চরিত্রটিও একটি বিরাট ধাক্কা তৎকালীন সমাজের জন্য। লেডি ম্যাকবেথ রীতিমত একটি ইভিল জিনিয়াস। নারীর এত নিষ্ঠুর রূপ কারো কাছেই প্রত্যাশিত নয়। কিন্ত শেক্সপীয়র জানেন, নারী বা পুরুষ কোন জাতই ভাল বা মন্দের একচ্ছত্র পেটেণ্ট নিয়ে রাখে নি। পদস্খলন যে কারোরই হতে পারে। তাই লেডি ম্যাকবেথ অন্যায় করেছে, ম্যাকবেথও করেছে। আবার সে পাপের শাস্তিও তাদের দুজনকেই পেতে হয়েছে।অন্যায়ের পরিণতি যেমন নারী পুরুষ মানে না, তেমনি অন্যায়ের প্রবৃত্তিও দু’ পক্ষের রক্তেই সহজাত। এই সত্যিটুকু শেক্সপীয়র আজ থেকে শত শত বছর আগেই বুঝে গেছেন, বুঝিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা কি বুঝি? নারীর মানুষ রূপটি নিয়ে আমরা কি আদৌ সচেতন? নারীর সমস্যা অভিযোগ বা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলেই তাকে নারীবাদী অ্যাখ্যা দেওয়া হয়। ঠোঁট উল্টে বলা হয়, “ভারি নারীবাদী! মানবতাবাদী হতে তোমাদের সমস্যা কোথায়? অহেতুক বিভেদ সৃষ্টি করার দরকার কী নারী আর পুরুষের মধ্যে?”
এদের কথার উত্তরে আমার পাল্টা জিজ্ঞাসা–কেন? নারী কি মানুষের বাইরে? আর কে বলল যে নারীবাদ কথাটির মাধ্যমে বিভেদ তৈরি করা হচ্ছে! যে বিভেদ যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে তা চিহ্নিত করতেই এই বাদটির জন্ম দেওয়া হয়েছে। এটাকে অমানবতাবাদ ভাবার কোন সুযোগ তো নেই!
প্রকৃতিতে চিরদিন নানাভাবে সবলের দ্বারা দুর্বল নিপীড়িত হয়ে আসছে। কখনো অর্থশক্তির কাছে দারিদ্র্য, কখনো পেশীশক্তির কাছে রুগ্নতা, আবার কখনো পৌরুষের দাপটের কাছে নারীত্বের পরাজয় হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বিশেষ বিশেষ সুবিধাবঞ্চত গোষ্ঠীর হয়ে কথা বলছেন। তারা সবাই-ই মানবতাবাদী। কিন্তু কে ঠিক কার কথা বলছেন তা বুঝতেই আমরা কাউকে কম্যুনিস্ট,কাউকে নারীবাদী বলে চিনে থাকি! এদের দায়িত্ব বিভেদ দূর করা। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে পুরুষবিদ্বেষ প্রচার করেন, তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত সমস্যা। গোটা নারীবাদকে এর সাথে জড়িয়ে ফেলার কোন কারণ নেই।
একটা সমস্যা হল, আমরা মেয়েদের ব্যাপারে খুব বেশি সাধারণীকরণ করে কথা বলি। আজাকের বাংলাদেশে আমাদের দুই নেত্রীর কেউ যখনই কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেন কিংবা ভুলভাল মন্তব্য করেন তখনই শোনা যায়–“এইজন্যই বলে মেয়েমানুষের বুদ্ধি!” আচ্ছা, আমার একটি বিনীত জিজ্ঞাসা আছে। জেনারেল এরশাদ কোন ভুল করলে তখন তার পুরুষ পরিচয়টা উঠে আসে না কেন? তখন তো দিব্যি ধরে নিই যে, উনি মানুষটাই এমন!
আসলে বুদ্ধি বা বোকামিতে কোন জাতেরই একচেটিয়া অধিকার নেই। এই সহজ সত্যিটুকু বোঝার সময় কি এই একবিংশ শতাব্দীতেও আসে নি!

চুলকানিনামা

আমার চুলকানি হয়েছে। গায়ে এবং মনে- দুইখানেই। বাসায় চুলকাই নিশ্চিন্তে, নির্ভাবনায়- কোন এটিকেট না মেনেই। অফিসেও প্রায় তাই। আমার রুমের দুই সহকর্মী ঢাকার বাইরে। তাই নিশ্চিন্তে চুলকে যাচ্ছি। এক সহকর্মী সাহস দিয়ে বলে গেলেন- চুলকানিকে গায়ে মাখতে নেই। ক’দিন পর নিজেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নাহ্! চুলকে চুলকে চামড়া উঠে যাবার জোগাড়! আমার মা-বাবা আমার আচরণে কোন মনুষ্যত্বের লক্ষণ দেখেন না, তাদের মতে আমি একটি বিশুদ্ধ বাঁদর। কিন্তু হায়! আজ চুলকাতে গিয়ে বুঝলাম- আমার গায়ের চামড়াটা মানুষের।

কাঁহাতক আর চুলকানো যায়! অফিসের মেইন উইন্ডোতে কোন পর্দা নেই। এক হাফপ্যান্ট পরা ভদ্রলোক তার বারান্দায় সিগারেট ফুঁকতে আসেন। তিনি নিশ্চয়ই ভাবছেন- দিনে সাড়ে আট ঘন্টা আমি নিজের হাত-পা চুলকে বেতন নিই। কাঁচের সামনে চেয়ার দিয়ে ভদ্রলোকের দৃষ্টি ঢেকে দিলাম। তখনি দেখলাম- অন্য বারান্দার একটা ছোট্ট মেয়ে আর তাদের কাজের মেয়েটা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। কাজের মেয়েটা হয়তো ছোট্ট মেয়েটাকে বলবে- “আফামনি, দেখছনি তামশা! ল্যাহাপড়া করতে চাও না! দেহ! ল্যাহাপড়া শেখনের কত ফায়দা! খাওজাইয়াই বেতন পাওয়া যায়!” নাহ। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ! আমার কারণে একটি ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।

গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের হাসপাতালটি আমার ধারণক্ষমতার অনেক উপরে ছিল।কিন্তু সময় মিলিয়ে আর কোন অপশন ছিল না। বেছে বেছে মহিলা ডাক্তারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলাম। উনি স্কিন স্পেশালিস্ট হলেও উনার ঈশ্বরপ্রদত্ত স্কিনটি দেখার সৌভাগ্য আমার হল না। পুরোটাই মেকাপচর্চিত। উনি  আমাকে ময়েশ্চারাইজারই প্রেসক্রাইব করলেন চার রকম। প্রত্যেকটার গায়ে লেবেল এঁটে দিলেন-“ দিনে দুবার করে লাগাবে। আমি চাকরি করি শুনে বলে দিলেন- “অফিসে বসে বসে সারা গায়ে মেখে নেবে। ” ইয়ে মানে, অফিসে বসে বসে সারা গায়ে! যাহোক, উনি অনেক পাস দেওয়া ডাক্তার! উনাকে প্রশ্ন করা আমার মানায় না।

বিশ্বস্তভাবে উনার প্রেসক্রিপশনের প্রতিটি কথা মানতে গিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম, আমার শরীরে জায়গা বড় অপ্রতুল। ১২০০ টাকা মূল্যের বডি ওয়াশ দিয়ে বডিকে ধুয়ে মুছে সেই বডিতে ১৪০০ টাকা মূল্যের একটা লোশন লাগানোর পরে বাকিরা ঠিক এঁটে উঠতে পারছে না। বাকিদের লাগানোর আগেই শরীরটা কেমন ফ্যাঁচফেচে হয়ে উঠছে। তবু, এটাকে আমার শরীরের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা বলেই ধরে নিলাম। উনার সাথে আমার সাক্ষাতের দ্বিতীয় দিনে বেরোবার মুখে কলিগের সাথে দেখা! কলিগ আমাকে দেখে আঁতকে উঠে বললেন, “আপা, মুখটা এত তেলতেলে কেন? মুখটা ধুয়ে যান।” আমি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললাম, “চোখটাকে একটু জাতে ওঠান, মিয়া। জানেন, এই মুখে অন্তত ৬হাজার টাকার প্রোডাক্ট লাগানো আছে! তাও তো দুইটা লাগাই নি!” আমার সহকর্মী চুপসে গেলেন।

প্রথম দর্শনেই সেই চিকিৎসক ১৬,৬৩৬ টাকা বিল করেছেন (তার দেখা পাওয়ার আগেই অবশ্য দর্শনী এবং রেজিস্ট্রেশন বাবদ আমার আরও ১৪৫০ টাকা খসেছে)। আজ রিপোর্ট হাতে পেয়ে যে কী করবেন, বিধাতাই জানেন!

উনার প্রতীক্ষায় বসে থাকতে থাকতে চারদিকে চোখ বুলালাম- চারপাশে চকচকে সব রোগি। সবার চোখেই কেমন সরু আর তেরছা দৃষ্টি। টাকা বা স্ট্যাটাস থাকলে সোজাসুজি তাকাতে নেই। সবাই যেন একটা থিম সং গাইছে-  “শেইক মি বেবে! আই অ্যাম এ মানি ট্রি।”

আমার ডাক পড়ল। টেস্টের রিপোর্ট খুবই ভাল। উনি মিষ্টি করে হেসে ওষুধ রিভিউ করাতে লাগলেন। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, যোগ করতে লাগলেন। হঠাৎই তার খেয়াল হল- উনি আগের দিন আমাকে কোন ফেইস ওয়াশ দেন নি। তড়িঘড়ি অ্যসিসটান্ট ডক্টরকে ধমকে উঠলেন, “ আই কান্ট বিলিভ যে তুমি ফেইসের জন্য  কিছু লেখ নি!” এতটা সেই অ্যাসিসট্যান্টও নিতে পারলেন না। বললেন, “ম্যাম, উনার ফেইসে তো কিছু হয় নি। ” উনি বললেন, “তো কী হয়েছে? না হলেও দিতে হবে। যে প্রোডাক্ট আমি বডির জন্য দেব, সেটা ফেইসের জন্যও দিতে হবে। পেশেন্টের সমস্যা না থাকলেও দিতে হবে।” অ্যাসিস্ট্যান্ট ছেলেটি এখনো গলা কাটতে ততটা সিদ্ধহস্ত হয়নি বোঝা গেল।

যাহোক, এই শেষ লাইনটি দিয়ে উনি আমার চক্ষুদান করলেন। আমি হাসিমুখে চেম্বার থেকে বেরিয়ে প্রেসক্রিপশনে চোখ বুলিয়ে দেখলাম- অ্যালার্জির ওষুধ মাত্র দুটি। একটির মূল্য ৪০ টাকা। আরেকটির মূল্য ৭০ টাকা। বাকি সব প্রসাধনী। উনার দৌলতে আগামী তিনমাস আমাকে কোনরকম প্রসাধনী কিনতে হবে না।

আমার হঠাৎই মনে পড়ল- একটা লোশনের ক্যান এখনো আনওপেনড (যেটা কীনা অফিসে বসে আমার সারা গায়ে মাখার কথা)। ওটা আমার ব্যাগেই ছিল। ফার্মেসীতে গিয়ে ফিরিয়ে দিয়ে এলাম। ওই একটা লোশন ফেরত দিয়ে কত টাকা পেলাম, জানেন? ৪৬০০ টাকা।

মোরাল অব দ্য স্টোরি: ডান হাত চুলকালে টাকা আসে। বাম হাত চুলকালে যায়। আর সর্বাঙ্গ চুলকালে মতিভ্রম হয়। তারপর… তারপর…পকেটটা পাতলা হয়ে যায় আর মনটা ভারি হয়ে যায়। আর তারপর মনে হয়, বাংলা প্রবাদবাক্যগুলো রিভিউ করা দরকার। বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, আর ডাক্তার ছুঁলে ???

ম্যাজিক ডায়েরি

১৪ নভেম্বর, ২০১২
বিভু এ জগতের কেউ না। কিন্তু ওর বিশ্লেষণী ক্ষমতা আর অনুভূতি দেখে অনেক সময় মনে হয় যেন ও-ও আমাদেরই মত রক্ত মাংসের মানুষ। ওকে কিছু বলা লাগে না, এমনিতেই বুঝে যায়। আজ সকাল বেলায় যখন ডাইনিং টেবিলে বসে ওর বানানো কফি খাচ্ছিলাম, তখন ও অদ্ভূত একটা কথা বলে উঠল।
“ ঋতু, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আপনি কষ্টটা পুষে রেখে আনন্দ পাচ্ছেন, তাই কি?” কফির মগটা নামিয়ে রেখে বিভু জিজ্ঞেস করল। ওর চোখে মুখে মনোবিজ্ঞানীদের মত সবজান্তা ভাব।
“একদম বাজে কথা বলবেন না। কষ্ট পুষে রাখব কোন দুঃখে? আমি কি কবি না ভিক্ষুক যে কষ্ট বেচে খাব?” ওর কথা শুনে এত বিরক্ত লাগল যে একটু রুক্ষ না হয়ে পারলাম না।
“ মারাত্মক মেটাফর দিলেন তো! তবে এত সরাসরি কথা শুনলে কবিরা কিন্তু চরম খেপবে। ” বলেই হা হা করে হা হা করে হাসতে থাকে বিভু।
ওর হাসির শব্দটা কেমন যেন অন্যরকম। শুনলেই মনটা ভাল হয়ে যায়।
“দুরো মিয়া! বিন্দুমাত্র সেন্স অব হিউমার থাকলে এই কথা শুনে কেউ খেপবে না। আর সত্যিকারের কবি হলে তো খেপবেই না। যাহোক, কাজের কথায় আসি, আপনার কেন মনে হল যে আমি কষ্টটা পুষে রাখতে চাচ্ছি?”
“শুধু আপনি না, এটা অনেকের ক্ষেত্রেই সত্যি। মানুষের জীবনে যখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে তখন সে সেটা অস্বীকার করতে চায়। তার মনপ্রাণ সব তখন একসাথে বলে ওঠে, না এটা হতে পারে না। এটা হল কষ্টের মুহুর্তে মানুষের প্রথম রি-অ্যাকশন।”
“দ্বিতীয় রি-অ্যাকশনটা কী?”
“রাগ। যে দুঃখ দিয়েছে তার প্রতি রাগ হয়, যদি সরাসরি কাউকে দায়ী করার না থাকে তাহলে সৃষ্টিকর্তার উপর রাগ হয়। মানুষ মনের ঝাল মিটিয়ে বেচারা বিধাতার গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকে।”
মুখে প্রকাশ না করলেও ভিতরে ভিতরে ভালই বুঝছিলাম, প্রত্যেকটা কথা অক্ষরে অক্ষরে আমার সাথে মিলে যাচ্ছে।
গলায় যথাসাধ্য নিরাসক্তির ভাব ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তাই নাকি, তারপর কী হয়?”
“তারপরই সবচেয়ে কঠিন মুহুর্তটা আসে। মানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহুর্ত। কেউ কেউ দু:খটাকে ভুলে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং ভুলে থাকার বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিও বের করে ফেলে। কিন্তু কারো কারো জেদ চেপে যায়। দিনে রাতে, কাজে অকাজে, সারক্ষণ ওই স্মৃতিটাকে নিয়েই নাড়াচাড়া করতে থাকে। এতে করে একরকম বেদনামধুর অনুভূতি হয়। মশা কামড়ালে সেই জায়গায় চাপ দিলে যেরকম হয়, অনেকটা সেইরকম। ব্যাথা ব্যাথা লাগে, তারপরও চাপ দিতে ভাল লাগে।”
খুব হাসি পেয়ে গেল আমার। “আপনি তো কোনদিন মশার কামড় খান নি। তাহলে এত কিছু বোঝেন কী করে? আপনাদের জগতে কি মশা আছে?”
“আপনার বাসায় যখনি আসি তখনি তো মশার কামড় খাই! আপনি তো কয়েল জ্বালান না।”
“হুম, কয়েলে আমার চোখ জ্বলে, কিন্তু আপনার কি ধারণা যে আমিও ওই বেদনামধুর অনুভূতিটা পাওয়ার জন্য জেদ করে এই দুর্ঘটনাটা মনে রেখেছি?”
“না, আপনার ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। আপনি ভুলতে চান, আবার চান না। সেটা আরেকদিন বুঝিয়ে বলব, কারণ এখন তো আপনি অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হবেন।”
“দূর ছাতা, একেবারে মেগা সিরিয়ালের মত সাসপেন্স! ভাল্লাগে না!”
বিভু একটু মুচকি হেসে বের হয়ে গেল।

১৫ নভেম্বর, ২০১২
কয়েক বছর ধরে এই অ্যাড ফার্মটায় কপিরাইটারের কাজ করছি। খুব ঝামেলার কাজ। তার ওপর আজ সারাদিন আবার কাজের চাপ খুব বেশি ছিল। অফিসে আর একটু হলেই ডেডলাইন মিস হয়ে যেত। এখানকার এত চাপ সামলানোর পর বাসায় গিয়ে নিজের কাজগুলো নিয়ে আর বসা হয় না। কোন বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করি না। সবাইকে বলি, সময়ের অভাব। কিন্তু আমি জানি, আমার সমস্ত সময়টা ইদানীং কাটছে শুধু ওই তিক্ত মুহুর্তগুলো ভুলে থাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টায়। সমস্ত উদ্যম হারিয়ে ফেলেছি। ইদানীং বিভু চেষ্টা করছে আমাকে একটু জাগিয়ে তোলার। দেখি আজকে বাসায় গিয়েই আমার ল্যাংগুয়েজ স্কুলের অ্যাডভান্সড লেসনগুলো বানিয়ে ফেলতে হবে। এই স্কুলটা বানাব বিদেশীদের জন্য- ওদেরকে বাংলা শেখানোর জন্য। কিন্তু অন্য স্কুলগুলোর মত এখানে খালি ভাষা শিখিয়েই আমি দায়িত্ব শেষ করব না। আমি চাই ওরা যেন আমার দেশের কৃষ্টি- কালচার, শিল্প-সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ সেটাও বুঝতে পারে। অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখছি কয়দিন। বিভু এসেই স্বপ্নটা আরো বেশি করে জাগিয়ে দিল।
তবু কাজের ফাঁকে ফাঁকে পুরনো ক্ষতটা কেমন টনটন করে ওঠে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও মনটা জাবর কেটে চলে। আজকে আবার বিভুর কালকের সেই কথাটা থেকে থেকে মনে পড়ে যাচ্ছে। আমি নাকি জেদের বশে এই ঘটনাটা ভুলতে চাচ্ছি না!
বিভু আসলে ওর সাথে একটু বসা যেত। ও অবশ্য আমার অফিসে কখনো আসে না। তবে কয়েকটা ল্যাংগুয়েজ লেসন নিয়ে ওর আমার সাথে বসার কথা ছিল। দেখি বাসায় আসে কীনা।
এই কয় মাসে বিভুর সাথে আমার অন্যরকম একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেছে। অনেকটা অতিপ্রাকৃত বন্ধুত্ব। ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হওয়ার বর্ণনা শুনলে যে কারোর গা ছমছম করে উঠবে। খানিকটা ভুতুড়ে ব্যাপার।
সেদিন বাড়িতে বসে আমার অনেক বছরের পুরনো ডায়েরীটা নাড়াচাড়া করছিলাম। হঠাৎ করেই দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে কেমন যেন চিনচিনে একটা ব্যাথা হতে লাগল। আমি দুই চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কিন্তু জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি ভেবে জোর করে চোখ খুলতেই দেখি একটা ছেলে আমার সামনের চেয়ারটায় বসে আছে।
আমি ভেবে পেলাম না, ছেলেটা কোন দিক দিয়ে এখানে ঢুকল। কাজের মেয়ে চলে যাওয়ার পর আমি নিজে হাতে দরজাটা লাগিয়েছি। ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল, “খুব ভয় লাগছে? কফি বানিয়ে দেব? মাথাটা ছেড়ে যাবে তাহলে।”
”আপনি কে? কোন দিক দিয়ে ঢুকলেন?”
“সত্যি উত্তরটা দিলে আপনি এখন নিতে পারবেন না। ওটা পরে বলব।”
ঠিক সেই সময়ে দরজায় টোকা পড়ল।
“আপনার স্বামী এসেছেন বোধহয়। ভয় নেই, দরজা খুলে দেন। উনি আমাকে দেখতে পাবেন না কারণ তার মনের বেটা বা গামা- কোন লেভেলেই আমার কোন অস্তিত্ব নেই।”
বিভু ঠিকই বলেছিল। ও একদম দরজার সামনে বসে থাকা সত্ত্বেও রাতুল সত্যিই সেদিন ওকে দেখতে পায় নি। অন্য যে কোন দিনের মতই বিরক্ত মুখে রাতুল বেডরুমে ঢুকে পড়ল।
আমারও তখন বিভুর দিকে মনোযোগ দেওয়ার মত সময় ছিল না। তখন আমার রুটিন ওয়ার্ক করার সময়। কারণ সারাদিনের অফিসের সমস্ত বিরক্তি রাতুল এখন আমার উপর তুলবে। যে কোন কথা জিজ্ঞেস করতে গেলে এখন খেঁকিয়ে উঠবে। আমাকে তাই যথারীতি মুখ বুজে ওকে খাইয়ে দিতে হবে। তারপর ওর পাশে চুপচাপ বসে প্রসঙ্গ খুঁজে খুঁজে কথা বলতে হবে। কথা না বলে চলে গেলে ও আরো রেগে যাবে। আর তারপর আমার কথা চালিয়ে যাওয়ার একটার পর একটা প্রচেস্টা ব্যর্থ করে দিয়ে হঠাৎ করে আমাকে জড়িয়ে ধরবে। তখন কিছুক্ষণের জন্য ওর স্ত্রী ছাড়া আমার আর অন্য কোন পরিচয় থাকে না। আমি ওই মুহুর্তটাতেও ওকে খুঁজে পেতে চেস্টা করি। দুজনের শরীরের এত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের পরও ওকে আমার ভীষণ দূরের মনে হয়। তবু ওর ভিতরের শিশুটা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ত তখন ওর দিকে তাকিয়ে আমার ভেতর কেমন যেন একটা মাতৃস্নেহ জেগে উঠত। মনে হত, ওর ভিতরের অবুঝ শিশুটা আমার বুকের মধ্যে মুখ রেখে সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে থাকতে চাচ্ছে। সমস্ত নিষ্ঠুর বাস্তব থেকে সরে থাকার জন্য আমিই বোধহয় ওর শেষ আশ্রয়।
সে রাতে রাতুলকে ঘুম পাড়িয়ে বের হওয়ার পর বিভুকে আর দেখতে পাই নি।

১৭ নভেম্বর, ২০১২
বাসায় এসে থেকে বিভুর জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু বিভু তো এল না। বেশ রাগ লাগছে।
ডায়েরিটা হাতে তুলে নিলাম। দুই ভ্রুর মাঝখানে আবারো ব্যাথা করে উঠল। কিন্তু চোখ খুলে ওকে দেখতে পেলাম না। কিন্তু এরকম তো ও করে না। যেদিন আসার কথা থাকে, সেদিন তো ও চলে আসে।
ও আচ্ছা! ও তো বলেনি যে আজ আসবে। তবু বারবার বিভুকে ডেকে আনার ব্যর্থ চেষ্টা চালাতে গিযে মাথাটা কেমন ফেটে যেতে চাচ্ছে!
অর্ধচেতন অবস্থায় বিভুর দ্বিতীয় দিনের আসার স্মৃতিটা মনে পড়ল। ততদিনে এক আইনজীবি বন্ধুর মারফত জেনেছি, রাতুল নাকি আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমি কদিন ধরে খুব কেঁদেছিলাম। কেমন যেন অস্থির লাগছিল। ওকে ভোলার জন্য তাড়াতাড়ি করে টিন এজ বয়সের একটা পুরনো ডায়েরি শেলফ থেকে বের করে নিয়েছিলাম। ঠিক তখনি বিভু হাজির।
চুপ করে আমার মুখোমুখি কিছুক্ষণ বসে থাকল।
“কী হয়েছে?” এমনভাবে জিজ্ঞেস করল যেন উত্তরটা আগে থেকেই জানে।
“বন্ধ দরজা ভেদ করে ঢুকে পড়তে পারেন আর কী হয়েছে সেটা বুঝতে পারেন না?”
“পারি তো। কিন্তু আমি তো জানার জন্য জিজ্ঞেস করি নি। বললে আপনারই মন হালকা হবে।।
“হবে না। আমি খুব কমপ্লিকেটেড চরিত্রের মেয়ে। কারো কাছে মনের কথা বললে আমার নিজেকে কেমন ছোট লাগতে থাকে। তার চাইতে আপনি বলেন তো, আপনি কোথায় থেকে এরকম মাটি ফুঁড়ে উদয় হন?”
“হুম, তাহলে তো বিরাট লেকচার দিতে হয়। শোনার ধৈর্য আছে?”
“বলেন, শুনি।”
“আপনার অবশ্য বুঝতে বেশি কষ্ট হবে না। কারণ আপনার তো প্লেটোর আইডিয়াল ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে পড়া আছে। ব্যাপারটা অনেকটা সেই রকম। আপনাদের এই পৃথিবীর বাইরেও আর একটা পৃথিবী আছে। বিশ্বাস করতে অনেকটা কষ্ট হবে কিন্তু একটু মন দিয়ে ভাবলেই বুঝতে পারবেন। আপনাদের এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ কল্পনাপ্রবণ। শিশুরা সবচাইতে বেশি। দেখবেন, ওরা একা একা কথা বলে, বাসার সোফাটাকে অনায়াসে গাড়ি কল্পনা করে সেটা নিয়ে খেলতে শুরু করে। ওদের ছোট্ট বারান্দাটাকে একটা জঙ্গল ভেবে বিভিন্ন রকম অভিযানে বের হয়। ওর সাথে থাকা বিভিন্ন খেলনা হাতি, ঘোড়া, আর পুতুলগুলো হয়ে যায় ওর কল্পনার বিভিন্ন চরিত্র। কেউ রাক্ষস, কেউ রাজকন্যা। ্ওর এইসব কার্যকলাপ বড়দের চোখে হাস্যকর, কিন্তু ওর কাছে ওটা একটা অন্য লেভেলের রিয়ালিটি।
এই পর্যন্ত বলতেই আমি ওকে থামিয়ে দিলাম। “কিন্তু এর সাথে আপনার সম্পর্ক কী? আপনি কি বলতে চান, আপনি প্লেটোর আইডিয়াল ওয়ার্ল্ড থেকে এসেছেন?”
“না, অল্টারনেটিভ রিয়ালিটি থেকে এসেছি। এই পৃথিবীতে মানুষ অনেক কিছু কল্পনা করে। তার অজান্তেই এই কল্পনাগুলো অল্টারনেটিভ রিয়ালিটিতে কপি হয়ে যায়। আপনি সারাজীবন ধরে আমার মত একজন বন্ধু পেতে চেয়েছেন। কিন্তু আপনার মন বা বয়স কোনটাই তখন আমাকে গ্রহণ করার জন্য তৈরি ছিল না। আর যখনই আপনি আপনার পুরানো ডায়েরিটা ধরেন, আপনার মনের অজান্তেই আপনার মনের মধ্যে একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়। মনে হয়, ডায়েরিতে যার কথা লিখেছিলাম, সে যদি সত্যি সত্যি থাকত!— ”
“আর তাই আপনি আজ সত্যি সত্যি হাজির হয়ে গেলেন, তাই তো? কিন্তু এর আগেও তো আমি বহুবার ভেবেছি আপনার কথা। তখন কেন আসেন নি?”
“ঘা না খেলে মন পরিণত হয় না। আর আজকে চোখটা বন্ধ করে আপনি আপনার ‘ভেনা আমোরিস’-টা ডায়েরির ঠিক মাঝখানে রেখেছিলেন।”
“ভেনা আমোরিস আবার কী জিনিস?”
“আমাদের বাম হাতের অনামিকা আঙুল থেকে সরাসরি একটা ভেইন চলে গেছে হৃদপি- পর্যন্ত। রোমানরা এটাকে ভেনা আমোরিস বলে ডাকত। এই কারণেই বিয়ের আঙটি সবাই এই আঙুলে পরে। অবশ্য কারণটা না জেনেই পরে। তাই আজ ওই আঙুলটা ডায়েরির মাঝখানে-মানে আপনার টিনএজ বয়সের সেই ইমোশনগুলোকে ভেনা আমোরিস দিয়ে ছোাঁয়ার সাথে সাথে আপনার মনের আলফা লেভেলে সিগন্যাল চলে গেল। কারণ, প্রথমত, আপনার মন আজ আপনার সহ্যশক্তির সর্বোচ্চ সীমায় পেঁছে গিয়েছিল, দ্বিতীয়ত, ভেনা আমোরিস দিয়ে ডায়েরিটা ছুঁয়ে দিলেন। ব্যস সিগন্যাল অল্টারনেটিভ রিয়্যালিটিতে পৌঁছে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আমিও হাজির।”
আমি অবাক হয়ে সেদিন ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নিজের কল্পনাকে এত কাছে , চোখের সামনে দেখব কখনো ভাবি নি। এই জন্যেই কি ওর এরকম অদ্ভূত আবির্ভাব দেখেও আমার ভয় লাগে নি? আমার অবচেতন মন ওকে দেখে চিনতে পেরেছিল?

১৮ নভেম্বর, ২০১২
আজ বিভু এসেছে। আমার বাসার একটা ঘর এখন ওর হয়ে গেছে। যখনি আসে, ওই ঘরটায় থাকে। আমি বসে বসে ল্যাংগুয়েজ লেসনগুলো ঘষামাজা করছিলাম। ও পাশে বসে বসে দেখছিল, এটা ওটা মন্তব্য করছিল। ও পাশে না থাকলে কাজটা শেষ করতে পারতাম না। কখনো পরামর্শ দিয়ে, কখনো নিজেই একটা লেসন প্ল্যান করে আমার পুরো কাজটাকে ও-ই প্রায় শেষের পথে এনে দিয়েছে। তার বদলে অবশ্য ওকে খাওয়াতে হবে। ও আগেই বলে রেখেছে। আমাদের জগতে এলেই নাকি ওর ক্ষুধা লাগে।
সেই খাবারটাও আবার আমাকে নিজে হাতে বানাতে হবে। সেটাও আবার নতুন কিছু হতে হবে। কী আর করা! ওর আবদার মেটানোর জন্য বেশ কয়েকটা রান্নার বই কিনেছি। ছুটির দিনে ওইগুলো প্র্যাকটিস করতেই করতেই সময় কেটে যায়। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়। ও কি সত্যই খাওয়ার জন্য এইরকম অদ্ভূত বায়না ধরেছে নাকি আমাকে ব্যস্ত রাখার একটা কৌশল এটা?
“প্রশ্নের উত্তরটা পেলেন?” হঠাৎই জিজ্ঞেস করে উঠল বিভু।
“কোন প্রশ্ন, ভুলতে চাওয়া না চাওয়া? কিন্তু সেটার উত্তর তো আপনি দেবেন বলেছিলেন।”
“না, আমি আপনাকে ভাবাতে চাচ্ছিলাম। একটু ঠা-া মাথায় না ভাবলে আপনার নিজের কাছে সব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হবে না।”
“আমি জানি আমি কী চাই।”
“তো, সেটা আমার সাথে শেয়ার করেন। আচ্ছা, ঠিক আছে, আগে বলেন, রাতুলকে কি আপনি আবার ফিরে পেতে চান?”
“অসম্ভব! সেটা কেন চা’ব? যে একবার আমাকে ছেড়ে অন্য কারোর কাছে যেতে পারে তাকে ফিরে চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি আসার আগে ওর জীবনে যাই হয়ে থাক, আমি ওর জীবনে থাকা অবস্থায় যদি কেউ ঢুকে পড়ে তাহলে সে ছেলেকে বিশ্বাস করা কোনভাবেই সম্ভব না।”
“সে-ও ফিরে আসছে না, আপনিও আর তাকে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন না। ব্যস, মিটে গেল। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?”
“ সমস্যাটা ওর হিপোক্রেসি নিয়ে। শেষ যেবার আমাদের ঝগড়া হল তখনই মাসখানেক পর থেকে আমার সিক্সথ সেন্স আমাকে বলছিল যে ওর জীবনে অন্য কেউ এসেছে। কেন জানি আমি বুঝতে পেরেছিলাম। ওর কোন বন্ধুর সাথে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। ওর কোন রকম আপডেট পাওয়ারও কোন সুযোগ ছিল না। তবু কেন জানি মনে হয়েছিল যে, ওর জীবনে কেউ এসেছে। তবু চুপচাপ ওর জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, যদি সত্যি সত্যি ওর সাথে আমার সম্পর্কটা টেকার হয়, তাহলে ও একবারের জন্যেও ফিরে আসবে। একটা ফোন করবে।”
“ সে তো ফোন করেছিল এবার। করে নি?”
“হ্যাঁ করেছিল। ফোন করে কী বলেছিল জানেন? বলেছিল, ‘ তোমার বন্ধুত্বটা আমি এখনো খুব মিস করি। আমরা চাইলে এখনো বন্ধু থাকতে পারি। এভাবে একা একা থেকো না। তুমি যদি চাও, আমি তোমার জন্য কাউকে খুঁজে দিতে পারি।’ সাথে সাথে আমার ওকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছিল, ‘ ও, তাহলে তোমার নিজের কাজটা জায়েজ হয়, তাই তো?’ কিন্তু ও হজম করতে পারবে না বলে বলিনি। এর পরেও কয়েকবার আমি ওকে ফোন করেছি, ও আমাকে ফোন করেছে। কিন্তু প্রতিবারই ওকে খুব দূরের মানুষ বলে মনে হত। মনে মনে বুঝতাম, ও এখন অন্য কারোর হয়ে গেছে। তাই আমাকে এড়িয়ে চলতে চায়। হয়তো নতুন মানুষটার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য।”
“ এই ব্যাপারে সরাসরি ওকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি?”
“সরাসরি জিজ্ঞেস করার আগেই আমি সবকিছু জেনে গিয়েছিলাম। এমনকি মেয়েটার নাম পর্যন্ত জানতাম। একটা ইরানী মেয়ে। এই দেশের একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরও আমি চাইতাম, ও আমাকে সরাসরি বলুক। তাই অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, ‘তোমার কি নতুন গার্লফ্রে- হয়েছে?’ ও প্রশ্নটা শুনলেই কেমন যেন হয়ে যেত। অপ্রস্তুত ভাবটা ঢাকার জন্য কখনো হাসত, কখনো বলত, ‘সেটা জেনে কি লাভ হবে তোমার?’ আমি যদি আর একটু জোরাজুরি করতাম তখন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকত, তারপর বলত, ‘না, হয়নি।’ এই মিথ্যেটা আমাকে এখনো খুব কষ্ট দেয়। এরকম একটা মিথ্যাবাদী, কাপুরুষকে এতদিন ভালবেসেছি, এর পিছনে এতটা সময় নষ্ট করেছি মনে হলে নিজের প্রতি খুব বিরক্ত লাগে।”
“মিথ্যা বলার কারণটা কি এখন ধরতে পারেন?”
“ হয়তো ওর নতুন রিলেশনশিপটা তখনো প্রপোজালের সীমা ডিঙ্গিয়ে অফিসিয়ালি কনফার্মড হয় নি। সেই জন্য আগে থেকে বলতে চায় নি। কিন্তু মনে মনে ও যে মেয়েটার প্রতি সর্ম্পূণ ডেডিকেটেড হয়ে গেছে সেটা ওর হাবে ভাবেই বোঝা যেত। কিন্তু ওর নতুন আকর্ষণের কথা আমার কাছে স্বীকার করার সাহসটুকু ওর হয় নি। কিন্তু আমি এটুুকু সৎ সাহস ওর কাছ থেকে আশা করেছিলাম। যদি সত্যি সত্যিই ও আমাকে একফোঁটা চিনে থাকত, তাহলে কথাটা আমার কাছে স্বীকার করত। এইটুকু রেসপেক্ট আমাকে দিত। শেষ যে দিন দেখা হল সেদিনও বলল, আমিই নাকি ওর বেষ্ট ফ্রেণ্ড। ও আমাকে বন্ধু হিসেবে সারাজীবন মনে রাখবে। আমি যদি এভাবে ভেঙ্গে না পড়তাম, তাহলে নাকি ও এখনো আমার সাথে বন্ধুত্ব রাখত। কতখানি হাস্যকর কথা একবার ভেবে দেখেছেন?”
বিভু হা হা করে হেসে উঠল। “ব্যাপারটা কেমন হল আমি বলি। হাইজ্যাকার সব কিছু কেড়ে নিয়ে যদি বলে, ‘কিপ ইন টাচ।’- এই কথা শুনলে যেমন লাগবে আপনারও ঠিক তেমন লেগেছে।”
আমারও হাসি এসে গেল। বিভু এই জগতের মেটাফরগুলো এত মোক্ষম জায়গায় ব্যবহার করে যে, না হেসে পারা যায় না।
“আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় যে আপনার প্রতি ওর এখনো কোন আকর্ষণ আছে?”
“আরে না! আগেও আমার প্রতি ওর খুব একটা আকর্ষণ ছিল না। কিন্তু ও একা থাকতে পারত না। সেই সময় অন্য কোন মেয়ে বন্ধু ওকে এত সময় দিচ্ছিল না। আমি তখন নতুন ছিলাম ওর কাছে। আমার কাছে ওর আগের রিলেশনশিপটা নিয়ে ইচ্ছেমত কাঁদুনি গাইতে পারত। অন্য কারোর তো এত ধৈর্য ছিল না ওইসব প্যাঁচাল শোনার। কিন্তু আমি শুনতাম। ওর একাকীত্ব আমাকে খুব ছুঁযে যেত। ভাবতাম, ও-ও আমার মত শুদ্ধতাবাদী, আর দশজন ছেলের মত বহুগামী নয়। ওর প্রথম প্রেমের খুঁটিনাটি বর্ণনা আমাকে শোনাত, ওর ওই ইমোশনগুলো আমার কাছে খুব পবিত্র মনে হত। কিন্তু ও আসলে আমাকে আমার কাছে ওর সমস্ত দু:খ কষ্টের কথা বলতে পারত, তাই, নি:সঙ্গতা কমানোর একটা হাতিয়ার হিসেবে এতদিন আমাকে ব্যবহার করে গেছে। সেইজন্য, প্রতিবার ঝগড়ার পর শুধু আমিই ওর কাছে ফিরে গেছি। ও কিন্তু একবারের জন্যও ফিরে আসে নি। এতেই তো স্পষ্ট যে, আমি ওর জীবনে জাস্ট একটা অপশন ছিলাম, কোন ডেসপারেট নিড ছিলাম না। আর এবার ঝগড়ার পর যেই পছন্দসই একটা মেয়েকে পেয়ে গেল, ওমনি আমাকে দূরে সরিয়ে দিল।
“তাহলে আপনি ওকে আপনার জীবনে এতখানি জায়গা দিতে গেলেন কেন?”
“ওর যখন মন ভাল থাকত, তখন ও আমাকে খুব ভালবাসত। খুব ইমোশনাল হয়ে যেত। একবার জ্বরের ঘোরে আমাকে খুব কাকুতি-মিনতি করে বলেছিল, ‘কখনো যদি আমি খুব অভিমান করে থাকি, তবু তুমি যেন আমাকে ভুল বুঝ না, আমাকে আবার ফিরিয়ে নিও, আমার কাছে ফিরে এস।’ আমি সেদিন ওকে কথা দিয়েছিলাম। আর তাই শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছি ওকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ আমার মনে হত, পৃথিবীতে একটা অন্তত এমন মানুষ আছে যার জীবনে আমি অপরিহার্য, ইররেপ্লেসিবল। কিন্তু যেই বুঝতে পারলাম যে, আমি যে কোন মুহুর্তে যে কারোর দ্বারা রিপ্লেসড হয়ে যেতে পারি, সেই মুহুর্ত থেকে মোহটা ভেঙ্গে গেল।”
গলার কাছে কেমন যেন একটা বিশ্রী দলা পাকাতে লাগল। ভয় হল, বিভুর সামনেই কেঁদে ফেলব না তো? কান্না আড়াল করার জন্য বিভুর দিক থেকে একটু ঘুরে বসলাম। ভান করলাম যেন ওপাশে প্রিণ্ট করে রাখা লেসনগুলো চেক করার জন্য এবার আমাকে বাধ্য হয়ে ঘুরে বসতে হয়েছে।
“একটা প্রশ্ন করি, খুব ভেবে উত্তর দেবেন। কোনটা ভেবে বেশি কষ্ট হয়? ওকে আর পাবেন না বলে নাকি ওর জীবনে নতুন কেউ এসেছে বলে?”
“দুটোর কোনটাই না। একটা সম্পর্ককে যে পুরনো জামাকাপড়ের মত বদলে ফেলতে পারে, তাকে পেতে চাওয়ার কোন মানে হয় না। আর, ওর নতুন রিলেশনশিপ হওয়াতে আমি হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছি। আমি নিজেও চাচ্ছিলাম, এটা হোক। কারণ রিলেশনশিপ না হলে, শত তিক্ততার পরেও এখনো আমার ভেতরে ওর জন্য একরকম দায়বদ্ধতা কাজ করত। মনে হত, ও হয়ত ঠিকমত খায় নি। হয়তো আবার জ্বর এসেছে। ওর খুব ঘন ঘন জ্বর আসত। একা একা আছে, দেখাশোনা করার জন্য কেউ আছে কীনা- এরকম হাজারটা টেনশন ভিড় করত। এখন ওই দায়টা থেকে আমি মুক্ত।”
“ওর বাড়িতে কেউ নেই?”
“ওর বাবা-মা চিটাগাংয়ে থাকে। ও আর ওর ছোট ভাই ঢাকায় থাকে।”
“বিয়ের পর আপনারা কোথায় ছিলেন?”
“কখনো কখনো আমার সাথে আমার বাসায় থাকত। মাঝে মাঝে ওর ভাইয়ের কাছে গিয়ে থেকে আসত।”
“আপনাদের বিয়ের কথা কে কে জানত?”
“দুজনের কেউ-ই মা-বাবাকে বলি নি। আসলে আমি চেয়েছিলাম দুজনেই ঠিকমত নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তারপর বিয়েটা করব। কিন্তু ও কিছুদিন এমন অসুস্থ হয়ে যেতে লাগল যে ওর দেখাশোনা করার জন্যই হুট করে বিয়েটা করে ফেললাম। কিন্তু মা-বাবার কানে যাতে না যায় সেজন্য আমি আমার কোন বন্ধুর কাছেও একথা বলি নি। কেন যে কাউকে বলি নি সেটা কিন্তু ও-ও জানত। আর ওর সাথে পরিচয় হওয়ার পরে অন্য সব বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলাম। ও ছাড়া আমার আর কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে সময় ছিল না। কিন্তু এখন ও আমার নামে কী বলে জানেন? আমি নাকি ওর পরিচয় দিতে লজ্জা পেতাম বলে কারোর কাছে ওর কথা বলি নি! এতদিনে এ-ই চিনেছে ও আমাকে?”
কান্না আর সামলাতে পারলাম না। বাঁধ ভেঙে সব কষ্ট যেন বের হয়ে আসতে লাগল। গলা আটকে গেল। কথা বলার জন্য মুখটা যে-ই খুলতে যাচ্ছি, গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। ভাগ্যিস, তা-ও মুখটা একদিকে ফেরানো। বিভু আমাকে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে না।
ওপাশে বসে বসেই বিভু এবার একটা টিস্যু বাড়িয়ে দিল। বুঝলাম, মুখ ফিরিয়েও কোন কাজ হয় নি। মুখ ঢাকলেও, কণ্ঠস্বর তো আর ঢেকে রাখতে পারছি না।
“আমি বুঝতাম যে ও আমার সাথে একেবারেই সুখী ছিল না। সব ছেলের কল্পনায় একটা নরম নরম, কোমল কোমল গার্লফ্রেন্ডের প্রত্যাশা থাকে। আমি তো সেরকম না। আমার সাজগোজের কোন সেন্স নেই। রুক্ষ, পুরুষালি ধরণের একটা মেয়ে। আমাকে নিয়ে যদি কোন বন্ধুর কাছে গার্লফ্রে- হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়, তাহলে তারা আড়ালে হাসবে। আমার আরো একটা সমস্যা ছিল, আমি নতুন মানুষের সাথে মন খুলে কথা বলতে পারি না। ওর সাথে যত বকবক করে কথা বলতাম, ওর বন্ধুদের সাথে পারতাম না। অনেক মানুষের মধ্যে গেলে নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগত। এটা নিয়ে ওর মনে মনে একটু আফসোস ছিল। আমি বুঝতে পারতাম। ওকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি এই কথা। কিন্তু ও সে কথা স্বীকার করত না। বলত, তুমি যেরকম, সেরকমই থাকো। আমি তোমাকে তোমার মত করে ভালবাসি। সেসব যে কত বড় মিথ্যা সেটা এখন বুঝি।”
বিভু আবার একটা টিস্যু এগিয়ে দিল।
জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, যার সাথে রিলেশন হয়েছে তার উপর কি আপনার রাগ হয়?”
“নাহ, তার উপর কেন রাগ হতে যাবে? সে বেচারীর তো এখানে কিছু করার নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ও মেয়েটার কাছে সব কিছু চেপে গেছে। এমনকি যদি মেয়েটা জেনেও থাকে, তবু আমি মেয়েটার কোন দোষ দেব না। কারণ সম্পর্কটা আমার রাতুলের সাথে, মেয়েটার সাথে না। রাতুলই যদি বিশ্বস্ত না থাকে, তাহলে মেয়েটার কি গরজ আমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকার?”
“হমম্, একটা কথা স্পষ্ট যে, দুজনের কেউই সুখী ছিলেন না। তাই হয়তো ছেলেটা চলে গেছে। সুখী হওয়ার অধিকার তো সবারই আছে, তাই না?”
“খুবই খোঁড়া যুক্তি। পৃথিবীর সমস্ত বহুগামী, অস্থিরচিত্ত মানুষ এই যুক্তিটাই দেখাবে। সুখে থাকার অধিকার তো আমারও ছিল। কই, আমি তো ওকে ছেড়ে সুখের পিছনে ছুটি নি? আমার সামনেরও তো অনেক অপশন ছিল! তবু, আমি তো ধৈর্য ধরে ওর জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছিলাম? ভেবেছিলাম, ওর অফিসের চাপটা কমলে ও ফিরে আসবে, তখন আমরা আমাদের সমস্যাগুলো নিয়ে বসব। সবচেয়ে রুচিহীন ছিল ওর শেষ কথাটা। ও বলেছে, ‘আমি নাকি অনেক দেরি করে ফেলেছি ওর কাছে ফিরে আসতে।’ তার মানে ফিরে আসার ঠেকা শুধু আমার। ওর কোন দায়িত্ব নেই সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার। আচ্ছা, বিভু, আমাদের মা-বাবার সবকিছু কি আমাদের ভাল লাগে? তারপরও কি সেসব মেনে নিয়ে আমরা তাদের সাথে থাকছি না? সন্তানের সব কিছুই কি মা-বাবার ভাল লাগে? কই, মা-বাবা তো সুখে থাকার জন্য সন্তানকে ত্যাগ করে না? আপনি হয়তো বলবেন যে, ওগুলোর সাথে প্রেমের তুলনা চলে না। কিন্তু ও যে আমাকে বারবার করে শুধু বলত, আমি নাকি ওর জীবনে সবচেয়ে বেশি দামী। আমাকে ও সবকিছুর চাইতে বেশি ভালবাসে? এই সব কথা তাহলে মিথ্যা ছিল? শুধুমাত্র প্রেম জমানোর জন্য ও এতগুলো মিথ্যা কথা আমাকে বলে গেছে? আমার একটাই দুঃখ, বিভু, যদি ছেড়েই যাবে, আগে কেন যায় নি? আমার সমস্ত দোষ তো ও আগে থেকেই জানত। কেন আমার জীবনের এতগুলো বছর নষ্ট করে দিল? আমি তো ওর কোন ক্ষতি–”
আর কথা বলতে পারলাম না। কথা বলার সমস্ত শক্তি নি:শেষ হয়ে গেছে। নিজেকে উজাড় করে দিয়ে কাঁদতে থাকলাম। বিভু আবার আরেকটা টিস্যু এগিয়ে দিল। কেমন অসহ্য লাগল এবার ব্যাপারটা। ও তো বুঝতেই পারছে, আমি কাঁদছি। শুধু রোবটের মত তখন থেকে একটা করে প্রশ্ন করে যাচ্ছে আর টিস্যু দিয়ে যাচ্ছে। ওর কি আর কিচ্ছু করার নেই? অল্টারনেটিভ ওয়ার্ল্ডের মানুষগুলোর কি অনুভ’তি বলে কিচ্ছু নেই?
মুখ ফিরিয়ে বিভুর দিকে তাকালাম। দেখলাম, ওর কোলের উপর ব্যবহৃত টিস্যুর একরাশ স্তুপ। বুঝলাম, আমার টিস্যুবক্স এতক্ষণ দু’জোড়া চোখকে সার্ভিস দিয়ে গেছে।
মুখ নিচু করে বসে থাকলাম। হাতের টিস্যুটা ফেলে দিলাম। সমস্ত লজ্জা-দ্বিধা-ভয় ভুলে মনটা উজাড় করে কাঁদতে লাগলাম।

২৫ নভেম্বর, ২০১২
আজকাল আর বিভুকে বেশি ডাকতে হয় না। ডায়েরিটা পাশে থাকলেই ও অনেক সময় নিজে থেকেই আসে। সেদিন জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ এরকম পরিবর্তনের কারণ কী। আগে তো প্ল্যানচেট করে আত্মা নামানোর মত করে ওকে ডাকতে হত। এখন হঠাৎ এত উন্নতি কী কারণে।
ও শুনে হাসল। বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয়, আপনি হয়তো ব্যস্ত আছেন। তাই, ডাকার সময় পাচ্ছেন না। কিন্তু আমি থাকলে আপনার ভাল লাগবে। তাই, যখন তখন চলে আসি।”
বিভুর এই ব্যাপারটা খুব মজার। এ জগতের কোন ছেলে হলে বোধহয় এত সহজে এই উত্তরটা দিত না। হয় একটু রেগে যেত, নাহয় আমাকে আর একটু খেলাত। কিন্তু ও সরলভাবে ওর মনের কথাটা বলে দেয়। তাই, চোখ বন্ধ করে ওর কথার উপর আমি ভরসা করতে পারি।
আজকে রাত বারোটার সময় হঠাৎ আমার কানের কাছে ডি. এল. রায়ের “আজি এসেছি এসেছি বঁধু হে” গানটা বাজিয়ে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। ঘুম ভাঙতেই বলল, “শুভ জন্মদিন!”
জন্মদিনের কথা আমার মনে ছিল। তাই, ইচ্ছে করেই মোবাইল বন্ধ করে ঘুমিয়েছিলাম। মোবাইল খোলা থাকলেই বন্ধুদের ফোন আসত। আর আমি না ঘুমিয়ে কিছ্ক্ষুণ পর পর চমকে চমকে ফোনের স্ক্রীণের দিকে তাকাতাম। সারক্ষণ মনে হত থাকত, বোধহয়, ও ফোন করেছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি ভাল করেই জানি যে, ও কোনভাবেই ফোন করবে না, এমনকি হয়তো ভুলেই গেছে দিনটার কথা।
কিন্তু বিভু মনে রেখেছে। ওর কার্যকলাপ দেখে বোঝা গেল যে, অনেকদিন ধরে ও দিনটা পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে। গান বাজতে থাকল আর ও আমার হাতে একটা গিফ্ট ধরিয়ে দিল। উপনিষদ আর রুমির একটা বই কিনে এনেছে আমার জন্য। বলল, আপনার লাইব্রেরিতে এ দুটো নেই দেখে নিয়ে আসলাম। আরো একটা কী যেন ছিল। প্যাকেটে মোড়ানো। আমি খুলতে গেলাম। ও খুলতে দিল না। বলল, “পরে খুলবেন। এখনো সময় হয় নি।”
আমি আর জোর করলাম না। বই দুটো উল্টে প্রকাশনীর নাম দেখে বললাম, “এটা তো আর অল্টারনেটিভ ওয়ার্ল্ড থেকে আমদানি করা হয় নি। এ জগতের দোকান থেকেই কেনা হয়েছে। টাকা পেলেন কোথায়?”
“আপনার আলমারি থেকে নিয়েছি। আপনাকে বলে নিলে তো আর সারপ্রাইজটা থাকত না। তাই…”
খুব হাসি লাগল। আমার আগে কেউ কোন চোরের উপর এত কৃতজ্ঞ হয়েছে কীনা আমি জানি না। কোন একজনকে বিশেষ সম্মান দিতে গিয়ে আমার নিজের বিশেষত্বটা এতদিন ভুলেই গিয়েছিলাম। আনন্দে চোখে পানি এসে গেল।
বিভু আবার একটা টিস্যু এগিয়ে দিল। আজকে হঠাৎ অনুভব করলাম, বিভু আমাকে কখনো ছোঁয় না। আজ যদি টিস্যু না দিয়ে আঙ্গুল দিয়ে আমার চোখের পানিটা মুছে দিত, আমি বেশি খুশি হতাম। কিন্তু ও তা করল না। অল্টারনেটিভ ওয়ার্ল্ড থেকে এসেছে বলেই কি ওদের মধ্যে স্পর্শের কোন অনুভূতি কাজ করে না? নাকি ইচ্ছেটাকে ও দমন করে রাখে?
“ঋতু, আজ আপনার জন্মদিন। আমি চাই, আপনি আজকের দিনে আপনার অতীতের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হন। আপনি যেটাকে বিচ্ছেদ ভাবছেন সেটা আসলে কোন বিচ্ছেদ না, কোন লস না, সেটা আসলে আপনার মুক্তি, আপনার সৌভাগ্য। মুক্তিটাকে সেলিব্রেট করতে শেখেন।”
আজকে আর আগের দিনের মত অসহায় লাগল না। শান্ত মনে ওর কথা শুনছিলাম। বললাম, “সেটা হয়তো আস্তে আস্তে মেনে নিতে পারব, কিন্তু ও শেষ দিনে অনেক উল্টা পাল্টা যুক্তি দেখিয়েছে। আমার নামে অনেক মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে। ও বলে, আমি নাকি ওকে নিয়ে বন্ধুদের কাছে লজ্জা পেতাম, সম্পর্কটা আমিও নাকি ভাঙতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন শুধুমাত্র জেদের বশে ওকে ফেরত চাচ্ছি। আমরা নাকি ভীষণ অসুখী ছিলাম। অথচ, বিভু, আপনি জানেন কতশত সুখের স্মৃতি আমাদের আছে। বন্ধু হিসেবেও আমরা অনেক ভাল সময় কাটিয়েছি। স্বামী-স্ত্রী হিসেবেও দুজন দুজনকে সাপোর্ট দেওয়ার মত অনেক স্মৃতি আমাদের আছে। কিন্তু সেগুলো ও একটুও স্বীকার করছে না।”
“কেন স্বীকার করবে, ঋতু? স্বীকার করলে তো তার এই সিদ্ধান্তটার কোন ভিত্তিই সে দাঁড় করাতে পারবে না।”
“তবুও বিভু, যার সাথে এতগুলো বছর কাটিয়েছি তার মুখ থেকে মিথ্যে অপবাদ শুনতে খুব কষ্ট হয়। ও বলে, আমি নাকি সারক্ষণ বসের মত আচরণ করেছি ওর সাথে। ও নাকি অনেক চেষ্টা করেছে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভু, যে ছেলেটা কোনদিন আমার কাছে ফিরে আসে নি, সে এরকম অপবাদ কীভাবে দেয়? আমি সারাক্ষণ যার রাগের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম, সে কীভাবে আমাকে বস অপবাদ দেয়?”
“ঋতু, শোনেন। ভাড়াটে খুনীও নিজের অপরাধের পেছনে হাজারটা যুক্তি দাঁড় করাতে পারবে। তাই বলে সেই খুন জায়েজ হয়ে যায় না। ঐ ছেলেটাও এখন তাই করছে। কিন্তু এসব ভেবে আপনার কী লাভ, বলেন তো? সে আপনার সম্পর্কে কি বলল, কী ভাবল- তাতে কি সত্যিই আর কিছু আসে যায়?”
“না।”
“তাহলে? ও যদি আপনাকে ছেড়ে না যেত, আপনি কোনদিন ওকে ছেড়ে যেতে পারতেন না। অথচ আপনাদের ভুল বোঝাবুঝিটাও কোনদিন মিটত না। কারণ যে আপনাকে তিন বছরে বোঝেনি, আপনার মূল্যায়ণ করতে পারে নি, সে সারা জীবনেও পারত না।”
“তাহলে এখন কী করতে বলেন? ওকে ক্ষমা করে দেব?”
“ভুলেও সে চেষ্টা করবেন না। কাওকে ক্ষমা করতে যাওয়া মানে নিজেকে তার চাইতে শ্রেষ্ঠ ভাবা। আপনি তাকে ক্ষমা করার কে? সে আপনার সাথে সুখী হয় নি, তাই অন্যখানে থেকে সুখ খুঁজে নিচ্ছে। তাকে সুখী করার দায়িত্ব এখন আর আপনার না। এখন সেটা ওই মেয়েটার দায়িত্ব। অতএব, আপনি ওকে সিম্পলি নিজের মন থেকে বের করে দেন। সব রকম দায় থেকে রাতুল আপনাকে মুক্ত করে দিয়ে গেছে। চেষ্টা করুন, ওর কাছে কৃতজ্ঞ থাকার।”
চুপ করে থাকলাম। আজকে কথাগুলো মেনে নিতে কোন কষ্ট হল না। রাতুলকে এই মুহুর্তে পেলে সত্যি সত্যি একটা থ্যাংকস দিতাম।

২৬ নভেম্বর, ২০১২
গত দুইমাস মান্থলি চেকআপের জন্য আমি একাই এসেছি। আজ বিভু কিছুতেই আমাকে একা ছাড়ল না। ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। আমার সামনের সারিতেই খুবই সুন্দরী একটা মেয়ে বসে আছে। শুধু সুন্দরী বললে ভুল হবে, চোখেমুখে একটা অন্যরকম আবেদন আছে। আশেপাশে রোগীর সাথে আসা যেসব ছেলেরা অপেক্ষাকৃত কম দু:শ্চিন্তাগ্রস্ত, তারা বারবার মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে। তাদের চোখেমুখে আগ্রহের ছাপ স্পষ্ট। মেয়েরাও না তাকিয়ে থাকতে পারছে না। তাদের দৃষ্টিতেও সমান আগ্রহ, তবে সেটা খানিকটা ঈর্ষামিশ্রিত।
ব্যতিক্রম একমাত্র বিভু। খুবই মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছে। ওকে একটু জ্বালাতে খুব ইচ্ছে হল।
জিজ্ঞেস করলাম, “এ জগতে আসলে তো আমাদের মতই আপনাকেও মশা কামড়ায়, আপনারও ক্ষুধা লাগে। তাহলে এ ব্যাপারে এরকম সাধু সন্ত সেজে থাকার মানে কী?”
“কোন ব্যাপার? বুঝলাম না।”
“পুরো হল মেয়েটাকে হাঁ করে দেখছে। একমাত্র আপনি ছাড়া।”
“ও, এই ব্যাপার! পেট ভরা থাকলে আর অন্য কোন খাবারের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। তা সে যতই লোভনীয় হোক!”
মুখে বললাম, “খুব্ব্ই স্থুল ছিল উপমাটা!” কিন্তু বুকের ভিতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ও কী বলতে চায়?
“সত্যি কথা সোজাসাপটা হওয়াই ভাল। বেশি সূক্ষœ হওয়ার দরকার কী?”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। এখনো জানি না, আমার ভিতরে যে বেড়ে উঠছে সে ছেলে না মেয়ে। আমার সিরিয়াল আসতে এখনো দেরি আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের চারপাশে তাকালাম।
হঠাৎই দেখলাম, কাঁচের দরজার ও পাশে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে আগে কোথায় যেন দেখেছি বলে মনে হল। তার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটার ঘাড় এতক্ষণ ওপাশে ফেরানো ছিল, ছেলেটা এ পাশে মুখ ফেরাতেই বুঝলাম- ওটা রাতুলের ছোট ভাই মৃদুল। মেয়েটাকেও এবার চিনলাম। রাতুলের নতুন গার্লফ্রে-। সেই ইরানী মেয়ে। ফেসবুকে দেখেছিলাম। মেয়েটা আসলেই ভীষণ স্নিগ্ধ। মাথায় ঘিয়ে রঙ্রে একটা স্কার্ফ জড়ানো। গায়ে শর্ট বোরখা। কাঁধের ব্যাগটা বোধহয় দেশালের। মৃদুলের সাথে আরো কয়েকজন ছেলে আছে। কয়েকজনকে আমি চিনি। রাতুলের বন্ধু। দেখে মনে হল, সবাই-ই মেয়েটার পরিচিত। হ্যাঁ, রাতুলের জীবনের জন্যে এই মেয়ে সত্যিই ভীষণ মানানসই। কিন্তু ওরা সবাই দল বেঁধে হাসপাতালে কেন? রাতুলের কিছু হয় নি তো?
বিভুকে বলাতে ও রিসেপশন থেকে খোঁজ এনে দিল। রাতুলের ডেঙ্গু হয়েছে। এখানেই একটা কেবিনে ভর্তি আছে। এখন অবস্থা ভালোর দিকে। একবার ভাবলাম, আমার বোধহয় দেখে আসা উচিত। কিন্তু না, সেটা বোধহয় ঠিক হবে না। আমার যাওয়াটা রাতুল ভাল চোখে দেখবে না। যদি স্বাভাবিকভাবে কথা বলি, তাহলে ও ভাববে, নিজের শক্ত-পোক্ত ইমেজের বিজ্ঞাপন দিতে এসেছি। আবার বলা যায় না, ভেবে ফেলতে পারে যে, আমি এখনো ওর আশা ছাড়ি নি। না, সেটা ভাববে না, আমি নিশ্চিত। আমার শুদ্ধতার বাতিক ও জানে। নতুন রিলেশনশিপের পর ওকে আর কোনভাবেই গ্রহণ করা সম্ভব হবে না, এটা তো ওর চেয়ে ভাল করে কেউ জানে না।
যাহোক, মেয়েটাকে দেখে খুব নিশ্চিন্ত লাগল। রাতুলের পরিচিত বলয়ের মধ্যে ও যেভাবে মিশে গেছে, তাতে ওদের সম্পর্কটার মধ্যে অন্য কোন জটিলতা ঢোকার সুযোগ পাবে না। আমি সত্যিই মুক্ত। কোন মানবিকতার দায়ও আমার আর থাকল না। ভীষণ নির্ভার লাগল নিজেকে।
“চেকআপ করাবেন, নাকি আজ বাড়ি যাবেন?” বিভু জানতে চাইল।
“আজ থাক। ওরা কেউ দেখে ফেললে অহেতুক একটা জটিলতা তৈরি হবে। চলেন, চলে যাই।”
বিভু বাধা দিল না।

১২ ডিসেম্বর, ২০১২ (সন্ধ্যাবেলা)
বিভু আর কোনদিন আসবে না। সেটা অবশ্য আমারি ভুলের কারণে। ডায়েরিটা পাশে রেখে চুলাটা সেদিন ওভাবে জ্বালিয়ে রেখে যাওয়াটা ঠিক হয় নি। কিন্তু ঠিক কী করে যে জিনিসটা গিয়ে চুলার ঠিক মাঝখানে পড়ল, সেটা আমি এখনো ভেবে পাই না।
বিভুকে মিস করি, কিন্তু একাকীত্বের অসহায়ত্বটা এখন আর তেমন চেপে ধরে না। ও আমার পুরনো ‘আমি’টাকে জাগিয়ে দিয়ে গেছে। যে কোন কিছুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর মত মনের জোরটা এখন ফিরে পেয়েছি।
আমার কল্পনায় এখন দুটো স্রোত চলে। একটা আমার শরীরে বেড়ে ওঠা সত্তা, আর একটা হল কল্পনার সমস্ত রঙে রাঙানো বিভু। দুজনের কথা ভাবতে গেলেই আমার মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। এক্ষুনি দুজনকে একসাথে দেখতে ইচ্ছা করে। এক্স-রে করে যদি হার্টের ভেতরটা দেখা যেত, তাহলে নিশ্চয়ই দুজনকেই একসাথে দেখতে পেতাম।
টেবিলের উপরে অনেক জিনিসের স্তুপ হয়ে আছে। জিনিসগুলো গোছাতে শুরু করলাম। তখন র‌্যাপিং পেপারে মোড়া সেই গিফট-টা চোখে পড়ল। একটা সিডি। ড্রাইভে ঢোকাতেই বিভুর কণ্ঠস্বরে বেজে উঠল,
“বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই,
তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই।
সুদূর কোন নদীর ধারে,
গহন কোন বনের ধারে,
গভীর কোন অন্ধকারে,
হতেছ তুমি পার
পরাণসখা বন্ধু হে আমার।”

সামাজিকতার গ্যাঁড়াকলে

গ্রামে এসেছি। নানীবাড়িতে। এখন কিছুদিন কিছু সহজ উষ্ণতা মন ছুঁয়ে যাবে। শহুরে কোলাহল থেকে মুক্ত, আমা্র খুব প্রিয় কিছু মানুষের নিরাপদ সান্নিধ্যে আর প্রশ্রয়ে থাকতে পারব কটা দিন।

কিন্ত, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে।  ঈদের সময় ঘুরতে এলে অনেক সামাজিকতার প্যাড়া আছে। এর বাড়ি যাও। ওর বাড়ি যাও। যদি না যাও, তুমি অসামাজিক, দেমাগী, অমুকের মেয়ের মাটিতে পা পড়ে না। কী যে ভাবে নিজেকে! আরো কত কী!

দাঁতে দাঁতে চেপে সে পর্ব যদি কোনরকমে সারাও যায়, তার পরই আসে মহা এপিসোড। বাড়িতে বেড়াতে আসা লতায় পাতায় সম্পর্কিত আত্মীয়-পরিজনের সাথে কুশল বিনিময় এপিসোড। ‌আমার মায়ের বিশাল পরিবার। আমার একটা জন্ম চলে গেল শুধু কে কী হয়, তাই মনে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে করতে। এর সাথে বোনাস হিসেবে আছে সমগ্র এলাকাবাসী। আমার নানার চেয়ারম্যানির সুবাদে গোটা তল্লাট কোন না কোনভাবে আমাদের আত্মীয়। কখন যে কে কোনদিক দিয়ে কোন প্রশ্ন করে বসবে তার কোন ঠিক নেই। শুরুটা হতে পারে এরকম:

“আমাকে চিনতে পারছ নাকি গো?”

অত্যন্ত রিস্কি প্রশ্ন। ছোটবেলায় শার্লক হোমসগিরি করতে গিয়ে বহুবার ধরা খেতে হয়েছে। ছোটবেলায়, আমার সায়েন্স অব ডিডাকশনগুলো এরকম ছিল-আমার মায়ের জেলার সম্বোধনগুলো হবে নানা-নানী মামা-মামী, অথবা খালা-খালু। অন্য সম্বোধনগুলো সব আমার বাবার জেলার। তো, সায়েন্স অব ডিডাকশনের ফর্মূলা মেনে আমি নিয়ে ফেলি আমার দ্বিতীয় অনুসিদ্ধান্ত। যেহেতু ভদ্রলোকের চুল অনেকটাই কাঁচাপাকা, এবং তিনি আমার মায়ের চেয়ে বয়সে বেশ খানিকটা বড়, অতএব তিনি আমার মামাই হবেন। আমি মুখে যথাসাধ্য ভদ্রতা ফুটিয়ে বলি-মামা! ঠিক তখনি দশদিক প্রকম্পিত করে সবাই সমস্বরে বলে উঠতেন- “পাগলী কী বলে? উনি তোমার ভাইয়া !” বোঝ ঠ্যালা! এই মধ্যবয়সী লোকটি কিনা এক দশ বছরের বালিকার ভাইয়া হয়! বহুবার ঠেকা খেয়ে ইদানীং সৎ থাকার নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।এরকম প্রশ্নের উত্তরে তাই ঘাড়টা দ্বিধার সাথে দুই দিকে দুলিয়ে অস্ফুটে না বলি। একইসাথে মুখে ভদ্রগোছের একটা মহাদু:খপ্রকাশের ভঙ্গিও ফুটিয়ে রাখতে হয়। নইলে, আমার মাকে শুনতে হবে-তার মেয়ে কোন আদব জানে না।

অতিথি আমার মুখময় লেপ্টে থাকা ভদ্রতায় সন্তুষ্ট হয়েছেন কীনা বোঝার আগেই ধেয়ে আসে আরো প্রশ্নবাণ। কী করছ, কোথায় পড়ছ, পড়াশোনা কবে শেষ হল, ও তুমি তাহলে অমুকের সাথে একই ব্যাচ, তমুককে চেন কীনা? (যেন এক ব্যাচের বা জেলার হলেই সবাই সবাইকে চিনতে বাধ্য)  অমুকের ছেলে/মেয়ে তো খুবই ব্রিলিয়ান্ট। n সংখ্যক A+ বা ফার্স্ট ক্লাসে অলংকৃত। উনার পরিচিত সমস্ত ব্রিলিয়ান্টদের জীবনী মুখস্থ না করে কোন উপায় থাকে না তখন।

এরপরের অবশ্যাম্ভাবী প্রশ্নটা হল- কী করছ? আমার উত্তর শুনে তার দ্বিধাহীন মন্তব্য- “কিন্তু সরকারী চাকরি যে করতে হবে ভাইয়া। সরকারী চাকরির একটা আলাদা মর্যাদা। হ্যালোর দাম থাকতে হবে। এসব চাকরিতে বেতন যতই দিক, তোমার তো হ্যালোর দাম নাই। বিসিএসটা দিতেই হবে।”

আমি জানি, সরকারী চাকরির পক্ষে-বিপক্ষে কোনরকম তর্ক এনাদের সাথে করে লাভ নেই। এদের সামনে মার্ক জুকারবার্গকে এনে দাঁড় করিয়ে দিলে তাকেও এরা বিশ্বাস করিয়ে ছাড়বে যে, সে কোন সরকারী চাকরিতে জয়েন না করে নিজের জীবনটা নষ্ট করে ফেলল।

এর পরের প্রশ্নটা আরো মারাত্মক। সে প্রসঙ্গে না যাই। তবে, এই যুগে এসে আমাদের বোঝা উচিত, পৃখিবীর সব দেশে, সব ভাষায় ‘ব্যক্তিগত’ বলে একটা শব্দ আছে। বাংলা ভাষায়ও আছে । শব্দটা আমাদের পরিচিত। মানেটা কী জানা?

সবশেষে বলি, সামাজিকতা, তোমার ক্ষুরে সালাম!