স্বপ্নমঙ্গল (১)

আমি একটা ইন্টারভিউয়ের জন্য তৈরি হচ্ছি। ইন্টারভিউটা ঠিক কী বিষয়ক জানি না। তবে হলে থাকি এবং ইন্টারভিউ যিনি নেবেন, তাকে সবাই খুব ভয় পায়। আর কোনো এক অজানা কারণে ইন্টারভিউটা প্রত্যেকটা হলবাসীর জন্যেই গুরুত্বপূর্ণ।

কয়েক দিন ধরেই ইন্টারভিউ নিয়ে চাপা উত্তেজনা। আমার ভেতরেও টেনশন কাজ করছে। ভদ্রলোক যে ঘরে বসে থাকেন, সে ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ থাকে। উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট কখনো দরজা খুললে বাইরে থেকে উনাকে দেখা যায়। অদ্ভূত সুন্দর একটা চেহারা। টিভিতে হুবুহু এই চেহারার এক অভিনেতাকে দেখেছি। খুব লম্বা – স্বপ্নপুরুষ টাইপ একটা চেহারা।

ভদ্রলোক কী ধরণের প্রশ্ন করতে পারেন? সাইকোলজিক্যাল টেস্ট টাইপ কিছু? আমি যদি কোন উত্তর দিতে না পারি? আচ্ছা, উনার কাছে নিজেকে এত প্রমাণ করার ইচ্ছে হচ্ছেই বা কেন?

আজ হঠাৎ কয়েকটা মেয়েকে তার রুমের বাইরে বসে থাকতে দেখলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার। জানলাম, গতকাল থেকে ইন্টারভিউ শুরু হয়ে গেছে। হায় হায়, আমি রোজ এদিক দিয়ে যাওয়া আসা করছি। আর খোঁজই পেলাম না! আমার সিরিয়াল মিস হয়ে গেছে। আমার পরিচিত একটা মেয়ে ছিল সিরিয়ালের দায়িত্বে। সে বলল, সে আমাকে জানাতে ভুলে গেছে। আরো বলল, আমার ইন্টারভিউ নেয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। একটু অপেক্ষা করতে বলল।

সবাই দেখলাম, মিষ্টি খাচ্ছে। জানতে চাইলাম, কীসের মিষ্টি। জয়ন্তিকা নামে কোন মহিলার জন্মদিনের মিষ্টি। এই মহিলা নাকি ইন্টারভিউয়ারের জীবনের বিশেষ মানুষ। সেই বিশেষ মানুষটার সাথে সমাপ্তিটা মিলনান্তক নয়। সহকারী মেয়েটার চোখেমুখে কেমন একটা জ্বালা। এই লুকটা আমি চিনি। ঈর্ষা আর অক্ষমতার দৃষ্টি।

অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটা যেন কোনদিকে চলে গেল। অন্যরাও সবাই চলে গেল এদিক ওদিক। ব্রেক চলছে। হঠাৎ ভেতর থেকে বেল বেজে উঠল। সহকারী মেয়েটা তো এদিকে নেই! ওর নম্বরটা বের করার চেষ্টা করছি। অমনি বেলটা আবার বেজে উঠল। আমার কি ভেতরে গিয়ে বলা উচিত যে সহকারী এখন নেই? সেটা কি ঠিক হবে? আমার সিরিয়ালটাও তো মিস হয়ে গেছে! ঢোকাটা বোধহয় উচিত হবে না। কিন্তু উনি নিশ্চয়ই কোন প্রয়োজনে ডাকছেন।

আমি ভিতরে গেলাম। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু মুখে আমার দিকে তাকালেন। আমার ভেতরে খুব টেনশন কাজ করছে। উনি আমাকে কী প্রশ্ন করবেন? আমি তার কোন বোকা বোকা উত্তর দিয়ে ফেলব না তো?

উনি আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

আবারও বেল বেজে উঠল। কিন্তু উনি তো বেল বাজান নি। তাহলে?

ওহ্! বেলের শব্দটা এই ঘরের বাইরে থেকে আসছে। আমার ফ্ল্যাটের দরজায় বেল বাজছে। আমার স্বপ্নের পর্দাটা ভেদ করে রিয়্যালিটি ঢুকে পড়ল।

আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার। চোখটা বন্ধ করেই রাখলাম যাতে এই আপাত অপ্রয়োজনীয় রিয়্যালিটি থেকে আবারও ঐ ইন্টারভিউ রুমে ফিরে যেতে পারি। যাওয়া হলো না। চোখের সামনে থেকে ঘরটা মিলিয়ে গেল। জানা হলো না ভদ্রলোক আমাকে কী প্রশ্ন করতেন। আমি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম কীনা তাও জানা হল না। এমনকি ইন্টারভিউটা কীসের তাও জানা হলো না।

জীবনের অসংখ্য অমীমাংসিত প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া আরো একটা প্রশ্ন মাথায় নিয়ে ঘুম ভাঙল।

Advertisements

মুরগির বিবর্তন…

দুপুর থেকে মুখিয়ে আছি মুরগি রাঁধব বলে। বাসায় এসে ডিপফ্রিজে রাখা নানান প্যাকেটের ভিড় থেকে খুঁজে খুঁজে মুরগির প্যাকেটটা বের করলাম। মনটা খুশি। বুদ্ধি করে কলেজের রাঁধুনীকে দিয়ে মুরগিটা কাটিয়ে নিয়েছিলাম। রাঁধুনিই বাজার করেছিল, রাঁধুনিই কেটেছিল। মুরগিটাকে আমি চোখে দেখি নি। চেখে দেখাটাই ছিল লক্ষ্য। তবে প্যাকেটে মাংসের টুকরোগুলো বেশিই বড় মনে হচ্ছিল। নাহ্! রীনা নিশ্চয়ই ফার্মের মুরগি কিনেছে। ওকে এরপর থেকে দেশি মুরগি আনতে বলে দেব। পানির মধ্যে পলিথিনে মোড়া মুরগি ডুবিয়ে রেখে আমি আপুকূলের মুরগি রান্নার ভিডিও দেখতে বসলাম। একটা ভিডিও মুখস্থ করে রান্নাঘরে ফিরলাম। ও মোর খোদা! মুরগি তো দেখি গরু হইয়ে গ্যাছে! শুধুমাত্র পানির সংস্পর্শে এসে জমাটবাঁধা মুরগির মাংস গরুর টুকরো হয়ে যেতে পারে! ডারউইন, কোথায় আছো, একবার এসে এই বিবর্তনের ব্যাখ্যা দিয়ে যাও! যাহোক, আমি নব উদ্যমে গরুর মাংসের রেসিপি সার্চ দিলাম। বিধি বাম। ইন্টারনেট নেই। ডাটা কানেকশন দুব্বল! এই ছিরিনগরে এই মুহূর্তে আমি আর একপাত্র কাঁচা গরুর মাংস- অপার হয়ে বসে আছি। মনে পড়ে গেল সেই হতভাগ্য ছাত্রের কথা যে কীনা গরু রচনা পড়ে গিয়েছিল আর পরীক্ষায় এসেছিল শ্মশানঘাটের বর্ণনা। শেষমেশ বেচারি শ্মশানে গরু বেঁধে গরুর বর্ণনা লিখতে আরম্ভ করেছিল। লোকেশন শ্মশান, বর্ণনা গরুর। আজ আমারও সেই দশা। কড়াইয়ে গরু, রেসিপি মুরগির… 🙄

একটা দীঘির গল্প

আমি যেদিন শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে বাসে উঠি, একটা মানুষ উদগ্রীব হয়ে বাসের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার তাকে বারবার বলা লাগে, “গাড়ি আসছে, এখানে এভাবে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ো না। সরে দাঁড়াও।”
বাসের কন্ডাক্টরকে বারবার করে বলে দেয়, “ওকে শ্রীনগরে নামিয়ে দেবেন। ও শ্রীনগর সরকারি কলেজের ইংরেজির শিক্ষিকা।”
বাসের কন্ডাক্টর বারবার মাথা নাড়ে। “হ্যাঁ, আংকেল, আপনি চিন্তা কইরেন না। আল্লাহ ভরসা।”
আমার এদিকে মেজাজ খারাপ হতে থাকে। কন্ডাক্টরকে এত কথা বলার কী আছে? আমি কোন কলেজের শিক্ষক সেটা জেনে কন্ডাক্টর কী করবে?

গাড়ি একটা টান দেয়। ২/৩ সেকেন্ডের মধ্যে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে প্যাসেঞ্জার নিতে। সেই মানুষটা আবার দ্রুত হেঁটে এসে গাড়িটা ধরে ফেলে। আমার বকুনির কারণে এবার আর জানালার কাছে আসে না। জানালার সোজাসুজি ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে।
গাড়ি একটা পর্যায়ে ছেড়ে দেয়, আর দাঁড়ায় না। একদিন এক ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে, এইটা কে, ম্যাডাম? আপনার আব্বু?” আমি মাথা নাড়ি।
ড্রাইভার একটু হেসে বলে, “তাইতো কই, এত খেয়াল তো আর কেউ রাখবো না!”
অত দূরে থেকে বাবা বুঝতে পারে না। কিন্তু প্রতিদিন আমার গলার কাছটা ধরে আসে। কেমন কান্না পায়। ফুটপাতের উপর দাঁড়ানো মানুষটাকে একটা শিশুর মত মনে হয় – আমাকে যার মা হয়ে উঠতে হবে দিনে দিনে। তার অসীম ভালবাসার খানিকটা ফেরত দিতে হবে।
কতটুকু দিতে পারব? শৈবাল দীঘিকে যতটুকু দিতে পেরেছিল ঠিক ততটুকু।

শুভ বাবা দিবস।

ছেঁড়া দ্বীপ

মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনটা বোধহয় একটা খেলা- পাজল সলভ করার খেলা। সৃষ্টিকর্তা হয়তো আমাদের প্রত্যেককে হাতে একটা করে পাজল পিস দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। সবাই নিজের নিজের পিসটা ঠিক ঠিক জায়গায় রাখতে পারলে হয়তো একটা পুরো ছবি দেখতে পেতাম। কিন্তু সবাই খেলার সুযোগই পায় না। আমরা সবাইকে বোর্ডের ধারে কাছে আসতেই দিই না। ওর জামা ছেঁড়া, ওর হাসিটা একটু কেমন যেন। আমি ওর সাথে খেলি না। ও খেললে আমি খেলব না। অথচ সবারই খেলার কথা ছিল। সবাইকেই একই সৃষ্টিকর্তা পাঠিয়েছেন।

বোধহয়, সুনীলের কোন একটা লেখায় একটা লাইন ছিল। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, ঘাতকেরা গান শোনে কীনা। এরকম প্রশ্ন আমার মনেও জাগত। এরশাদ শিকদার যখন শাহরুখ খানের ‘কয়লা’ মুভিটা দেখত, তখন সে কার পক্ষ নিত? সে-ও কি সাধারণ দর্শকের মত শাহরুখের জয় চাইত নাকি অমরেশ পুরীর জয় চাইত? তার তো অমরেশ পুরীর সাথে নিজেকে আইডেন্টিফাই করার কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এরাও গান গায়, গান শোনে, এরাও মুভি দেখার সময় নায়কের পক্ষ নেয়।

ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকত না। এখনো খুব একটা ঢোকে না।

আমার শুধু মনে হয়, প্রতিটি মানুষ এক একটা চলন্ত উপন্যাস। সে উপন্যাসের পাতায় পাতায় চাপা পড়ে আছে দীর্ঘশ্বাস, আনন্দ, টুকরো টুকরো আকাঙ্ক্ষা। অথচ পুরোটা পড়বার কেউ নেই।

সবাই লিখতে ব্যস্ত। কিন্তু একটা জরুরী কথা কারোর মাথায় থাকে না। আমার উপন্যাসের লেখক আমি একা নই। আরো অসংখ্য মানুষ আছে আমার চারপাশে। তারা সবাই নিজের ডায়ালগ, নিজের অ্যাকশন নিজে হাতে লিখতে চায়। সবচেয়ে মজার কথা হল, অন্যের চরিত্র আর সংলাপটাও আমরা নিজের মত করে লিখতে চাই।

কিন্তু মেলে না। শেষমেশ কারো প্লট কারো সাথে মেলে না। দিনশেষে সবাই এক একটা বিচ্ছিন্ন ছেঁড়া দ্বীপ হয়ে বসে থাকে।

আমার কাজের মাঝে মাঝে…

ভদ্রলোক ফ্লার্টিংকে আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। প্রায়ই দুষ্টুমি করেন। প্রথম প্রথম চিন্তা হত – উনি কি সিরিয়াসলি বলছেন? পরে বুঝে গেলাম ঘায়েল করতে হলে আমাকেও ফিরতি আঘাত করতে হবে- তাহলে উনি থেমে যাবেন।

সেদিন বললেন, কক্সবাজার যাই চলো। আমি ভয় না পেয়ে বললাম, “চলেন, যাই!” এই কল্পনাতীত জবাব শুনে উনি একটু থমকে গেলেন। তারপরই হেসে বললেন, “না, থাক!”

সেদিন আমাকে একটা কাজ দিলেন। শেষ করে জানালাম। উনি বললেন, ঈদে বেড়ালে কোথায় কোথায়?” বললাম, “বেড়াবে কী করে? আপনি তো ডাকলেন না! আপনি ডাকলে ঠিকই যেতাম!”

“এই শোনো, আজেবাজে কথা বোলো না! ডাকলে যে তুমি আসতে না, সেটা খুব ভালো করে জানি!”

ভারি আশ্চর্য লাগল শুনে। আমার বন্ধুস্থানীয় মানুষগুলোর বহুদিন লেগে যায় এই কথাটা বুঝতে। উনি এত দ্রুত বুঝে গেলেন?

উনি মনের কথা বুঝতে পেরেই ও পাশ থেকে বলে উঠলেন, ” আমি মানুষ চরিয়ে খাই।”

আসলেই। একদিকে উনি ভীষণ পেশাদার, অন্যদিকে ভারি স্নেহশীল। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান উনি এবং অত্যন্ত শক্তহাতে সবটা সামলাচ্ছেন।

উনি একজন তারকা ব্যক্তিত্ব। সেকারণেই তার নামটা লিখবো না এখানে।

এই কাজপাগল লোকটার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে আমার।

বাঁধন বিহীন সেই যে বাঁধন…

নির্বাণ লাভ করার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রিয়জন এবং প্রিয় দল- উভয়ের কাছ থেকেই প্রত্যাশামুক্ত হয়ে বসে আছি।
মায়াবন বিহারিনী হরিণী…কেন তারে ধরিবারে করি পণ অকারণ… বাংলাদেশ সমর্থকদের কখনো কখনো এমন দশাই হয়। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নীল হয়ে যাওয়ার কষ্ট কতবার পেতে হয়েছে! তবু স্বপ্ন দেখি। আমার মত কিছু ভীরু সমর্থক আছে যারা খেলা দেখতেও ভয় পায়! যদি আবার বুক ভাঙে। বিগত বছর দুয়েক ধরে, বাংলাদেশের খেলা দেখতে বসলে আমার মিনি হার্ট অ্যাটাক হয় প্রায়ই। আমি আজ খেলা দেখি নি।
নিজেকে সকল প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে চাইলাম। ভেবে দেখলাম, বাংলাদেশের খেলা না দেখে যদি থাকতে পারি, তাহলে নির্বাণ লাভ করতে আর বাকি থাকবে না। কিন্তু হঠাৎই আবিষ্কার করলাম- আমার আঙুল প্রতি ১০ সেকেন্ড অন্তর অন্তর গুগল করছে। আমার বিস্ময় বালকগুলো অসাধারণ স্কোর করছে!

খেলা দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মনে হল, দেখতে বসলে যদি হেরে যায়! আমি খেলা দেখে বহুবার জিতেছে বাংলাদেশ। কিন্তু আজ মাঝপথে দেখতে গেলে যদি ফ্লোটা নষ্ট হয়ে যায়! প্রতিটা বাংলাদেশ সমর্থকদের মনেই বোধহয় একবার হলেও এরকম কুসংস্কার দানা বাঁধে। অনেকের শুভ স্থান থাকে, শুভ চেয়ার থাকে- ওখানে বসে খেলা দেখলে সেদিন বাংলাদেশ জেতে। এই বিরাট পৃথিবীর একটি স্বাধীন দেশের এগারোটা মানুষের স্কিল আর ডেডিকেশনের পাশাপাশি আমার শুভ চেয়ারটাও যেন জয়কে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। কী অদ্ভূত সংস্কার! !

হতবিহ্বল অবস্থায় বসে আছি- হঠাৎ আমার হোয়্যাটসঅ্যাপ টিক টিক করে উঠল। বিজাতীয় ভাষায় মেসেজে লেখা- “বাংলাদেশ টিমের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, আজ একজনের হৃদয়টাকে অক্ষত রাখল বলে।” বলতে ইচ্ছে হল, “ইস্! দল বুঝি আমার একার? তোমার না?” পরে মনে পড়ল, আসলেই তো, এই দল তো ওর নয়। তবু কত খুশি ও! আমার দুঃখে ৩০০০ কিমি দূরে বসেও ছেলেটা প্রতিমূহুর্তের আপডেট রাখল! জয় নিশ্চিত হবার সাথে সাথে আমার সাথে শেয়ার করল।
এবার চোখে পানি এসে গেল। প্রিয় দল এবং প্রিয়জন যখন প্রত্যাশার অতীত কিছু দেয় তখন এভাবেই কান্না পায়। নির্বাণলাভ করা আর হল না। বাঁধন বিহীন সেই বাঁধনে তারা আমায় বাঁধিল…

জ্বরজড়িত জীবন

আমার জ্বর মাপার একটা নিজস্ব থার্মোমিটার আছে মাথার মধ্যে। জ্বর ১০৪ ছাড়ালে আমি দার্শনিক হয়ে উঠি। তখন আমার মনটা ভীষণ আর্দ্র হয়ে ওঠে। আচরণ ভারি ভদ্র নম্র হয়ে যায়। অর্ধচেতন অবস্থায় আমি মানুষজনের কাছে মাফ চাওয়ার কথা ভাবতে থাকি। পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়কারীর গুরুতর অপরাধও মাফ করে দিতে ইচ্ছে হয়।
গতরাতে এইসব লক্ষন একটু একটু দেখা দিতে শুরু করেছিল। বুঝলাম, অবস্থা বেগতিক, জ্বর বেড়ে গেছে। মেপে দেখলাম, ১০৩। অর্থাৎ, দার্শনিক হতে আর অল্প একটু বাকি। রিস্ক নিতে চাইলাম না। কাল জ্বরের তৃতীয় রাত ছিল। অতএব, টুপ করে একটা ওষুধ খেয়ে ফেললাম।
আধা ঘন্টা পর মনে হল, তাবৎ অন্যায়কারীকে কি ক্ষমা করে দেব? নাহ্! এ পৃথিবীতে কে কার! ক্ষমাতে কী আসে যায়?
আমি কি কারোর কাছে ক্ষমা চাইব? এহ্! কোন দুঃখে? যদি কেউ দুঃখ পেয়ে থাকে আমার কাছ থেকে, সেটা কি আর আমার দোষ! আমি তো নিমিত্ত মাত্র!
আমার জাগতিক কুযুক্তি, ইগো যেহেতু আবারো টনটনে হয়ে গেছে, অতএব, জ্বর আপাতত ছেড়ে যাচ্ছে এবং আমি হুঁশে ফিরছি! 😆

অন্তর বুড়োর ভালবাসা কথন

আমার এখন নিবিষ্ট মনে খাতা দেখার কথা। নিয়ত ঠিক করে সামনে খাতা ছড়িয়ে বসলাম্ও।নিয়তকে আরো মজবুত করতে ফেসবুক খুললাম- লগ আউট করার জন্য। নোটিফিকশনের কারণে যাতে আমি কিছুতেই লক্ষ্যচ্যুত না হই। সেকালে ধ্যানভঙ্গের জন্য ছিল রম্ভা, মেনকা আর এ কালে আছে ফেসবুক!
লগ আউট বাটন খুঁজে পা্ওয়ার আগেই হোমপেইজে চোখ আটকে গেল। স্ত্রী-পুত্রকে কোলে-কাখে-পাশে নানাভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিয়ে একটি হাস্যেজ্জ্বল ভদ্রলোকের ছবি। দেখে যেন মনে হল চিনি উহারে। ঠাহর করে দেখলাম- তিনি আমার এক সময়ের ক্রাশ! কিন্তু হায়! এ কী চেহারা উনার! আমার স্মৃতিতে এখনো ভাসছে একটা লম্বা, স্বপ্নীল চেহারা। কপালের অনেকটা অংশ ঢাকা থাকত চুল দিয়ে। চুলগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে, সে জায়গা জুড়ে একটি বিস্তৃত টাক!

উনার স্ত্রী-সন্তানকে দেখে আমার তো ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে যা্ওয়ার কথা! কিন্তু কই! ভদ্রমহিলার জন্য বরং গভীর সমবেদনা অনুভব করলাম। এই টেকো লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে হাসিমুখে পোজ দিতে হচ্ছে!

ঠিক সেই মুহুর্তে পিড়িং করে একটা শব্দ হল। না, ফেসবুক থেকে আসে নি শব্দটা। শব্দটা আসলো আমার অন্তরের গহীনতম প্রদেশ থেকে। অন্তরবুড়ো কমেন্ট করেছে! বলছে, “ঐ লোকের স্ত্রীকে সমবেদনা জানানোর তুমি কে? তোমাকে কে বলেছে যে মহিলার কোন অনুতাপ আছে তার স্বামীকে নিয়ে?”

“অনুতাপ থাকবে না কেন? আমার এত বছরের আকর্ষণ এক মুহুর্তে পালাল এই টেকো চেহারা দেখে! আর ঐ মহিলাকে তো রোজ এই ভুঁডিওয়ালা টেকো লোকটাকে নিয়ে কাটাতে হয়! আমার তো করুণা হচ্ছে দুজনার জন্য”

বুড়ো হা হা করে হাসল আমার কথা শুনে। আমার গা জ্বলে গেলে সেই হাসি শুনে। বুড়ো কোন পণ্ডিতিমূলক বক্তৃতা দেওয়ার আগে এরকম একটা হাসি হাসে।

“তোমার আকর্ষণ পালাল কারণ তোমার কোন স্মৃতি নেই লোকটার সাথে! মানুষ হিসেবে সে কেমন তুমি জান না। তোমার স্মৃতিতে শুধু টুকরো টুকরো কয়েকটা ছবি ভাসে- করিডোর দিযে তার হেঁটে যাওয়া। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তুমি দেখতে পেতে যে রিকশায় করে সে বই পড়তে পড়তে যাচ্ছে! এই তো তোমার স্মৃতি!তার সাথে জীবনে তোমার কখনো কথা হয় নি। তার পুরো নামটা্ও তো তুমি জানতে না! তাই ফেসবুকে সার্চ দিয়ে তো তুমি তো তাকে কখনোই খুঁজে বের করতে পারো নি! তাই বলছি, তুমি তাকে কোনদিন ভালবাস নি!”

“কী বল, বুড়ো? ভালবাসি নি? উনাকে দেখলেই আমার হার্টবিট বেড়ে যেত! কেমন একটা শিহরণ জাগত ভিতরে! স্বপ্নীল চেহারার সেই ছেলেটার উপর আমার প্রচণ্ড আকর্ষণ ছিল!”

“ঠিক বলেছ। আকর্ষণ ছিল। মুগ্ধতা ছিল। কিন্ত ওটা ভালবাসা ছিল না। ভালবাসা কখনো শিহরণে, উত্তেজনায় আটকে থাকে না। প্রথম পর্যায়ে এই ব্যাপারগুলো থাকল্ওে মুগ্ধতাটা ভালবাসায় রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার পর সেখনে শিহরণের জায়গায় শান্তি আসে।

অনেক সময় এমনও হয়, যাকে ভালবাসছ তাকে মিস করছ কিন্তু সে বাড়িতে আসার পর হয়তো সে নিজের মনে কাজ করে বেড়াচ্ছে, তুমিও আর এক ঘরে ব্যস্ত আছ নিজের কাজ নিয়ে। কিন্তু সে যে বাড়িতে আছে-এটুকুই তোমার জন্য বিরাট শান্তির কারণ। ভালবাসা মানে দুজন দুজনের দিকে রূপমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা নয়। ভালবাসা হল একসাথে স্মৃতির পাহাড় গড়ে তোলা, দুজন দুজনের দুর্বলতার সহায় হ্ওয়া।”
আমার বিরক্তি আরো একটু বেড়ে গেল। বুড়োর কথা যখন খন্ডন করতে না পারি তখন আমার এরকম হয়। মনে হয়, বুড়ো কখন থামবে।
বুড়ো বুঝতে পারল। একটু হেসে বলল, “সেই গল্পটা মনে আছে?এক মধ্যবয়সী মহিলা স্বামীকে মুগ্ধ করতে এক ফোটো এডিটরকে দিয়ে নিজের ন্যুড এডিট করিয়েছিল? সেই ন্যুডটা একদম নিখুঁত করে এডিট করা ছিল। কিন্তু তার স্বামী খুশি হ্ওয়ার বদলে ভীষণ মন খারাপ করেছিল।

ফটো এডিটরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল, ‘আমার স্ত্রীর শরীরটা এডিট করতে গিয়ে আপনি তার শরীরে সন্তানধারণের দাগটা্ও মুছে দিয়েছেন। আপনি আসলে দাগ মোছেন নি, আমাদের সন্তানটাকে সে নয় মাস ধরে শরীরে লালন করেছে, সেই স্মৃতিচিহ্নটাকেই মুছে দিয়েছেন।ওর মুখের বলিরেখা মুছে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমরা দুজন কতগুলো বছর একসাথে কাটিয়েছি, সেই সময়ের চিহ্নটাকে মুছে দিয়েছেন। এটা আসলে আপনার দোষ না। এটা আমারই দোষ যে আমি তাকে আমার ভালবাসাটা বোঝাতে পারি নি। আর তাই, তাকে আপনার দ্বারস্থ হতে হয়েছে আমাকে মুগ্ধ করার জন্য।’”
“বুঝলাম। ভালবাসা তখনি হয় যখন সেটা মুগ্ধতা ছাপিয়ে পরম নির্ভরতায় পৌঁছায়।”
“এই তো। এবার বুঝেছ। তবে তার মানে এই না যে ঐ একই সম্পর্কের মধ্য কখনো মুগ্ধতা আসবে না। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে মুগ্ধতা, শিহরণ বা উত্তেজনাই সম্পর্কের চরমতম লক্ষ্য নয়। উত্তেজনার জন্য তো মানুষ ড্রাগ নিলেই পারে। ভালবাসা তো কোন নেশা নয়।

ভালবাসা হল আমাদের আবেগ অনুভূতি, দুর্বলতা, সবলতাকে নিরাপদে রাখার মত একটা আশ্রয়স্থল। যে সেই আশ্রয়টা দিতে পারে, তার সাথেই ভালবাসা হয়। অনেক মানুষ উত্তেজনা আর শিহরণকে ভালবাসার লক্ষণ ভেবে একটার একটার পর একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে কিন্তু শান্তি পায় না।”

এইসব বয়ান শুনতে শুনতে দেখলাম, রাত অনেক হয়েছে। ক্রাশের চেহারার উপর তো অনেক আগেই অরুচি ধরেছে এবার নিজের শ্রবণশক্তির উপরও বিতৃষ্ণা এসে গেল। বুড়োর ভালবাসা ব্যাখ্যান আমার মাথায় বিশেষ না ঢুকলেও এটা বুঝলাম যে আমার খাতা দেখার কাজ সারা। বাসের মধ্য দেখতে গেলে তো আবার ফেসবুকে ভাইরাল আপা হয়ে যেতে হবে। যাক, কাল সকালে কলেজে গিয়েই দেখব।

এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুমের মধ্যেও, স্বপ্নের ঘোরেও ব্যাকগ্রাউন্ডে বুড়োর বকবকানি ভেসে আসতে থাকল। ইস! কোথা্ও যদি একটা অফ্ বাটন থাকত বুড়োকে থামানোর! সেই অমোঘ অফ্ বাটনের নাম বোধহয় আমার মৃত্যু! এর আগে বুড়ো থামবে না।

জীবন যখন সরকারি সম্পত্তি

আজ থেকে ঠিক পাঁচ মাস আগে আমার আন্তরিক অনিচ্ছাসত্ত্বেও জীবনটা সরকারের সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল। ব্যাপক অর্থে, প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের সম্পত্তি বা সম্পদ। কিন্ত অন্য কোন নাগরিকের হাতে মোটা মোটা পাঁচ/ছয়টা বিধি-বিধানের বই তুলে দিয়ে তা মুখস্থ করতে বলা হয় না। সরকারি কর্মচারীকে এক একটা থান ইটের মতন বই মুখস্থ করে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়। সেসব বইয়ের পাতায় পাতায় থাকে “কী করিলে কী হইবে” শীর্ষক নীতিমালা। অপরাধের সাথে পরিচয় হওয়ার আগেই সেসব অপরাধের দণ্ড মুখস্থ করে ফেলতে হয়।
ভাবতে বসলাম, এই পাঁচ মাসে আমার অনুভূতি কী? অনুভূতি অবশ্যই মিশ্র। তবে শ্রেষ্ঠ অনুভূতিটা হয় প্রতিদিন সকালবেলায়। কানে জাতীয় সংগীতের সুর ভেসে আসার সাথে সাথে প্রত্যেকে যে যেখানে থাকে দাঁড়িয়ে যায়। এই রীতিটা আগে কখনো কর্মস্থলে অণুসরণ করতে হয় নি। এখন করি। অত্যন্ত পবিত্র একটা অনুভূতি হয় তখন।
যা কিছু নথিপত্র নাড়াচাড়া করি, তা বেশিরভাগই বাংলায়। অদ্ভূত অদ্ভূত সব বাংলা শব্দ শুনেছি কয় মাসে- পরিপত্র, অনুবেদন, প্রেষণ, ভবিষ্য তহবিল ইত্যাদি ইত্যাদি অসংখ্য শব্দ। এসব শব্দের সংজ্ঞার্থ মুখস্থ করতে মেলা দিন লেগে যাবে। কারণ আমি একটি সর্বজনস্বীকৃত টিউব লাইট। তবু, শিখতে দেরি হলেও বাংলার এই বহুল ব্যবহার দেখে ভাল লাগে। বাংলা শব্দগুচ্ছের এতখানি ব্যবহার দেখতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। বিদেশী সংস্থায় ছিলাম বলেই হয়তো ব্যাপারটা আমার বেশি করে চোখে পড়ে।
এ পৃথিবীর সকল ভাষা-ভাষী তার নিজের মাতৃভাষায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পাক। ভাষার মাসে এবং জীবনের সরকারিকরণের পাঁচ মাস পূর্তিতে এটাই আমার কামনা।
ও হ্যাঁ, আগের অফিসকে মিস করি কী না? সে প্রশ্নের উত্তর আজ আর না দেওয়াই সঙ্গত। কে না জানে, বিয়ে করে প্রাক্তনের গুণ গাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অতএব, সেসব থাকুক আমার অন্তরের গহীনতম প্রদেশে। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

সূর্য এবং নৈঃশব্দ্যের গান…

“Hello darkness, my old friend” গানটা শুনতে শুনতে যাচ্ছি। অথচ এখন ঝকঝকে সকালবেলা। চোখের সামনে লাল সূর্য! কিন্তু গানটার সাথে আমার চারপাশের কী যেন একটা মিল আছে! আমার চোখের সামনে একটা নতুন দিন শুরু হচ্ছে। আমার কানে বেশ শান্ত স্বরে একটা নতুন রিয়ালাইজেশনের কথা বলা হচ্ছে।

চোখের সামনে সূর্যটা একটু একটু করে ফিকে হচ্ছে। গাঢ় লালটা আস্তে আস্তে কমলা হয়ে গেল। চারপাশ যত উজ্জ্বল হয়, সূর্যের টকটকে ভাবটা তত কমে। আজই প্রথম খেয়াল করলাম, চারপাশকে উজ্জ্বল করতে গিয়ে সূর্য নিজের রং, সৌন্দর্য কমাতে বাধ্য হয়। দুপুর রোদের সূর্যটা তো জ্বলতে জ্বলতে প্রায় সাদাটে হয়ে থাকে। অনেকটা প্রৌঢ় জীবনের মতন। সবাইকে সার্ভিস দিতে দিতে আমাদের মা-বাবারা যেমন নিজের রংটা হারিয়ে ফেলেন। তারপর বার্ধক্যে আবার রং ফিরতে থাকে শৈশবের মত। মানুষ যেমন বুড়ো হলে শিশুর মত হয়ে যায়, সূর্যটাও তেমনি সূর্যাস্তের আগ দিয়ে সূর্যোদয়ের রঙ গায়ে জড়িয়ে ডুবে যায়। পূর্ণ একটা জীবনকাল কাটালে মানুষও আবারও তার দ্বিতীয় শৈশবে ফিরে যায়। বার্ধক্যের সময়টাতে সেও শিশুর মত আচরণ করতে থাকে।

এটা একটা নতুন উপলব্ধি। এই একই সূর্য এর আগে বহুবার দেখেছি। কিন্তু এই ভাবনাটা এর আগে কখনো মাথায় আসে নি। অর্থাৎ, সূর্যটার দিকে তাকিয়েছি, কিন্তু দেখি নি কোনদিন। গানের মধ্যেও অনেকটা একই কথা বলা হচ্ছে। People talking without speaking; People hear without listening…

মানুষের ক্ষেত্রেও বোধহয় এমনটা হয়। দিনের পর দিন যাকে পরিচিত বলে জানছি, তাকে একদিন হঠাৎ অন্যরকম লাগে। সঠিক মুহূর্তে সঠিক আলোতে মানুষটার অন্য একটা পরিচয় পাওয়া যায়। অস্তিত্ব নাড়িয়ে দেওয়ার মত পরিচয়।

অস্তিত্ব নাড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তে বুকের মধ্যে একটা সূর্যোদয় হয়। কখনো হয়তো সূর্যাস্ত হয়। কিন্তু সূর্য উঠুক বা ডুবুক, উপলব্ধির পরমুহূর্তে পৃথিবীটা আর আগের মত থাকে না।

‘ভাইয়া’র স্বজনেরা

সৃষ্টিকর্তা বড় খেয়ালী। যেটা যেখানে দেওয়ার কথা সেটা সেখানে দেন না। উনি সারপ্রাইজ দিতে ভালবাসেন!

আজ বিকালে নিচতলা থেকে বাসার লিফটে উঠলাম। আমার সাথে একটা আট/নয় বছর বয়সী মেয়েও উঠল।

লিফটে উঠেই বড় বড় চোখ মেলে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কয় তলায় থাকেন?” কোন এক অদ্ভুত নিয়মে সব বাচ্চা মেয়ের চোখ বড় বড় হয় । পরিষ্কার শাদা চোখে গভীর কাল দুটো মণি থাকে। তবে চাইনিজ আর জাপানিরা এই হিসেবের বাইরে। ওরা আমার কাছে অতি বিস্ময়ের বস্তু। যেখানে চোখ থাকার কথা, সেখানে আছে একটা করে কাল আড়াআড়ি দাগ। দু পাশে দুটো দাগ। এই দিয়ে তারা কী করে দুনিয়া দেখে আমি ভেবে পাই নি। অবশ্য দাগ থেকে যে ভাল কিছু হয় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্টিভ ওয়াহ। চোখের জায়গায় তারও শুধু দুটো দাগ। কিন্তু সেই দাগের মধ্যে দিয়ে তাকিয়েই তিনি পুরো মাঠ দেখে ফিল্ডিং সাজাতেন, অধিনায়কত্ব করতেন। আমি আমার নাকের দুপাশে দুটো জানালা নিয়ে বসে আছি। তবু হাতের মোবাইল হাতে রেখে খুঁজে বেড়াই। আর স্টিভ ওয়াহ তার নাকের দুপাশের ভেন্টিলেটর দিয়ে তাকিয়েই বিশ্বজয় করে গেছেন।

যে দৃষ্টিশক্তি আমার ঢাউস মণিতে থাকার কথা, তা ছিল স্টিভ ওয়াহর দাগের আড়ালে। কারণ সৃষ্টিকর্তা সারপ্রাইজ দিতে ভালবাসেন।

যাহোক, আবার লিফটে ফিরি-যেখানে আমার মায়াবী বিশালাক্ষী মেয়েটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় চোখের বাচ্চা মেয়েদের প্রতি আমার অদ্ভুত একটা ভাল লাগা কাজ করে। বললাম, আমি পাঁচতলায় যাব। মেয়ে বলল, ‘ওটা কি আপনার নিজের বাসা?” আমার সাইজের সাথে কি মালিকানা ম্যাচ করছে না? বাসা তো যথেষ্ট ছোট-আমার সাইজের তুলনায়ও বেশ ছোট! হেসে বললাম, “হ্যাঁ, ওটা আমার নিজের বাসা।” এবার বলল, “আপনি কার সাথে থাকেন?” হাসি চেপে বললাম, “আমি আমার মা-বাবার সাথে থাকি।”

ওর প্রশ্নের ধরণ বেশ প্রশংসনীয়। দুটো প্রশ্ন করে আমার সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটো তথ্য সে আদায় করে ফেলেছে- আমি ওই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক কীনা এবং আমার বৈবাহিক অবস্থা কী।

এই বাচ্চার ঘটে যেটুকু বুদ্ধি আছে, যেটুকু ভদ্রতাবোধ আছে, তা আমার চির অপরিচিত ‘ভাইয়া’র প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয়-স্বজনের নেই। রাস্তা-ঘাটে, বাসে প্রায়ই সেই নাম না জানা ‘ভাইয়া’-র আত্মীয়-স্বজনের সাথে আমার দেখা হয়। দু একটা কথার পরেই তারা জানতে চান, “ভাইয়া কী করেন?” বলতে ইচ্ছে হয়, “আপনার ভাইয়া কী করেন, তা আপনিই ভাল জানেন, আপু। আমি কী করে জানব তার ঠিকুজি কুষ্ঠি? তার সাথে পরিচিত হবার কোন পরিকল্পনা আমার নেই।”

ফাইন, জানতে ইচ্ছে হয়েছে- আমি বিবাহিত কী না। প্রথম কথা, এত অল্প পরিচয়ে এত ব্যক্তিগত প্রশ্ন আপনি করবেন কেন? আর করবেনই যদি, এত ঘুরপথে জিজ্ঞেস করবেন কেন? সরাসরি জিজ্ঞেস করেন! এত আত্মীয়তা পাতানোর দরকার তো নাই!

সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট মানুষ বড় বিচিত্র জীব! আর বাঙালি বিচিত্রতম!

Magic Diary (Part 1)

November 14, 2012

Bibhu is no one of this world, but his power of analysis and feelings make me think that he too is a human being of flesh and blood like us. Nothing is needed to say to him, he understands by himself. This morning, when sitting in the dining table I was drinking coffee that he made for me, and then he told a very strange thing.

“Ritu,” putting his coffee mug on the table Bibhu asked me, ” I don’t know why it seems to me that you are getting pleasure by harboring a pain within yourself, isn’t it? ” An air of all- knowing psychologist was seen on his face.

“All these are nonsense. Why should I harbor a pain, why? Am I a poet or a beggar to sell my pain to live on?” His words annoyed me so much that I could not help being a little rude.

“Ah, a brilliant metaphor! But this so direct one, I am sure, will extremely enrage the poets.” Saying this, he burst into great laughter.

His laughter always sounds a little different, and pleasing to mind.

“Leave it, man! No one will mind it if he has a little sense of humor. And if he is a real poet, undoubtedly he won’t mind. However, let’s come to the main point, why do you think that I harbor pain within me?”

“It’s true not only for you, but for many others also. When an accident happens in a man’s life, he tries to ignore it, he cannot accept, and then all his mind and heart cry out together saying ‘no, it can’t be. And it ‘s, in the moment of affliction, the first reaction of every human being.”

” What’s the second reaction?”

“Anger. When a man gets into affliction, he becomes angry with the person who causes it, but if there’s no one to blame straightway, then his anger falls on God. Thus men get satisfaction by putting all blames on the poor Creator”.

I could realize very well that every word of these is true to my nature, though I did not tell it. Trying to show indifference in my tone as far as practicable, I asked,” Is it so, then what happens?”

“Then comes the most difficult moment. ” He said,” That means, the moment of taking decision. Some people decide to forget his pains, and find out various strategies as well to keep themselves away from their pains. But some become adamant and ponder over it day and night, all the time, with reason and without reason. This brings to them a feeling of sweet pain. When mosquito bites and if one presses with finger, he gets a feeling, and this is much of like that. You feel pain, but a little pressure on it gives a pleasure as well”.

This amused me much. “You did never experience mosquito bite, then how could you know this? Is there mosquito in your world?” I asked.

“When I come to your house, mosquitoes then bite me! You never use mosquito-coil”.

“Yes, because it burns my eyes, but do you think that to have that painful-sweet feeling I persistently have borne that mishap in mind?”

“No, your case is a little bit different. You want to forget, and yet you don’t do. I’ll make it clear to you in another day, for you need to get ready to go to your office.”

“Disgusting! The suspense is like the situation of a mega serial drama!”

Bibhu smiled a bit and got out of the room.

(To be continued)

এই শুনছ?

সাতসকালে একটা প্রেমপত্র লেখার অফার পেলাম। এক গুরুজন বুদ্ধিটা দিলেন। প্রাপকের নাম শুনে লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। কারণ সেই প্রাপককে আমি বহু বছর ধরে ভালবাসি। কিন্তু সময় করে কখনো তাকে বলা হয় নি।
যারা ইতমধ্যে ভ্রু কুঁচকেছেন তাদের বলছি- বিনা দ্বিধায় পড়তে পারেন। যে বয়সেরই হোন না কেন, যে সম্পর্কেরই হোন না কেন। আপনাদের লজ্জায় ফেলে দেবার মত কিছু আমি লিখি নি।
তুলে দিচ্ছি আমার জীবনে লেখা ভালবাসার প্রথম চিঠি।

” তোমার জন্য একটা সম্বোধন বের করতেই এত সময় লেগে যাচ্ছে! যে শব্দগুলো মাথায় আসছে, তার একটাও তোমার জন্য যথেষ্ট না। প্রিয়তম বলব? না, ওটা ভীষণ সেকেলে। বহু মানুষের যথেচ্ছ ব্যবহারে ওর আসল উষ্নতা কবেই চলে গেছে। ‘প্রিয়তম’ শব্দটার হাল অনেকটা জুড়িয়ে যাওয় চায়ের মত- দুধ, চিনি, চা- সবক’টা উপাদানই তাতে বিদ্যমান। কিন্তু উষ্নতার অনুপস্থিতির কারণে জিনিসটার কোন আবেদন আর নেই। তাই, সম্বোধন বরং থাক। ওটা বাদ দিয়েই শুরু হোক আমাদের কথা।
ভেবেছিলাম, তুমি আমার কাছে কী- সে কথা যদি বলতে শুরু করি, তাহলে হয়ত কথা ফুরোবে না। কিন্তু না, সেকথাও তো শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে। কারণ এমন একটা কথা আমার নেই যা তুমি জান না। এমন হলে কি চলে, বল? তাহলে কি কথা বলে সুখ আছে? কিন্তু বহুদিন ধরে তোমার সাথে সাথে াকতে থাকতে এও বুঝেছি, এই জানাটাই তোমার সাথে আমার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য, সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
পৃথিবীর আর সমস্ত সম্পর্কে অতি পরিচয়ের গ্লানি আছে, একঘেয়েমির আশঙ্কা আছে। দুজন দুজনকে বেশি করে জানলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার ভয় আছে। কিন্তু তুমি এত সৃষ্টিছাড়া, এত বিচিত্র যে সেসবের বালাই তোমার নেই। আমার প্রতিটি কোষ, প্রতিটি রক্তবিন্দু তোমার পরিচিত বলেই আমি এত বেশি করে তোমার। আমাকে এত বেশি জান বলেই আমার প্রতি বিরক্ত হবার কোন সম্ভাবনাই আর নেই। নিজেকে পুরোপুরি, জানার পরেও নিজের প্রতি টান মানুষের যায় না, ঠিক সেইভাবে আমাকে পুরোপুরি জেনেও তুমি সমান মনোযোগ দিয়ে আমাকে ভালবেসে যাচ্ছ।
আচ্ছা, আমি তোমাকে কীভাবে ভালবাসি? এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা তুমি। আমাকেও তো তুমিই সৃষ্টি করেছ। এত সৃষ্টির ভিড়েও তুমি আমার মত অযোগ্য সৃষ্টির সমস্ত খুঁটিনাটি লক্ষ্য রাখ। এত অবাধ্যতার পরেও তুমি আমার প্রার্থনার উত্তর দিয়েছ। আমাকে শুধরে দিচ্ছ। আমার যন্ত্রণার মুহুর্তগুলোতে আমার পরম আশ্রয় হবার জন্য ধন্যবাদ। আমি না বললেও প্রতিটা মুহুর্ত পাশে থাকবে জানি।
ইতি, তোমারই শ্যামা।

শেক্সপীয়র এবং নারীবাদ প্রসঙ্গ– সুস্মিতা শ্যামা

শেক্সপীয়র নামটি এবং নারীবাদ মতবাদটি কোনভাবেই সমবয়স্ক নয়। তাই এদুটো শব্দ একসাথে দেখলে একটু বিভ্রান্তিকর মনে হতেই পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভাবের জন্ম ভাষার আগেই হয়। তাই ‘সুন্দর’-কে সুন্দর বলে ডাকতে শেখার আগেই সদ্যজাত শিশু তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা রাখে। ঠিক তেমনি করে, নারীবাদ মতবাদটি বিকশিত হওয়ার বহু আগেই, শেক্সপীয়রের বিভিন্ন লেখায় এর নিদর্শন দেখতে পাওয়া গেছে। তবে “অ্যাজ ইউ লাইক ইট”, “দি মাচের্ণ্ট অব ভেনিস” এবং “ম্যাকবেথ”-এ এই ইস্যুগুলোর উপর তুলনামূলক বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে “অ্যাজ ইউ লাইক ইট”-এর কথাই ধরা যাক। এখানে নায়িকা রোজালিণ্ডকে নায়ক অর‌ল্যাণ্ডো দেখেছে সৌন্দর্যের প্রতিভূ হিসেবে। যত কবিতা নায়ক লিখেছে, যত প্রশংসাই সে করেছে রোজালিণ্ডের, তাতে কোথাও নায়িকার বৌদ্ধিক সামর্থ নিয়ে একটা লাইনও লেখা হয় নি। কারণ ‘প্রেমিকা’ নামক এই রমণীয় জীবটির যে বুদ্ধি নামক কোন বস্তু থাকতে পারে তা বেচারা নায়ক তার ঘোর দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করে নি। তাই, প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার পরে, অর‌ল্যাণ্ডোর অভিব্যক্তি ছিল এরকম-“O poor Orlando! Thou art overthrown/Or Charles or something weaker masters thee” অর্থাৎ এতবড় কুস্তিগীর চার্লসকে হারিয়েও তার চেয়ে ঢের দুর্বল এক শক্তির কাছে তাকে হেরে যেতে হল, সেই দুঃখেই বেচারা কাতর। এখন পর্যন্ত সে শুধু রোজালিণ্ডের রূপটাই দেখেছে । তার মনের পরিচয় তখনো পায় নি বলেই সে তখনো জানে না, আরো কী কী হার তার কপালে অপেক্ষা করে আছে।
নাটকটি যাদের পড়া আছে, তাদের নিশ্চয়্ই এতক্ষণে মনে পড়ে গেছে যে, অরল্যাণ্ডোর কী দশা করেছিল পুরুষবেশী রোজালিণ্ড। মেয়ের পরিচয়ে বাইরে গেলে বিপদের আশঙ্কা। তাই, রোজালিণ্ড পুরুষের বেশে গ্যানিমিড নাম নিয়ে বনে এসেছিল। আর সেখানে গোটা বনটাই তখন চলছিল তার অঙ্গুলিহেলনে। অরল্যান্ডো রোজালিন্ডকে না পেয়ে গ্যানিমিডের প্ররোচনায় তাকেই রোজালিন্ড কল্পনা করে মনের কথাগুলো অকাতরে প্রকাশ করে যাচ্ছিল। আর রোজালিন্ডও নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে অরল্যান্ডোর প্রকৃত মনোভাব যাচাই করে নিচ্ছিল। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, অর‌ল্যান্ডো যখন দুঃখ ভুলতে গ্যানিমিডকে রোজালিণ্ড ভেবে প্রেম নিবেদন করছিল, তখন ছদ্মবেশী রোজালিণ্ড তাকে বারবার মেয়েদের অস্থিরচিত্ততা, সংসারজীবনের জটিলতা, পুরুষের ভালবাসার অসারতা নিয়ে সাবধান করে দিচ্ছিল। এই ডায়ালগগুলোর মধ্য দিয়ে রোজালিণ্ডের নিরপেক্ষ জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে। সে নিজে মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তার স্বজাতির দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে পুরো মাত্রায় সচেতন। এই স্বচ্ছ চিন্তাপদ্ধতির কারণেই সে গোটা নাটকের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
এরপর আসে মার্চেণ্ট অব ভেনিসের কথা। এখানেও নায়িকার অনেক বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ আছে। কিন্তু এখানে নায়িকা পোর্শিয়া প্রত্যক্ষভাবেই ত্রাতার ভূমিকায় দেখা দিয়েছে। বাঘা বাঘা নামজাদা লোকজন যে মামলাটা নিয়ে তোলপাড় করে ফেলল কিন্তু কোন সুরাহা করতে পারল না, পোর্শিয়া এক নিমেষে তার সমাধান করে ফেলল তার কমন সেন্স দিয়ে। এখন প্রশ্ন হল, এতগুলো ছেলে থাকতে ঘরে থাকা একটা মেয়েকে দিয়ে এই সমাধান নাট্যকার কেন দেওয়ালেন? কারণ আর কিছুই না, কারণ হল সংকীর্ণতায় ঘা দেওয়া। সমাজ একটা মেয়ের মুখ থেকে এতখানি বুদ্ধিদীপ্ত জেরা আশা করে না, এমনকি আদালত কক্ষে তার ঢোকারও কোন অনুমতি নেই। তাই পোর্শিয়াকে পুরুষের ছদ্মবেশে সেখানে ঢুকতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত, তার স্বামী বাসানিও-র কাছ থেকে পুরস্কার হিসেবে আংটি নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এবং সেই আংটি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রথমবারে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল। কিন্তু সমালোচকেরা এই দৃশ্যটির কয়েকটি অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমটি হল, ইহুদী শাইলকের বিচার দৃশ্য দিয়ে নাটক শেষ হয়ে গেলে নাটকের করুণ পরিণতির কারণে ভারি মন নিয়ে দর্শককে বাড়ি ফিরতে হত। আর ইহুদীর দুঃখ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি খ্রীষ্টান দর্শকেরা মেনে নিতে পারত না। সে কারণেই এই দৃশ্যটি কমিক রিলিফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর একটি ব্যাখ্যা আছে। পোর্শিয়া বাসানিও-কে আংটিটি আমৃত্যু আঙুলে রাখার শপথ করিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু বাসানিও বন্ধুর মামলা জেতার আনন্দে প্রতিশ্রুতি ভুলে উকিলবেশী পোর্শিয়াকে সেটা দিয়ে দিয়েছে। তাই, পোর্শিয়া যতই আংটির কথা জিজ্ঞেস করে, বাসানিওকে ততই সেই উকিলের প্রশংসা করতে হয় যাতে পোর্শিয়া ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারে। পোর্শিয়াকে সে বুঝাতে চাইল যে সে নিজে এবং তার বন্ধু অ্যাণ্টনিও সেই উকিলের কাছে চিরঋণী। আর এইসব সংলাপের মধ্য দিয়ে নাট্যকার মূলত পুরুষের মুখ থেকে নারীর বৌদ্ধিক সামর্থের স্বীকৃতি আদায় করিয়ে দিলেন।কারণ পরিচয় জানত না বলেই বাসানিও অত অকৃপণ প্রশংসা করেছে সেই উকিলের বুদ্ধির। আর পোর্শিয়াও পুরোদমে তার স্বামীর মুখ থেকে তার সুপিরিয়রিটির স্বীকৃতিটি আদায় করে নিতে পেরেছে। এই একই ব্যাপার অ্যাজ ইউ লাইক ইটের ক্ষেত্র্রেও ঘটেছিল। নারীর নারী রুপটি শুধু কোমলতা আর অধীনতার সমার্থ শব্দ হিসেবেই বিবেচনা করত তখনকার পুরুষেরা। তাই নারীর বুদ্ধি, বিবেচনার স্বাধীন প্রকাশ ঘটাতে পুরুষের ছদ্মবেশ নেওয়া ছাড়া গতি ছিল না।
ম্যাকবেথ নাটকে নারীর যে রুপ প্রকাশ পেয়েছে তাতে রীতিমত চমকে যেতে হয়। লেডি ম্যাকবেথ চরিত্রটি অত্যন্ত বিতর্কিত। কিন্তু এ চরিত্রটিও একটি বিরাট ধাক্কা তৎকালীন সমাজের জন্য। লেডি ম্যাকবেথ রীতিমত একটি ইভিল জিনিয়াস। নারীর এত নিষ্ঠুর রূপ কারো কাছেই প্রত্যাশিত নয়। কিন্ত শেক্সপীয়র জানেন, নারী বা পুরুষ কোন জাতই ভাল বা মন্দের একচ্ছত্র পেটেণ্ট নিয়ে রাখে নি। পদস্খলন যে কারোরই হতে পারে। তাই লেডি ম্যাকবেথ অন্যায় করেছে, ম্যাকবেথও করেছে। আবার সে পাপের শাস্তিও তাদের দুজনকেই পেতে হয়েছে।অন্যায়ের পরিণতি যেমন নারী পুরুষ মানে না, তেমনি অন্যায়ের প্রবৃত্তিও দু’ পক্ষের রক্তেই সহজাত। এই সত্যিটুকু শেক্সপীয়র আজ থেকে শত শত বছর আগেই বুঝে গেছেন, বুঝিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা কি বুঝি? নারীর মানুষ রূপটি নিয়ে আমরা কি আদৌ সচেতন? নারীর সমস্যা অভিযোগ বা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলেই তাকে নারীবাদী অ্যাখ্যা দেওয়া হয়। ঠোঁট উল্টে বলা হয়, “ভারি নারীবাদী! মানবতাবাদী হতে তোমাদের সমস্যা কোথায়? অহেতুক বিভেদ সৃষ্টি করার দরকার কী নারী আর পুরুষের মধ্যে?”
এদের কথার উত্তরে আমার পাল্টা জিজ্ঞাসা–কেন? নারী কি মানুষের বাইরে? আর কে বলল যে নারীবাদ কথাটির মাধ্যমে বিভেদ তৈরি করা হচ্ছে! যে বিভেদ যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে তা চিহ্নিত করতেই এই বাদটির জন্ম দেওয়া হয়েছে। এটাকে অমানবতাবাদ ভাবার কোন সুযোগ তো নেই!
প্রকৃতিতে চিরদিন নানাভাবে সবলের দ্বারা দুর্বল নিপীড়িত হয়ে আসছে। কখনো অর্থশক্তির কাছে দারিদ্র্য, কখনো পেশীশক্তির কাছে রুগ্নতা, আবার কখনো পৌরুষের দাপটের কাছে নারীত্বের পরাজয় হচ্ছে। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বিশেষ বিশেষ সুবিধাবঞ্চত গোষ্ঠীর হয়ে কথা বলছেন। তারা সবাই-ই মানবতাবাদী। কিন্তু কে ঠিক কার কথা বলছেন তা বুঝতেই আমরা কাউকে কম্যুনিস্ট,কাউকে নারীবাদী বলে চিনে থাকি! এদের দায়িত্ব বিভেদ দূর করা। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে পুরুষবিদ্বেষ প্রচার করেন, তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত সমস্যা। গোটা নারীবাদকে এর সাথে জড়িয়ে ফেলার কোন কারণ নেই।
একটা সমস্যা হল, আমরা মেয়েদের ব্যাপারে খুব বেশি সাধারণীকরণ করে কথা বলি। আজাকের বাংলাদেশে আমাদের দুই নেত্রীর কেউ যখনই কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেন কিংবা ভুলভাল মন্তব্য করেন তখনই শোনা যায়–“এইজন্যই বলে মেয়েমানুষের বুদ্ধি!” আচ্ছা, আমার একটি বিনীত জিজ্ঞাসা আছে। জেনারেল এরশাদ কোন ভুল করলে তখন তার পুরুষ পরিচয়টা উঠে আসে না কেন? তখন তো দিব্যি ধরে নিই যে, উনি মানুষটাই এমন!
আসলে বুদ্ধি বা বোকামিতে কোন জাতেরই একচেটিয়া অধিকার নেই। এই সহজ সত্যিটুকু বোঝার সময় কি এই একবিংশ শতাব্দীতেও আসে নি!